ফলনে বিপর্যয় দামও কম, হতাশ পাবনার পেঁয়াজচাষিরা
ফলন ও দাম কম হওয়ায় এবার পাবনার পেঁয়াজচাষিদের মুখে হাসি নেই। ছবি-জাগো নিউজ
বাজারদর কমে যাওয়ায় হতাশ পাবনার পেঁয়াজচাষিরা। এবার পেঁয়াজচাষ মৌসুমে বারবার বৃষ্টি হয়েছে। এতে গাছ ফুলে ভরে যাওয়ায় উৎপাদন কম হয়েছে। তবে পেঁয়াজ উত্তোলনের সময় বৃষ্টি না থাকায় নিরাপদেই পেঁয়াজ ঘরে তুলতে পারছেন চাষিরা। কিন্তু দাম কম থাকায় মুখে হাসি নেই চাষিদের। উৎপাদন খরচই উঠছে না বলে জানিয়েছেন চাষিরা।
তারপরও শিলাবৃষ্টিতে যেন নষ্ট না হয় সেজন্য পেঁয়াজ উত্তোলন শুরু করেছেন চাষিরা। সাঁথিয়া ও সুজানগর উপজেলার বিল গ্যারকা পাড়, বিল গাজনা পাড়, নাগডেমরা, সেলন্দা, ঘুঘুদহ বিলপাড়, কুমিরগাড়ী, বামনডাঙ্গা, বামনদি, ইসলামপুর মাঠে গিয়ে দেখা যায়, চাষিরা পেঁয়াজ তোলায় ব্যস্ত।
তবে এবার পেঁয়াজের উৎপাদন কম হয়েছে বলে জানালেন কৃষকরা। তারা জানান, পেঁয়াজ লাগানোর পর থেকেই অসময়ে কয়েকবার বৃষ্টি হয়। সেসময় অনেক জমিতে পানিও জমে গিয়েছিল। ফলে এবার পেঁয়াজ গাছ ফুলে ভরে গেছে। এজন্য উৎপাদন অনেক কমে গেছে। যে জমিতে বিঘায় ৬০ থেকে ৭০ মণ ফলন হতো সেখানে এবার হয়েছে ৪০ থেকে ৫০ মণ।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর পাবনার উপ-পরিচালক মিজানুর রহমান জানান, পাবনা জেলায় এবার ৫৩ হাজার ৩০৫ হেক্টর জমিতে হালি (চারা) পেঁয়াজ চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এবার চাষের লক্ষ্যমাত্র ছাড়িয়ে গেছে। এবার পাবনা থেকে অন্তত সাত লাখ ৪৯ হাজার ৩৪ মেট্রিক টন পেঁয়াজ উৎপাদন হবে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ।
কৃষি কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যমতে, দেশে প্রতিবছর পেঁয়াজের বার্ষিক উৎপাদন প্রায় ২৫ লাখ মেট্রিক টন। পাবনা জেলা থেকেই উৎপাদন হয় প্রায় সাড়ে ছয় লাখ থেকে সাত লাখ মেট্রিক টন। যা মোট উৎপাদনের এক চতুর্থাংশের বেশি। আর পাবনার সাঁথিয়া-সুজানগর উপজেলা থেকে উৎপাদন হয় প্রায় পৌনে পাঁচ লাখ মেট্রিক টন। সে হিসাবে সারাদেশে মোট উৎপাদিত পেঁয়াজের এক পঞ্চমাংশ উৎপাদিত হয় পাবনার এ দুটি উপজেলা থেকে।
জেলার চাষিরা দুটি পদ্ধতিতে পেঁয়াজের আবাদ করে থাকেন। এর একটি কন্দ (মূলকাটা বা মুড়ি) ও অন্যটি চারা (হালি) পদ্ধতি। মূলকাটা পদ্ধতিতে পেঁয়াজের আবাদ শুরু হয় অক্টোবর-নভেম্বর মাসে। আর হালি পদ্ধতিতে চাষ শুরু হয় ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে।

