ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

যশোরে প্রধান শিক্ষককে যুবলীগ নেতার হুমকির অডিও ভাইরাল

জেলা প্রতিনিধি | যশোর | প্রকাশিত: ০৮:৫৫ পিএম, ০৫ এপ্রিল ২০২২

যশোরের ইছালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে কমিটি নিয়ে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ ও হত্যার হুমকি দেওয়ার অডিও ভাইরাল হয়েছে। যশোর সদর উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মাজহারুল ইসলাম মাজহারের বিরুদ্ধে এই হুমকি দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী প্রধান শিক্ষক রবিউল ইসলাম জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে যশোর কোতোয়ালি মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন।

গত ৩১ মার্চ করা জিডিতে তিনি উল্লেখ করেন, যশোর সদর উপজেলার ইছালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আগের কমিটির অগোচরে যুবলীগ নেতা মাজহার ও তার সহযোগীরা অ্যাডহক কমিটির সভাপতি হিসেবে মনিরুজ্জামানকে নিযুক্ত করেন। এতে ম্যানেজিং কমিটির সদস্য ও অভিভাবকরা ওই কমিটির বিরুদ্ধে অনাস্থা আনাসহ একজন অভিভাবক হাইকোর্টে মামলা করেন। বর্তমানে মামলাটি চলমান।

এর জেরে গত ২৪ মার্চ দুপুর ২টার দিকে মাজহার তার ফোন থেকে প্রধান শিক্ষককে ফোন দিয়ে কমিটি অনুমোদনের জন্য আবেদন করতে বলেন। তাকে কমিটির বিষয়ে মামলা চলমান জানালে গালিগালাজসহ জীবননাশের হুমকি দেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই জিডির মাধ্যমে নিরাপত্তা চেয়ে তিনি প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছিলেন।

এদিকে, প্রধান শিক্ষক রবিউল ইসলামের মুঠোফোনে যুবলীগ নেতা মাজহারুল ইসলামের হুমকির কথোপকথনের অডিও সোমবার (৪ এপ্রিল) রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়। রাত থেকেই এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ওই কথোপকথনের অডিও। একজন শিক্ষককে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজসহ জীবননাশের হুমকি দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে তীব্র সমালোচনা চলছে।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ইছালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রবিউল ইসলাম বলেন, হুমকি দেওয়ায় জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে তিনি জিডি করেছেন। আর ভাইরাল হওয়া অডিওটি সঠিক বলে তিনি নিশ্চিত করেছেন।

তবে সদর উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মাজহারুল ইসলাম মাজহার দাবি করেছেন, প্রধান শিক্ষককে তিনি ফোন দিয়েছিলেন। সালাম দিয়ে ভালো-মন্দ জিজ্ঞেস করেছেন। তারপর কিছু কথা হয়েছে। কিন্তু ভাইরাল হওয়া অডিও কথোপকথনটি এডিট করা। সব কথা তার নয়। স্থানীয় একটি অনলাইন এটি তৈরি করে তাকে রাজনৈতিকভাবে ঘায়েল করতে ভাইরাল করেছে।

ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ৬ মিনিট ৮ সেকেন্ডের কথোপকথনের অডিওতে শোনা যাচ্ছে, যুবলীগ নেতা মাজহারুল বারবার অকথ্য ভাষায় প্রধান শিক্ষক রবিউল ইসলামকে গালিগালাজ করছেন। কথোপকথনের প্রথমেই যুবলীগ নেতা প্রধান শিক্ষককে ভালোমন্দ জিজ্ঞাসা করেন। নিচে কথোপকথনটি তুলে ধরা হলো-

মাজহারুল: স্যার কোথায় আছেন?
প্রধান শিক্ষক: আমি অসুস্থ বাসায় আছি।
মাজহারুল: কমিটির আবেদন করবেন না আপনি?
প্রধান শিক্ষক: এখনো তো করিনি। আমি সুস্থ হয়ে নিই। দেখি কী করা যায়।
মাজহারুল: আমার এমপি সাহেব (যশোর-৩ আসনের সংসদ কাজী নাবিল আহমেদ) আমারে পাঠিয়েছেন। এখন আমি আপনার স্কুলের চেয়ারের সামনে বসে আছি। ফরিদ ভাই (সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোস্তফা ফরিদ আহম্মেদ চৌধুরী) কালকে আপনার বাসায় লোক পাঠাতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি বলেছি, আপনি অসুস্থ, তাই আসেনি। ফিঙ্গে লিটনের (ভারতে পালিয়ে থাকা যশোরের শীর্ষ সন্ত্রাসী) গাঁজাখোর ইয়াবা খোর ছেলে-পেলে যেয়ে আপনার সাথে যদি খারাপ ব্যবহার করে তাহলে পরবর্তীতে আমার ঘাড়েই আসে।
প্রধান শিক্ষক: না... খারাপ ব্যবহার করবে কেন।
মাজহারুল: আপনি আর কথা বলবেন না। আপনার কোনো কথা জীবনে আর শুনবো না। আপনি কমিটির দরখাস্ত করবেন, না করবেন… সেটা গতদিন আপনাকে জানিয়েছি। কালকে এসপির সাথে কথা হলো, হাশিমপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কমিটি আপনার আরও তিনমাস পরে মেয়াদ শেষ হয়েছে। কিন্তু সেই কমিটি এরইমধ্যে বের হয়ে গেছে। আপনি কার ক্ষমতায় এই কমিটির আবেদন করছেন না; সেটা আপনাকে বলতে হবে। আর যদি না করেন তাহলেও বলে দিতে হবে আমি এই কমিটির আবেদন করবো না। তার পরে আপনার সাথে বুঝবো এই বিষয়ে।

