বাড়ি বাড়ি ঘুরে নারী ক্ষমতায়নে কাজ করেন তারা
পরিবারে নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর অর্থনৈতিক মুক্তি, বয়স্ক শিক্ষা, স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ, পরিত্যক্ত জমিতে ফসল উৎপাদন, ফসলের রোগবালাই দমন, বসতবাড়িতে পরিকল্পিত সবজি চাষে সহায়তা করতে ছুটছেন ২০ নারী। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে কাজ করে চলেছেন।
তারা সবাই অ্যাডরা বাংলাদেশের কমিউনিটি এমপাওয়ারমেন্ট প্রজেক্টের অধীনে কর্মরত নারী কর্মী। নারীদের সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে দিনরাত পরিশ্রম করেন তারা।
নারীর ভাগ্যবদল ও ক্ষমতায়নের এই কাজে নিয়োজিত আছেন হাওয়া আক্তার, শিখা দেবনাথ, শিরিনা আক্তার, সুমাইয়া আক্তার, হাফিজা খাতুন, মালা বসাক, তানজিলা তাবাসসুম, লাজিতা চাম্বুগং, দুলাল মিনজী, কমিউনিটি ওয়ার্কার সোমা দে, মৌসুমী সাহা, শিমা আক্তার, দ্বিপালী দাস, লিমা আক্তার, কানিজ ফাতেমা, ফাহিমা খাতুন, জান্নাতুল ইসলাম, তানিয়া আক্তারসহ আরও দুইজন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ঠিক পরে জনগণের মানবিক প্রয়োজনে সাড়া দিয়ে অ্যাডরা বাংলাদেশে কাজ শুরু করে। পরবর্তীকালে তারা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য এর কাজগুলোকে প্রসারিত করে। অ্যাডরা বাংলাদেশ সরকারের নিবন্ধিত একটি বেসরকারি সংস্থা। এটি ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুর উপজেলায় অবস্থিত। উপজেলার বোকাইনগর, রামগোপালপুর, অচিন্তপুর, মইলাকান্দা, গৌরীপুর সদর, মাওহা, ডৌহাখনা ও সহনাটী ইউনিয়নের ৯৮টি গ্রামে কাজ করছে সংস্থাটি।
এই ৯৮টি গ্রামে নারী সদস্য সংখ্যা রয়েছে ২ হাজার ৫০০ জন। নারীদের সহায়ক হিসেবে পাশাপাশি রয়েছে ১ হাজার ৭৫০ জন পুরুষ সদস্য। প্রতি ২৫ জন করে নারী ১০০টি দলে ভাগ হয়ে কাজ করেন। এর মাঝে ১০টি দল নিয়ে একটি সমিতি গঠন করা হয়। ১০টি দলের নারী সদস্যরা নির্দিষ্ট মেয়াদী সমিতি গঠন করে প্রতিমাসে দুইবার করে সঞ্চয় জমা করেন। ওই সঞ্চয় জমা করার জন্য ব্যাংক অ্যাকাউন্ট করে দেওয়া হয় নারীদের। পরে তাদের জমানো টাকা থেকে ঋণ নিয়ে নিজেরা স্বাবলম্বী হন। নির্দিষ্ট একটি মেয়াদ শেষে অ্যাডরা সমিতিগুলোকে সরকারি রেজিস্ট্রেশন করে দেয়।
ওই ১০টি সমিতি অ্যাডরা বাংলাদেশের কমিউনিটি এমপাওয়ারমেন্ট প্রজেক্টের ২০ জন মাঠ কর্মী পরিচালনা করেন। ওই মাঠকর্মীরা সমিতির নারী সদস্যদের নিয়মিত নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর অর্থনৈতিক মুক্তি, বয়স্ক শিক্ষা, স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ, পরিত্যক্ত জমিতে ফসল উৎপাদন, ফসলের রোগবালাই দমন, বসতবাড়িতে পরিকল্পিত সবজি চাষসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বী করে তোলেন।

কথা হয় বাংলাদেশের কমিউনিটি এমপাওয়ারমেন্ট প্রজেক্টে ট্রেনিং নেওয়া কয়েকজন স্বাবলম্বী নারীর সঙ্গে। তারা জানান, বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিয়ে সবজি চাষ করে লাভবান হয়েছেন। খুঁজে পেয়েছেন ক্ষুধা আর দরিদ্রতা বিমোচনের নতুন পথ। জলাবদ্ধতায় সবজি চাষের নতুন এক পদ্ধতির নাম টাওয়ার পদ্ধতি। এই পদ্ধতি বিস্তারে নারী কর্মীরা ছুটে চলছেন বন্যা ও জলাবদ্ধ এলাকায়। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে বন্যাকবলিক বা বর্ষা মৌসুমে পানিতেই সবজি চাষ করছেন।
আইল ফসল উৎপাদন করে ভাগ্যের চাকা বদলে দিয়েছেন গৃহিণীরা। তাদেরই একজন মিনা বেগম। তিনি বলেন, জমির আইলে প্রায় ছয় হাজার টাকা খরচ করে এরইমধ্যে ২০ হাজার টাকার ফসল বিক্রি করেছি। আরও সাত-আট হাজার টাকা আয় হবে। এই আয়ে মিটে যাচ্ছে দুই সন্তানের স্কুলের খরচ।

রামগোপালপুরের আব্দুল্লাহর স্ত্রী ফাতেমা খাতুন বলেন, আইলে ফসল উৎপাদন করে বেশ লাভবান হয়েছি। আমার দুই ছেলে ও এক মেয়ে স্কুলে যাচ্ছে। সংসারে সচ্ছলতা ফিরে এসেছে।
রামগোপালপুর ইউনিয়নের কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট অরগানাইজার (সিডিও) সীমা রানী দে বলেন, যতদূর চোখ যায়, ততদূর আমরা ধানক্ষেতে সবজির দেওয়াল করে দিয়েছি। এই অঞ্চলের কৃষকদের সহযোগিতায় গৃহিণীরা অতিরিক্ত মুনাফা পাচ্ছেন। এই মুনাফা দিয়ে নারীরা পরিবারে সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনছেন।

অ্যাডরা বাংলাদেশ কমিউনিটি এমপাওয়ারমেন্ট প্রজেক্টের ট্রেইনার নাসরিন আক্তার বলেন, আমরা নারীদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি। এর মধ্যে রয়েছে হাতের কাজ, সেলাই কাজ, বিভিন্ন কুটির শিল্প, হাঁস-মুরগি পালন, গরু পালন। এসব ট্রেনিং করে নারীরা পরিবারের সচ্ছলতা ফেরাতে সহায়তা করছেন।
অ্যাডরা বাংলাদেশের কমিউনিটি এমপাওয়ারমেন্ট প্রজেক্টের ম্যানেজার জুয়েল শিকদার বলেন, অ্যাডরা অংশীদারত্ব ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপের ক্ষমতায়নের মাধ্যমে ন্যায় ও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে দরিদ্র ও দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে কাজ করে। এটি সুইডেনের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত হয়। আমাদের ২০ জন মাঠকর্মীসহ মোট ২৭ জন সদস্য রয়েছে। প্রত্যেকেই নারীর ক্ষমতায়ন, নারী মুক্তির জন্য কাজ করছেন।
এমআরআর/এএসএম