বিএম ডিপোতে বিস্ফোরণ
কোনো সহযোগিতা পাননি ঝলসে যাওয়া আজিম
‘এখনো ঠিক মতো চোখে দেখি না। কারো সাহায্য ছাড়া চলাফেরা করাও অসম্ভব। শরীরের পুড়ে যাওয়া বিভিন্ন অংশের ক্ষত শুকায়নি। কোনো কাজ করতে পারছি না। বেকার হয়ে ৬ সদস্যের পরিবার নিয়ে অনেক কষ্টে দিন যাচ্ছে। আর কত মাস বসে থাকতে হবে জানি না।’
কথাগুলো বলছিলেন সীতাকুণ্ডের বিএম ডিপোতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে গুরুতর আহত আজিম উদ্দিন (৩৪)। মিরসরাই উপজেলার কাভার্ডভ্যানচালক আজিম উদ্দিন উপজেলার ১ নম্বর করেরহাট ইউনিয়নের পশ্চিম অলিনগর গ্রামের সুজাউল হকের ছেলে।
আজিম উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, গত ৩ জুন দুর্ঘটনার আগের দিন ঢাকা থেকে স্টারলিংক ডেনিমস লিমিটেডের গার্মেন্টস পণ্য নিয়ে বিএম ডিপোতে যাই। ৪ জুন পর্যন্ত গাড়ি থেকে পণ্য আনলোড করা যায়নি। ওইদিন রাত ৯টার দিকে ডিপোতে আগুন নিজের চোখে দেখতেছি। ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি আসছে, আগুন নিভে যাবে। কিন্তু আগুনে ভয়াবহতা এতো বেশি হবে বুঝতে পারিনি।
মোবাইলে পরিবারের সঙ্গে কথাও বলেছি কয়েকবার। তখন রাত আনুমানিক ১০টা। গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ কানে বিকট শব্দে আওয়াজ আসে। এরপর আর কিছু বলতে পারি না।
পরে অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রায় ৮ ঘণ্টা পর জ্ঞান ফিরলে চোখ খুলে সবকিছু অন্ধকার দেখি। চোখে দেখছি না, কিন্তু অনুমান হচ্ছে শরীরের কিছু হয়েছে। জানতে পারি শরীরের বিভিন্ন অংশ পুড়ে গেছে।
এরপর চট্টগ্রাম মেডিকেল থেকে বঙ্গবন্ধু হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ২৬দিন চিকিৎসা শেষে বাড়িতে চলে আসি।
তিনি বলেন, চিকিৎসা চলাকালীন একবার ডিপো কর্তৃপক্ষের লোকজন আমাকে হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিলেন। তখন পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে বলে আপাতত এগুলো রাখতে। পরে চিকিৎসার সব ব্যয় বহন করা হবে। কিন্তু হাসপাতাল থেকে রিলিজের সময় তারা আসেনি। ঘটনার চার মাস পার হলেও কোনো খোঁজ খবর বা সহযোগিতা করেনি। শুধু তারা নয়, আমি যে কোম্পানির গাড়ি চালাতাম আজ পর্যন্ত তারাও খবর রাখেনি। চিকিৎসা করাতে আমার প্রায় এক লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এখনো ওষুধ চলছে। দীর্ঘ সময় ধরে বেকার থাকায় পরিবার চলতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
আজিমের মা সুরমা আক্তার জাগো নিউজকে বলেন, আমার ছেলে ৭-৮ বছর ধরে কাভার্ডভ্যান চালিয়ে পরিবার টানছেন। তার নাজমুল ইসলাম নামের সাত বছরের একটি ছেলে ও মেহেরিন আনজু নামের দুই বছরের একটি মেয়ে রয়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জন করা ছেলেটা দুর্ঘটনার কারণে সব শেষ হয়ে গেছে। ঋণ করে চিকিৎসা করিয়েছি, এখনো করাচ্ছি। অনেক টাকা ঋণ হয়ে গেছে। কী করে শোধ করবো বুঝতে পারছি না।

আজিমের বাবা সুজাউল হক বলেন, আমার ছেলে বেঁচে ফিরেছেন এটাই বেশি। ঘটনাস্থলে ছেলের সঙ্গে থাকা কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে। সে হিসেবে ছেলে নতুন জীবন পেল। কিন্তু সে বেকার থাকায় আমরা মানবেতর জীবন যাপন করছি। আমি এক সময় কৃষি কাজ করতাম। এখন অসুস্থতার কারণে পারি না। ডিপো কর্তৃপক্ষ, গাড়ির মালিক ও গার্মেন্টস মালিক কেউ খবরও নিচ্ছে না। আমি বিএম ডিপো কর্তৃপক্ষের কাছে আমার ছেলের চিকিৎসা ব্যয় হওয়া অর্থ দেওয়ার জন্য দাবি জানাচ্ছি।
করেরহাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এনায়েত হোসেন নয়ন জাগো নিউজকে বলেন, আজিম উদ্দিন আমার ইউনিয়নের অলিনগর গ্রামের দরিদ্র পরিবারের সন্তান। সে কাভার্ডভ্যান চালিয়ে সংসার চালাতো। গত ৪ জুন বিএম ডিপোতে ভয়াবহ দুর্ঘটনায় সে মারাত্মক আহত হয়ে এখন বেকার হয়ে আছে। আমি কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ করবো আজিমের চিকিৎসার ব্যয় যেন বহন করে।
এ বিষয়ে বিএম ডিপোর ম্যানেজার (অপারেশন) জসীম উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, আমি যতটুকু জানি দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবার ও আহতদের চিকিৎসার জন্য সহযোগিতা করা হয়েছে। এ বিষয়ে অন্যরা দেখভাল করছে। তারপরও আমি খোঁজ খবর নিয়ে দেখছি।
গত ৪ জুন বিএম কনটেইনার ডিপোতে আগুন লাগে। পরে সেখানে থাকা রাসায়নিক ভর্তি কনটেইনারের বিস্ফোরণ ঘটে। ভয়াবহ এ দুর্ঘটনায় ৫১ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এর মধ্যে ৩৯ জনের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকি ১২ জনের মরদেহ শনাক্তে কাজ করছে সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবের ডিএনএ বিভাগের টিম।
আরএইচ/জেআইএম