ফসল সংরক্ষণে বারির ফ্রিজ ড্রায়ার পদ্ধতির উদ্ভাবন
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের একদল বিজ্ঞানী ফ্রিজ ড্রায়ার ব্যবহারের উন্নত পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন। যার মাধ্যমে ফল ও সবজি থেকে নিরাপদ এবং উচ্চ পুষ্টিগুণ সম্পন্ন রপ্তানিযোগ্য বিভিন্ন মুখরোচক পণ্য গুণগতমান বজায় রেখে উৎপন্ন করা যাবে। বিভিন্ন মৌসুমে উৎপাদিত যেসব ফল ও সবজি নষ্ট হয় এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেগুলোর অপচয় রোধ করা যাবে। এসব পণ্য বিদেশে রপ্তানির পাশাপাশি স্থানীয় বাজারও তৈরি হবে। কৃষিপণ্য বাণিজ্যিকীকরণে ফ্রিজ ড্রাইড পণ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
বারির পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, কৃষিপণ্য সংরক্ষণের অনেক পদ্ধতি এরইমধ্যে উদ্ভাবিত হয়েছে। সম্প্রতি ওই বিভাগের বিজ্ঞানীরা বিশেষ করে জাতীয় ফল কাঁঠালের বহুমুখী ব্যবহারের ২০টিরও অধিক পদ্ধতি ও খাদ্যদ্রব্য তৈরির উপকরণ উদ্ভাবন করে এরইমধ্যে দেশের কৃষক ও উদ্যোক্তাদের ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছেন।
বর্তমানে কাঁঠালের জুস, জ্যাম, জেলি, আচার, চাটনি, পাউডার, চিপস, কাটলেট, চিজ, আইসক্রিম, সিঙাড়া, সমুচা, ভেজিটেবল রোল, স্যান্ডউইচসহ অনেক খাদ্যপণ্য উৎপন্ন করে তা বাজারজাত করছে অনেক মাইক্রো ও কটেজ উদ্যোক্তারা। দিন দিন এগুলোর চাহিদাও বাড়ছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি থেকে শুরু করে দেশের বৃহৎ উদ্যোক্তারাও বাজারজাতের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। ফলে যেসব এলাকায় অধিক পরিমাণে কাঁঠাল উৎপন্ন হয়, সেসব এলাকায় কাঁঠালের অপচয় কমে আসছে এলাকাভিক্তিক উদ্যোক্তা গড়ে উঠছে।
শুধু কাঁঠালই নয় আম, আনারস, কলা, পেয়ারা, পেঁপেসহ নানা ধরনের মৌসুমি কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ফলে ক্রমেই কমে আসছে ফসলের অপচয় এবং দেশের জনসাধারণের পুষ্টির নিরাপত্তা বিধানে রাখছে সহায়ক ভূমিকা। এছাড়া প্রক্রিয়াজাতকৃত খাদ্য দ্রব্য তৈরি ও বিপণনের মাধ্যমে কৃষি পণ্যের বাজারও দেশে ও বিদেশে সম্প্রসারিত হচ্ছে যা পারিবারিক আয় বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান তৈরিতে রাখছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। মৌসুমি ফল ও সবজি অধিক উৎপাদনের ফলে তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের উদ্যোক্তা, বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের মাঝে ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে ।
এছাড়া প্রক্রিয়াজাত খাবার দেশের বিভিন্ন কৃষি বাজার, সুপারসপ, হোমডেলিভারি ও অন্যান্য ইপ্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছে। শক্তিশালী হচ্ছে কৃষি অর্থনীতির ভীত।
এরপরও থেমে নেই বিজ্ঞানীদের গবেষণা ও প্রচেষ্টা। এবার তারা যে প্রযুক্তিটি উদ্ভাবন করেছেন তা কৃষিকে রপ্তানিমুখী করতে রাখবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। ফ্রিজ ড্রায়ার পদ্ধতির মাধ্যমে কাঁঠাল, আম, আনারস, পেঁপে, জলপাই, কলাসহ সব ধরনের ফল ও সবজি দিয়ে কোনো ধরনের রং, রাসায়নিক দ্রব্য, তেল ব্যবহার ছাড়াই সম্পূর্ণ নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর ও উচ্চ পুষ্টিগুণ সম্পন্ন খাদ্যপণ্য উৎপাদন করা সম্ভব হবে। এতে বিশেষ করে মৌসুমি ফল ও সবজির অপচয় রোধ করার পাশাপাশি ভোক্তারা পাবে নিরাপদ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ বিভিন্ন ফল ও সবজির ড্রাইড প্রডাক্ট, যা সারাবছরই পাওয়া যাবে এবং রপ্তানি করাও সম্ভব হবে।
কীভাবে খাদ্যপণ্য তৈরিতে ফ্রিজ ড্রায়ার ব্যবহার করা যাবে?
