ঈদে প্রস্তুত কক্সবাজার, পর্যটকদের অপেক্ষায় সমুদ্রসৈকত
সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে ঈদুল আজহায় টানা ছুটি শুরু হচ্ছে দেশে। প্রায় সপ্তাহখানেকের ছুটিতে ঈদ আনন্দ উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে মানুষ। বিশেষত চাকরিজীবীদের পরিবারে এখন খুশির বান ডেকেছে। কারণ, বছরের এ সময়গুলোতেই তারা টানা চার-পাঁচ দিন ছুটি কাটানোর সুযোগ পান। পরিবারের সবাই একসঙ্গে সময় কাটাতে পারেন।
ঈদের আর বাকি মাত্র দুদিন। তাই বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে কর্মব্যস্ত মানুষ নাড়ির টানে বাড়ি ফিরতে শুরু করেছেন। শুক্র-শনি সাপ্তাহিক ছুটি। পরের তিন দিন (রোব-সোম-মঙ্গলবার) ঈদের ছুটি। কেউ কেউ আবার বুধ-বৃহস্পতিবার আবেদন করে ছুটি নিয়েছেন। ফলে লম্বা একটা সময়ই পাচ্ছেন কর্মজীবীরা। ফলে ছুটির সময়টা কাজে লাগাতে অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে আনন্দ ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন। এরমধ্যে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজার। ফলে ঈদ ঘিরে আরও একবার মুখর হয়ে উঠবে বিশ্বের দীর্ঘতম এ সমুদ্র সৈকত, এমনটাই ধারণা পর্যটন ব্যবসায়ীদের।
ভ্রমণপিপাসুদের অনেকে নিরাপদ অবকাশ যাপনের জন্য আগাম বুকিং দিলেও বেশিরভাগ হোটেল-মোটেল ও কটেজের রুম এখনো ফাঁকা। ওয়াকিং গেস্ট হয়ে পর্যটকরা ভিড় বাড়ালেও ঈদে পর্যটন ব্যবসা চাঙ্গা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ঈদ পর্যটন মৌসুমের আগাম যাত্রার আবহ আনতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
কক্সবাজারের তারকা হোটেল ওশান প্যারাডাইসের পরিচালক আবদুল কাদের মিশু জাগো নিউজকে বলেন, ইট-পাথরের খাঁচায় যান্ত্রিক জীবন কাটানো মানুষগুলো সুযোগ পেলেই ভ্রমণের ছক কষেন। কোরবানির ঈদে টানা ছুটির সুযোগে অনেকে আগাম রুম বুকিং দিয়েছেন। যারা পশু কোরবানি দিচ্ছেন বা যাদের নানা সামাজিক দায়বদ্ধতা রয়েছে তারা কোরবানির দিন হয়তো বাইরে কোথাও বের হবেন না। কিন্তু ঈদের দ্বিতীয় বা তৃতীয় দিন তাদের অনেকেই ছুটে আসবেন কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের চাপ অনেক বাড়তে পারে।