মুড়ি পদ্ধতিতে আবাদ করা নতুন পেঁয়াজ জানুয়ারি মাসে হাটে উঠতে শুরু করে। এ পেঁয়াজ বেশিদিন সংরক্ষণ করা যায় না। মুড়ি পেঁয়াজ দুই থেকে তিনমাস বাজারে থাকে। আর হালি পদ্ধতিতে চাষ করা পেঁয়াজ বাজারে ওঠা শুরু করে মার্চের শুরু থেকে মাঝামাঝি পর্যন্ত। হালি পেঁয়াজ ঘরে সংরক্ষণ করা হয়। বছরজুড়ে বাজারে কেনাবেচা হয়।
মঙ্গলবার (৫ এপ্রিল) দেশের অন্যতম বড় পেঁয়াজের হাট সাঁথিয়া উপজেলার বনগ্রামে গিয়ে দেখা যায়, প্রতি মণ পেঁয়াজ মানভেদে ৪০০ টাকা থেকে শুরু করে ৯০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
পেঁয়াজের আড়তদার ইব্রাহিম হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, এবার পেঁয়াজের দাম নেমে যাওয়ায় কৃষকের লাভ তো দূরের কথা, উৎপাদন খরচই উঠছে না।

সাঁথিয়ার কুমিরগাড়ী গ্রামের পেঁয়াজচাষি আলামিন ফকির জানান, তিনি দেড়বিঘা জমি লিজ নিয়ে পেঁয়াজ চাষ করেছেন। খরচ হয়েছে ৮৫ হাজার টাকা। দেড়বিঘা জমিতে খুব বেশি হলে ৬০ মণ পেঁয়াজ পাবেন। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী এতে তার ক্ষতি হবে।
বিশ্বাসপাড়া গ্রামের খাজা রাসেল জানান, তিনি ১০ বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষ করেছেন। এতে প্রতি বিঘায় তার ৪৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ফলন পাচ্ছেন বিঘাপ্রতি ৪০ থেকে ৪৫ মণ। বাজারদর অনুযায়ী তার চাষের খরচই উঠছে না।
সাঁথিয়ার পদ্মবিলা গ্রামের কয়েকজন চাষি জানান, এক বছরের জন্য জমি লিজ নিয়ে তাতে পেঁয়াজ চাষ করে তারা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তারা বলেন, বছরে অন্য দুটি ফসল চাষ করে সে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবেন।
পদ্মবিলা গ্রামের পেঁয়াজচাষি তফিজ উদ্দিন জনান, তার ক্ষেতে এবার যে পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে তাতে তিনি বিঘাপ্রতি ৪০ মণ ফলন পাবেন। হাটে প্রতি মণ পেঁয়াজ ৬০০ থেকে ৯০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচই উঠছে না।

সাঁথিয়ার চরভদ্রকোলা গ্রামের চাষি রবিউল ইসলাম রবি জাগো নিউজকে বলেন, ‘অন্য সব পণ্যের দাম বেশি। এভাবে চলতে থাকলে আমরা কীভাবে বাঁচবো?’
বাংলাদেশ ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) কেন্দ্রীয় সভাপতি শাহজাহান আলী বলেন, বছরের শেষ দিকে অনেক সময় পেঁয়াজের দাম বাড়ে। তবে সে দাম সাধারণ চাষিরা পান না। কারণ চাষের খরচজনিত দেনার কারণে তাদের মৌসুমের শুরুতেই বেশিরভাগ পেঁয়াজ বেচে ফেলতে হয়। তিনি বলেন, পেঁয়াজ চাষে স্বল্পসুদে ঋণ দেওয়ার সরকারি ঘোষণা থাকলেও সাধারণ চাষিরা সে সুবিধা পাচ্ছেন না।
পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, পাবনা জেলার সাঁথিয়া- সুজানগর দেশের পেঁয়াজের রাজধানী। দেশের এক চতুর্থাংশের বেশি পেঁয়াজ পাবনা জেলায় জন্মে। কৃষি বিভাগ পুরো মৌসুমজুড়ে চাষিদের পরামর্শ দিয়েছেন। তার আশা, চাষিরা এবার পেঁয়াজের ভালো দাম পাবেন।
আমিন ইসলাম জুয়েল/এসআর/এএসএম