প্রযুক্তিটির প্রিন্সিপাল ইনভেস্টিগেটর বা উদ্ভাবক বিএআরআইএর পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. ফেরদৌস চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, এ প্রযুক্তিতে নরমাল ডিপ ফ্রিজ ও ফ্রিজ ড্রায়ার ব্যবহার করা হয়। কোনো ফল বা সবজিকে যথাযথভাবে পরিচর্যা করে প্রথমে ডিপ ফ্রিজে নির্দিষ্ট সময় রেখে পরে ফ্রিজ ড্রায়ারে নিতে হয় এবং সেখানে মাইনাস ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পযার্য়ক্রমে ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা রাখলে ফল ও সবজি থেকে পানি বের হয়ে আসে। এতে ড্রায়ারে রাখা ফল ও সবজির রং, আকার ও পুষ্টিগুণ প্রায় অপরিবর্তিত থাকে এবং মচমচে হয়।
তিনি বলেন, আমরা যদি এ প্রযুক্তির মাধ্যমে কাঁঠাল চিপস তৈরি করতে চাই, তাহলে পরিপক্ক হওয়ার ঠিক আগের অবস্থায় খাজা টাইপের কাঁঠাল নির্বাচন করে কোষগুলোকে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আকারে স্লাইস করতে হবে। টুকরোগুলোর আকার এবং গুণগতমান ঠিক রাখার জন্য এতে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ সুগার সিরাপ যোগ করতে হয়। এরপর সেখান থেকে উঠিয়ে টুকরোগুলোকে প্যাকেটে রেখে ডিপ ফ্রিজে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টার মতো রাখতে হবে। এরপর টুকরোগুলোকে ফ্রিজ ড্রায়ারে পর্যায়ক্রমে প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি ড্রাইং করতে হবে। এ প্রক্রিয়ায় খুব ধীরগতিতে কাঁঠালের টুকরো থেকে পানি হয়। যেহেতু ১০ থেকে ১৫ শতাংশ সুগার সিরাপ যোগ করতে হয় তাই ফল ও সবজির টুকরোর আকৃতি, স্বাদ ও অন্যান্য গুণাগুণ বজায় থাকে। ফল বা সবজির প্রকৃত রং বজায় থেকে এটি একবারে মচমচে তেলে ভাজা চিপসের মতো পরিণত হবে যা খুবই আকর্ষণীয়।
ড. ফেরদৌস বলেন, যেহেতু তেলের কোনো ধরনের ব্যবহার হয় না। তাই স্বাদ ও পুষ্টিগুণ দীর্ঘ সময় বজায় থাকে। এই চিপম স্বাভাবিক পলিথিন মোড়কে রাখলে এক মাস রাখা যাবে। তবে ৫০ থেকে ৬০ মাইক্রোন অল্প পুরুত্ব ও ফয়েল মোড়কে রাখলে ছয় মাসের অধিক সময় পর্যন্ত ভালো থাকবে। এই চিপসের পুষ্টি উপাদান অনেক বেশি থাকে।
তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ভারত, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ অনেক উন্নত দেশে এ প্রডাক্ট বিভিন্ন সুপারশপে পাওয়া যায় এবং সেখানে ১০০ গ্রাম ফ্রিজ ড্রাইড চিপসের মূল্য বাংলাদেশি টাকায় ২০০ থেকে ২৫০ টাকা বা আরও বেশি। আমাদের দেশে খরচ বলতে ড্রায়ারের খরচ ও উৎকৃষ্টমানের খাজা টাইপের কাঁঠাল লাগবে। এছাড়া অন্য তেমন কোনো খরচ নেই। মৌসুমে কাঁঠালসহ অন্যান্য ফল ও সবজির দাম খুব কম থাকে এবং তা সংরক্ষণ করে বছরব্যাপী খাদ্য পণ্য তৈরি করা সম্ভব। যে ফ্রিজ ড্রায়ারটা ব্যবহার করা হবে, সেটি যদি বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে দেশের বাইরে থেকে নিয়ে আসা হয়, তাহলে শুরুতে একটু বেশি বিনিয়োগ করতে হবে এরপর সেই ড্রায়ারটি দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যাবে। যদি সরকারিভাবে বা কোনো প্রকল্প থেকে অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যায়, তাহলে এই ড্রায়ারটি স্থানীয়ভাবে ডেভেলপ করা হবে বা নিজেদের প্রযুক্তিতে তৈরি করা হবে। এক্ষেত্রে অনেক অর্থের যেমন সাশ্রয় হবে তেমনি উন্নত ও গুণগুতমান সম্পন্ন প্রডাক্ট অনায়াসে তৈরি করা যাবে।
কী কী ফল ও সবজি দিয়ে চিপস করা যায়?