কক্সবাজার ট্যুরস অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের (টুয়াক) সদস্য ও দিগন্ত ট্যুরিজমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়ার মুহাম্মদ মনে করছেন, বর্ষাকাল চললেও বৃষ্টির দেখা তেমন নেই। আকাশে মেঘ-রোদ্দুরের লুকোচুরি খেলা। এ সময়টাতে বরং পর্যটকদের পদচারণায় সৈকতের চিত্র আরও মোহনীয় ও রোমাঞ্চকর হয়ে উঠবে।
প্রতি বছরের মতো এবারও ঈদে অতিথি বরণে হোটেল-মোটেলগুলো নানা আঙ্গিকে সাজানো হচ্ছে। সবকিছুতেই লেগেছে উৎসবের ছোঁয়া। অতিথিদের জন্য ফিটফাট একটা পরিবেশ তৈরি করতে হোটেল মালিকেরাও বেশ মনোযোগী।
এদিকে কক্সবাজারের প্রতিটি পর্যটন স্পটে কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রস্তুতি নিয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। নিরাপত্তা জোরদারে সব স্পটে লাগানো হচ্ছে সর্তকতামূলক সংকেত ও সাইনবোর্ড।
হোটেল মালিকদের মতে, সৈকত শহরে হোটেল-মোটেল রয়েছে চার শতাধিক। এসব হোটেলে দৈনিক প্রায় এক লাখ পর্যটকের রাত যাপনের ব্যবস্থা রয়েছে। কিছু কিছু হোটেলে আগাম কিছু বুকিং দিলেও অনেক হোটেল ওয়াকিং গেস্টের অপেক্ষায় রয়েছে। ঈদ ঘিরে কক্সবাজারের পর্যটন ব্যবসা চাঙ্গা হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন হোটেল ও গেস্ট হাউজ মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার।
হোটেল সি-নাইট গেস্ট হাউজের ব্যবস্থাপক শফিক ফরাজী জাগো নিউজকে জানান, প্রতি ঈদেই কক্সবাজারে পর্যটকদের ভিড় বাড়ে। এখন বৃষ্টি মৌসুম হলেও পর্যটকের কমতি হবে না। এবারও ঈদে উৎসবমুখর হয়ে উঠবে কক্সবাজারের প্রতিটি পর্যটনকেন্দ্র।
হোটেল-মোটেল অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াদ ইফতেখার বলেন, পর্যটকেরা আমাদের লক্ষ্মী। আন্তরিক সেবা নিশ্চিতের মধ্য দিয়ে কক্সবাজারের প্রতি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার তাগিদ আমরা সবসময়ই অনুভব করি। এবারও ব্যতিক্রম হবে না।

হোটেল অস্টারইকোর পরিচালক মুহাম্মদ রিয়াদ বলেন, কক্সবাজারের পর্যটন খাত দিয়ে সরকারের রাজস্ব বিভাগ যে পরিমাণ আয় করে সে অনুযায়ী পর্যটনের অবকাঠামোগত উন্নয়ন নেই।
এদিকে ঈদ ঘিরে জেলা সদরের বাইরেও হিমছড়ি, দরিয়ানগর, ইনানী, মহেশখালী, বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কসহ জেলার সব পর্যটন স্পট সাজানো হচ্ছে।
ডুলাহাজরা বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কের তত্ত্বাবধায়ক (ইনচার্জ) মো. মাজহারুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, পার্কের আধুনিকানের কাজ চলছে। এরপরও অতীত অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে পর্যটক বরণে প্রস্তুত আছে সাফারি পার্ক। যে কোনো দিবস, ঈদ-পার্বণে এখানে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার ব্যাপক সমাগম ঘটে।
কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রেজাউল করিম জাগো নিউজকে জানান, ঈদ আনন্দ উপভোগ করতে পর্যটক আগমণ বাড়বে। সেটা মাথায় রেখে নিরাপত্তা নিশ্চিত ও অপরাধ দমনে কয়েকটি ভাগে সাজানো হয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশকে। টেকনাফ ও ইনানীসহ সব পর্যটন স্পটে ট্যুরিস্ট পুলিশ দায়িত্ব পালন করবে। প্রয়োজনে জেলা পুলিশের সহযোগিতা নেওয়া হবে।

স্থানীয় রিকশা, ব্যাটারি বা সিএনজিচালিত অটোরিকশাগুলো যেন বাড়তি ভাড়া আদায় করতে না পারে সেজন্য পর্যটকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে টুরিস্ট পুলিশ।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ জাগো নিউজকে জানান, ঈদ ঘিরে দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলের মানুষের উপস্থিতি দেখা যায় কক্সবাজারে। দূর-দূরান্ত থেকে পর্যটকরা যেমন আসেন, আবার স্থানীয়দেরও ভিড় বাড়ে বালিয়াড়িতে। ভ্রমণপিপাসুদের বিচরণ নির্বিঘ্ন করতে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের একাধিক টিম টহলে থাকবে। এছাড়াও পুলিশ-র্যাবসহ সাদা পোশাকের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী টহল দেবে। ভ্রমণপিপাসুদের ঈদ আনন্দ উপভোগ্য করাই জেলা প্রশাসনের মূল লক্ষ্য।
এমকেআর/জিকেএস