আউটডোর ছাড়া কিছুই নেই ২০ শয্যার হাসপাতালে
ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার মঙ্গলকান্দিতে ২০ শয্যা সরকারি হাসপাতালের অবকাঠামো নির্মাণ হয়েছে দীর্ঘ ৯ বছর আগে। কিন্তু জনবলের অভাবে এই হাসপাতালটি এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি। ফলে সরকারি চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এলাকার লাখো মানুষ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এ হাসপাতালটির নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০১৩ সালে। ব্যয় হয়েছিল ছয় কোটি টাকা। কিন্তু হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু না হওয়ায় তা এলাকাবাসীর কাজে আসছে না। কবে নাগাদ হাসপাতালটির পূর্ণাঙ্গ সেবা চালু হবে সে তথ্যও কারও জানা নেই।
একজন উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল কর্মকর্তা এবং একজন উপ-সহকারী কমিউনিটি ক্লিনিক কর্মকর্তাকে ডেপুটেশনে নিয়োগ দিয়ে হাসপাতালের আউটডোর চালু করা হয়েছে। এতে অন্যান্য জরুরি সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এলাকার বাসিন্দারা। ব্যবহার না করায় নষ্ট হচ্ছে চিকিৎসা সরঞ্জামসহ আসবাবপত্র।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, হাসপাতালটি চালু হলে সোনাগাজী উপজেলার মঙ্গলকান্দি, চর মজলিশপুর, বগাদানা, মতিগঞ্জ, চর দরবেশ, আমিরাবাদ, নবাবপুর ও ফেনী সদর উপজেলার ধলিয়া ইউনিয়নের আড়াই লাখ বাসিন্দা স্বল্প খরচে সেবা পাবেন। কিন্তু হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু না হওয়ায় দরিদ্ররা সরকারি চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

সরেজমিন দেখা যায়, হাসপাতাল ভবনের বিভিন্ন অংশে এর মধ্যে ফাটল দেখা দিয়েছে। হাসপাতালটি নানা ময়লা-আবর্জনায় ভরে গেছে। লোহার গ্রিল, জানালা, দরজা ও কাঁচের গ্লাস ভেঙে গেছে। হাসপাতাল ভবন, চিকিৎসক-কর্মচারীদের বাসভবনসহ পুরো কমপ্লেক্স এলাকা অরক্ষিত। সবকিছুই বছরের পর বছর পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। তাছাড়া হাসপাতালের অবকাঠামো রক্ষায় নেই কোনো নৈশপ্রহরীও।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালের জুলাই মাসে নির্মাণকাজ শেষ হলে ৯ সেপ্টেম্বর সিভিল সার্জন এবং সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কাছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভবনটি বুঝে দেয়। কিন্তু চিকিৎসা কার্যক্রম কখন শুরু হবে তা এখনো অনিশ্চিত। স্বাস্থ্য বিভাগ ৯ বছরেও প্রয়োজনীয় জনবল বরাদ্দ দেয়নি।
এর আগে ২০২০ সালের জুলাই মাসে ২০ শয্যার হাসপাতালটি প্রস্তুত করা হয় করোনার চিকিৎসার জন্য। ৩ সেপ্টেম্বর হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেন ব্যবস্থার উদ্বোধন করা হয়। কিন্তু একজন রোগীও ভর্তি হননি। পদায়ন করা চিকিৎসক-নার্সরা আসেননি একদিনের জন্যও।

হাসপাতালে কেন রোগী আসেন না, এমন প্রশ্নের উত্তরে স্বাস্থ্য বিভাগের ভাষ্য, বাসিন্দারা করোনায় আক্রান্ত হলেও হাসপাতালে আসতে চান না। আর জনপ্রতিনিধিদের দাবি, প্রয়োজনীয় জনবল না দেওয়ায় হাসপাতালটি চালু হলেও রোগীদের কোনো কাজে আসছে না।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্র জানায়, দেশে করোনা আক্রান্তের হার বাড়ার পর উপজেলায় গঠিত করোনা নির্মূল কমিটির সিদ্ধান্তে ২০২০ সালের ৪ মার্চ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঁচ শয্যা এবং ২০ শয্যার মঙ্গলকান্দি হাসপাতালে আইসোলেশন ইউনিট খোলা হয়। এরপর কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে এটিকে করোনা হাসপাতাল ঘোষণা করা হয়।
২০২০ সালের জুলাই মাসে উপজেলা পরিষদের অর্থায়নে সাড়ে আট লাখ টাকা ব্যয়ে করোনা রোগীদের চিকিৎসায় বসানো হয় হাসপাতালটিতে ১০ শয্যার সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্ল্যান্ট। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও অবকাঠামো উন্নত করা হয়। এখন সব তালাবদ্ধ হয়ে পড়ে আছে।
হাসপাতালের সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্ল্যান্ট পড়ে থাকায় এটি নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, সেন্ট্রাল অক্সিজেন ব্যবস্থা ঠিক রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের মতে, প্রতি মাসে অন্তত একবার ব্যবহার না করলে পাইপলাইনে ময়লা ও কার্বন জমে এটি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র সূত্র জানায়, সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্ল্যান্ট উদ্বোধনের সময় রোগী ভর্তি ও চিকিৎসাসেবার জন্য তিন ধাপের প্রতি ধাপে একজন চিকিৎসকের সমন্বয়ে নার্স, পরিচ্ছন্নতা কর্মীসহ পাঁচজন করে ১৫ জন চিকিৎসক-কর্মচারীর মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছিল। কিন্তু হাসপাতালে রোগী ভর্তি না হওয়ায় ওই দায়িত্ব বণ্টন শুধু কাগজে থেকে যায়। তারা কেউ যোগ দেননি। উপজেলা সদর থেকে সাত কিলোমিটার দূরে ডাকবাংলো এলাকায় এ হাসপাতাল।
'
উপজেলার মঙ্গলকান্দি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. মোশারফ হোসেন বাদল বলেন, রোগীদের চিকিৎসায় কোনো ধরনের জনবল ও চিকিৎসক-কর্মচারী না দিয়ে শুধু সেন্ট্রাল অক্সিজেন ব্যবস্থা স্থাপন করা সরকারি অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছু নয়। তিনি হাসপাতালটিতে জনবল নিয়োগ দিয়ে সেবা কার্যক্রম চালুর জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ করেন।
এছাড়া সোনাগাজী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জহির উদ্দিন মাহমুদ লিপটনও হাসপাতালটির জন্য অতি দ্রুত জনবল নিয়োগের দাবি করেন।
জানতে চাইলে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা উৎপল দাশ বলেন, হাসপাতালটিতে বর্তমানে একজন উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার, উপ-সহকারী কমিউনিটি ক্লিনিক কর্মকর্তা ও একজন পিয়নকে প্রেষণে দিয়ে কোনোমতে বহির্বিভাগ চালু করা হয়েছে। প্রাথমিক চিকিৎসা ছাড়া অন্য কোনো চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। হাসপাতালটি চালু করার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল, ওষুধসহ আনুষঙ্গিক সামগ্রীর জন্য সিভিল সার্জনের কাছে একাধিকবার লিখিতভাবে জানিয়েছি।
আবদুল্লাহ আল-মামুন/এমআরআর/জিকেএস