ফ্রিজ ড্রাইং পদ্ধতিতে সব ধরনের ফল ও সবজি শুকানো যাবে। ফলে নানা ধরনের ফল ও সবজির গুণগতমান সম্পন্ন চিপস বা পাউডার তৈরি করা সম্ভব হবে। এখানে পুষ্টির তেমন কোনো অপচয় হয় না বলে পণ্যগুলো উচ্চ মানসম্পন্ন হবে। যেহেতু ফল ও সবজির টুকরো থেকে প্রয়োজনীয় পানি বের হওয়া ছাড়া পুষ্টির তেমন অপচয় হওয়ার কোনো সুযোগ নেই, সেকারণে পুষ্টিগুণ বজায় থাকে এবং ক্যালরিফিক ভ্যালু বা শক্তিমান অনেক বেশি থাকে। পৃথিবীর অনেক দেশেই এ পদ্ধতিতে গুণগতমান সম্পন্ন শুকনা পণ্য তৈরি করা হয়।
ড. ফেরদৌস চৌধুরী বলেন, এটি উচ্চমানের নিরাপদ ও আসল স্বাদের খাবার। কোনো ধরনের রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করার প্রয়োজন পড়ে না। কৃত্রিম রং যোগ করা হয় না, এমনকী তেলে ভাজারও প্রয়োজন পড়ে না। বর্তমানে সবাই স্বাস্থ্য সচেতন, কাজেই যত তেল জাতীয় খাবার পরিত্যাগ করা যায় এবং যত বেশি পুষ্টিগুণ সম্পন্ন খাবার সহজলভ্য করা যায় সেটিকে বিবেচনায় নিতে হবে। সেটি যদি বিবেচনা করি, তাহলে এটা সবোর্ত্তম প্রক্রিয়াজাতকৃত পণ্য বলে বিবেচিত হবে যা উদ্যোক্তাদের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ তৈরি করছে। এটি শুধুমাত্র যন্ত্রের মাধ্যমে উৎপন্ন করা হয় বিধায় প্রাথমিকভাবে ব্যয়টা একটু বেশি পড়বে। তবে স্থানীয়ভাবে ফ্রিজ ড্রায়ার তৈরি করা গেলে খরচ অনেকটা কমে আসবে এবং রক্ষণাবেক্ষণও সহজ হবে।
তিনি আরও বলেন, কাঁচা, পাকা ও সংরক্ষণ করা আম, কাঁঠাল, কলা, পেঁপে, আনারসসহ সব ধরনের ফল ও শাকসবজি ফ্রিজ ড্রায়ারে শুকানো যাবে। এর ফলে বিশাল অপচয় রোধ করা যাবে, উচ্চমানের খাদ্যপণ্য উৎপন্ন করা যাবে যা ফসলে মূল্য সংযোজন করবে। উল্লেখ্য যে, আম, কাঁঠাল, কলা, আনারস ইত্যাদি দেশের অনেক জায়গায় অধিক উৎপাদন হয় ও প্রকৃত মূল্য মৌসুমে না পাওয়ায় অনেক সময় তা জমিতে ফেলে দেওয়া হয় কিন্তু সেগুলো দিয়ে এই উচ্চমানের চিপস বা প্রডাক্ট উৎপন্ন করা যাবে। এসব প্রক্রিয়াজাত করা পণ্যের বিদেশে বিরাট বাজার রয়েছে। ফলে প্রযুক্তিটি উদ্যোক্তা তথা কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকারীদের মাঝে প্রসার ঘটানো গেলে রপ্তানি করারও বিরাট সুযোগ তৈরি হবে যা আমাদের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূণ্য অবদান রাখবে।
বারির পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও বিভাগীয় প্রধান মো. হাফিজুল হক খান জাগো নিউজকে বলেন, প্রযুক্তিটির ব্যবহার এখন সময়ের দাবি, যদিও প্রাথমিকভাবে যন্ত্রটি ব্যয়বহুল কিন্তু উৎকৃষ্টমানের নিরাপদ খাদ্যদ্রব্য তৈরিতে ফল ও সবজির বিভিন্ন পযার্য়ে প্রক্রিয়াজাতকরণে খুবই প্রয়োজন। এটি আমাদের বড় উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করবে এবং দেশের সহজলভ্য কাঁচামাল ব্যবহারে তৈরি করা পণ্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূণ্য অবদান রাখবে।
মো. আমিনুল ইসলাম/এমআরআর/এএসএম
সর্বশেষ - দেশজুড়ে
- ১ মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্ক্র্যাপ ইয়ার্ডে আগুন
- ২ সীমান্তে সড়ক নির্মাণ নিয়ে কথা রাখেনি বিএসএফ, ফের পতাকা বৈঠক
- ৩ নাগরিকত্ব জটিলতায় ঝুলে রইলো বিএনপি প্রার্থী ফাহিম চৌধুরীর ভাগ্য
- ৪ দাঁড়িপাল্লার পক্ষে না থাকলে ওয়াজ মাহফিল শোনার দরকার নাই
- ৫ স্কুলশিক্ষককে হাতুড়িপেটা করার অভিযোগ দুই কিশোরের বিরুদ্ধে