ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

বানে ভেসে গেছে ঈদ আনন্দ

জেলা প্রতিনিধি | নেত্রকোনা | প্রকাশিত: ১২:৪৬ পিএম, ০৫ জুলাই ২০২২

আর ক’দিন পরই পবিত্র ঈদুল আজহা। করোনা মহামারির কারণে কিছুটা কম হলেও সারাদেশে বিরাজ করছে ঈদের আমেজ। কিন্তু এ আমেজ পুরোপুরি গায়েব বন্যাকবলিত নেত্রকোনা জেলায়। বন্যায় প্রায় ১০ লাখ পরিবার পানিবন্দি। তিন সপ্তাহের বেশি সময় জেলার মানুষ বানের পানিতে ভাসছে। এমন পরিস্থিতিতে ঈদ যেন দুঃস্বপ্ন বানভাসিদের কাছে।

জেলার বেশিরভাগ জনপদে এখনও থৈ থৈ করছে বন্যার পানি। ফলে ঈদের আমেজ অনেকটা ফিকে হয়ে গেছে। আনন্দের বদলে ভোগান্তির ঘোলা জলে হাবুডুবু খাচ্ছে হাওরপাড়ের লাখ লাখ মানুষ। পানিতে ভাসা বেশিরভাগ মানুষের সাধ্য নেই এবার ঈদে পশু কোরবানি দেওয়ার।

বানভাসিদের ভাষ্য, যেখানে জীবনই বাঁচে না, সেখানে কিসের ঈদ। তারা তাকিয়ে আছেন সরকারি-বেসরকারি সাহায্যের দিকে। যদিও ঈদ উপলক্ষে ভিজিএফসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে ত্রাণ দিয়ে বন্যা কবলিত মানুষের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগির কথা জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।

খালিয়াজুরী উপজেলার মুজিবনগর আশ্রয়ণ প্রকল্পের প্রধানমন্ত্রীর উপহারের জমিসহ ঘর পেয়েছিলেন দিলাল মিয়া (৪৫)। আশায় বুক বেঁধেছিলেন বাকি জীবন সুখে থাকার। কিন্তু আকস্মিক বন্যায় সেই স্বপ্ন ফিঁকে হয়ে গেছে। বন্যায় ঘরের ভেতর একবুক পানি। ঢেউয়ের তাণ্ডবে ঘরের বেশিরভাগ অংশ ধসে গেছে। বাকিটুকুও যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে যেতে পারে।

বানে ভেসে গেছে ঈদ আনন্দ

দিলাল মিয়া জাগো নিউজকে বলেন, ‘বন্যার পানি ও আফালে (ঢেউয়ে তাণ্ডব) ঘুমাইতে পারি না। কখন জানি বাড়ি, স্ত্রী-সন্তানকে বন্যায় ভাসিয়ে নিয়া যায়। অর্ধেকটা ভেঙে গেছে, এর উপর সাপ বিচ্ছুর ভয়। ঈদের কোনো চিন্তাও মাথায় নেই। ঈদ বানের জলে ভেসে গেছে আমাদের।’

শুধু তিনিই না, তার মতো বন্যায় আধাপাকা ঘর ভেঙেছে একই গ্রামের কদর মিয়া, জাকির মিয়া, আল আমিন ও মমতাজ বেগমসহ মুজিব নগর আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের। ঈদের আনন্দ তাদের কাছে দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। এখনো দুর্ভোগে রয়েছে ওই উপজেলার অন্তত লক্ষাধিক মানুষ।

নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার গাঁওকান্দিয়া গ্রামের রোমেনা খাতুন (৪২) জাগো নিউজকে বলেন, বিছানার ওপর একবুক পানি। উপায়ান্তর না দেখে সন্তানকে নিয়ে ভাসতে থাকি পানিতে। আধাঘণ্টা পর একটি আমগাছে ওড়না দিয়ে ছেলেকে বেঁধে রাখি। নিজে গাছে ঝুলে থাকি। সাত ঘণ্টা পর নৌকায় লোকজন তুলে নিয়ে গেছে। ঘরগুলোও এক এক করে চোখের সামনে ভেসে গেছে। পানি কমলে আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ফিরে আর কিছুই পাননি। ঘরবাড়ি, গাছপালা এমনকি ভিটেটাও নেই।

ঈদ কেমন কাটবে এমন প্রশ্ন করতেই অনেকটা অপ্রস্তুত হয়ে যান রোমেন খাতুন। পাশে সন্তানরা। চুপচাপ হয়ে গেলেন সবাই। কিছু সময়ের নীরবতা ভেঙে রোমেনা বললেন, ‘দ্যাহেন, আমরার ঈদ আর অন্যদিন হমান। সামর্থ্য অইলে কেউর ঘরে একটু নাশতা-ফিন্নি রান্ধন অইবে, অনেকের ঘরেই অইবে না। নতুন কাপড়, ফিন্নি, ভালো খাওন, এই রহম ঈদ করনের ভাগ্য কি আর আছে। সব তো ভাসাইয়া নিয়ে গেছে।’ বলেই কাঁদতে থাকেন তিনি।

জেলা প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, নেত্রকোনায় ৫ লাখ ৫৫ হাজার ৫৫০ মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলার ৭৫টি ইউনিয়নের বাড়িঘর বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। বর্তমানে ৬৩টি ইউনিয়নে ৩৪ হাজার ৪৬৫টি পরিবার পানিবন্দি রয়েছে। ৬ জন বন্যার পানিতে ডুবে মারা গেছে। ৬৪টি মেডিকেল টিম পানিবাহিতসহ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা দিচ্ছে।

বানে ভেসে গেছে ঈদ আনন্দ

দুর্গাপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাজিব উল আহসান জাগো নিউজকে বলেন, উপজেলার অন্তত দেড় থেকে দুইশো বাড়িঘর ভেঙে গেছে পানির স্রোতে। তাদের ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা তৈরি করছি। রাস্তাঘাটের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নিরুপণের কাজ চলছে। ক্ষতির তালিকা করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। ঈদে বন্যা কবলিত মানুষকে নিয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করা হবে।

কলমাকান্দার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবুল হাসেম জাগো নিউজকে বলেন, উপজেলার লেঙ্গুরা ইউনিয়নসহ কয়েকটি গ্রামে সাড়ে চারশ’ ঘরবাড়ির তালিকা করা হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত, হাসপাতাল যেখানেই সুযোগ পেয়েছেন, সেখানেই হাজার হাজার বানভাসি মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। বেশিরভাগ বাড়িঘরে এখনো বন্যার পানি। এক সপ্তাহ পানি কমে আবার বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বাড়তে শুরু করেছে।

খালিয়াজুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এএইচএম আরিফুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, বন্যা কবলিত মানুষের জন্য আমরা ঈদ সামগ্রীসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ দেওয়ার পরিকল্পনা করেছি। ঈদের আগেই তাদের কাছে ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হবে।

জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিশ জাগো নিউজকে বলেন, নেত্রকোণার নয়টি উপজেলার বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্র থেকে লক্ষাধিক মানুষ বাড়ি ফিরেছে। ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাট থেকে পানি দ্রুত নেমে যাওয়ায় মানুষ আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়েছে। বন্যা কবলিত মানুষকে ত্রাণ, নগদ অর্থ সহয়তা দেওয়া হচ্ছে। সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন সরকারি বেসকারি পর্যায় থেকে ত্রাণ তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের ঈদ আনন্দ উদযাপনের জন্য সরকারিভাবে সহয়তা করা হবে।

কামাল হোসেন/এফএ/জেআইএম