jagonews24

প্রধান শিক্ষক: তুমি আমার কথা শুনবা না কেন। তোমারে ফোন দিলেই তুমি কেটে দাও শুধু। আমার ফোনটা ধরতে হবে। আর কথাটা শুনতে হবে।
মাজহারুল: আচ্ছা বলেন বলেন।
প্রধান শিক্ষক: আমি কী আবেদন করবো। যারা মামলা করেছে; তাদের সাথে তো আমার কথা বলা লাগবে না কি? মামলা তুলে দেওয়া লাগবে না?
মাজহারুল: ওরা মামলা তুলছে না কেন? (উত্তেজিত কণ্ঠে) আপনি আমারে মামলা বুঝান। আমার এই অল্প বয়সে আমি পাঁচটা মার্ডার মামলা খেয়েছি। আপনি আইন শেখান। ওই মামলার কাগজপত্র ছয় মাস পরে সব বাতিল হয়ে যাবে। আপনার কত বড় ক্ষমতা আপনি এমপি সাহেবের কথা শুনছেন না। সব মামলা আপনি করাচ্ছেন।
প্রধান শিক্ষক: না, আমি করাতে যাবো কেন? মামলা তুলে না নিলে কমিটির আবেদন করা যাবে না তো। তাই সবার সাথে কথা বলতে হবে। আমি বলবো, তুমি বলবা।
মাজহারুল : শোনেন স্যার, আমি কারও সাথে কথা বলতে পারবো না। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কার সাথে কথা বলবেন, না কী বলবেন আপনি জানেন। আপনার কোন মা-বাপ (গণমাধ্যমে অপ্রকাশযোগ্য অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ) আছে তাদের সাথে কথা বলেন। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কমিটি যদি আবেদন না করেন, তাহলে আপনি যদি যশোর থাকতে পারেন। তার পরে আমি চুড়ি পরে এই যশোরে ঘুরে বেড়াবো। (গণমাধ্যমে অপ্রকাশযোগ্য অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে হত্যার হুমকি)। আমি আপনার সাথে দুই বছর ভালো ব্যবহার করেছি। তোমার কিডা ঠেকাই আমি দেখবানে। তোর এত বড় সাহস তুই কাজী নাবিল আহমেদের ডিও লেটারে মামলা করেছিস। তোর কিডা আছে। তুই আজকের পর থেকে নীলগঞ্জে কীভাবে থাকিস দেখবানে। তোর লোকজন পুলিশ-র‌্যাব নিয়ে থাকিস। আমি আসছি।

প্রধান শিক্ষক: তুমি কথাবার্তা ভদ্রভাবে বলো।
মাজহারুল: আমরা যেভাবে ভদ্রতা জনগণকে দেখাই, তত ভদ্র কিন্তু আমি না।
প্রধান শিক্ষক: তুমি আমার ছাত্র ছিলে, এভাবে বলছো কেন?
মাজহারুল: (অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে) এই শহরে এমন কোনো অফিসার নেই, আমাকে দেখে নাবিল সাহেবের প্রতিনিধি মনে করে উঠে দাঁড়িয়ে চেয়ার এগিয়ে দেয় না। আর তোর কত বড় সাহস! তুই নাবিল আহমেদের ডিও লেটারের ওপর এখনো কমিটি আবেদনের দরখাস্ত দিস নে। তোর যে আব্বাগুলো আছে, তাদের বলবি, মাজহারুল এই এই হুমকি দিয়েছে। তাদের আমারে কিছু করে নিতে বলিস।
প্রধান শিক্ষক: কাউকে বলা লাগবে না। আমি সুস্থ হয়ে নেই। তার পরে দেখবানে।
মাজহারুল: তা তোর সুস্থ হওয়া লাগবে না। তুই কীভাবে যশোরে থাকিস আমি দেখবানে। তুই যদি যশোরে থাকতে পারিস। আমি আর যশোরে রাজনীতি করবো না। তোর চাকরি থাকে কি না দেখিস। তোরে এতদিন কিছু বলিনি। এতদিন ভদ্রতা দেখাইছি। তুই আমার স্যার তাই। এখনো অভদ্রতার কিছু দেখিসনি তুই। (অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে) তুই জামায়াত করে এখনো এই জায়গায় আছিস তোর কপাল ভালো-বলে ফোন কেটে দেন এই যুবলীগনেতা।

মিলন রহমান/এমআরআর/জিকেএস