আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের দাপটে হারিয়ে যাচ্ছে হারমোনিয়াম-তবলা
আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের প্রভাবে ফরিদপুরে হারিয়ে যেতে বসেছে দেশীয় বাদ্যযন্ত্র। তাই হারমোনিয়াম-তবলা তৈরিতে জড়িতদের সেই সুদিনও আর নেই। কেউ কেউ কোনোমতে পারিবারিক পেশা আগলে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। আবার কেউ পেশা বদলে অন্য কাজ করছেন।
একটা সময় ছিল যখন গ্রাম বাংলায় লোক সংগীত, যাত্রাপালা, নাট্ক ও পালাগানে হারমোনিয়াম, তবলা দোতরার মতো দেশীয় বাদ্যযন্ত্র শোভা পেত। সঙ্গীত চর্চার বড় অংশ জুড়ে থাকত বিভিন্ন দেশীয় তৈরি বাদ্যযন্ত্র। কালের বিবর্তনে এবং আধুনিক সংস্কৃতির সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে হারিয়ে গেছে অনেক বাদ্যযন্ত্র।
আরও পড়ুন: বাদ্যযন্ত্র না, বাদক বিক্রি হন যে হাটে
ফরিদপুর সদরসহ বিভিন্ন উপজেলায় প্রায় ৬০ থেকে ৭০ বছর ধরে হারমোনিয়াম, তবলা, বাঁশি, ঢাক, ঢোল, খোল তৈরি করে আসছেন কয়েকটি দোকানের কারিগররা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০ বছর আগেও হারমোনিয়াম, তবলার বেচাবিক্রি বেশ ভালো ছিল। তখন প্রতিদিনই কাজের অর্ডার থাকতো। ক্রেতারা রেডিমেটের পাশাপাশি অর্ডার দিয়েও এসব বাদ্যযন্ত্র কিনতেন। কিন্তু বর্তমান ডিজিটাল যুগে দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার কমে যাচ্ছে। এখন দখল নিয়েছে ইলেকট্রিক গিটার, কিবোর্ড, পিয়ানো, ড্রামসেট, ভায়োলিনের মতো ভিনদেশি বাদ্যযন্ত্র। ফলে এ শিল্পে সেই সুদিন আর নেই। কাজ-কর্মও কমে গেছে। অনেক কারিগর টিকে থাকতে না পেরে জীবিকানির্বাহের জন্য অন্য পেশা বেছে নিয়েছেন।
আরও পড়ুন: ‘অহন আর আগের মতো কাম পাওয়া যায় না’
ফরিদপুর শহরের ‘ভিম অ্যান্ড কোং’-এর মালিক সংকর সরকার জাগো নিউজকে বলেন, প্রতিষ্ঠানটি ৮০ বছরের পুরোনো। এটা আমাদের পারিবারিক ব্যবসা। এক সময়ে আমার বাবা করতেন। এখন আমি করছি। আমার বয়স যখন ১৮ তখন থেকে এই পেশায় জড়িত। এখন কাজ-কর্ম অনেক কমে গেছে। অনেকেই টিকতে না পেরে অন্য পেশা বেছে নিয়েছেন। বাবা-দাদার পুরোনো পেশা তাই ছাড়তে পারি না। কোনোমতে আঁকড়ে ধরে টিকে আছি।

বোয়ালমারী উপজেলা সদরের দেশীয় বাদ্যযন্ত্র তৈরির কারিগর সুনীল কুমার জাগো নিউজকে বলেন, ৪৫ বছরের মতো এ পেশায় জড়িত। গান-বাজনা কমে গেছে। আগের মতো গানও নেই। দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের ব্যাবহারও কম। কোনোমতে টিকে আছি। দীর্ঘদিনের এ পেশায় সংসারও চলে কোনোরকমে।
আরও পড়ুন: অর্ধযুগ পর খুলল জাদুঘরের বাদ্যযন্ত্র গ্যালারি
বোয়ালমারী উপজেলার টোংরাইল গ্রামের পল্লিগায়ক নিখিল চন্দ্র বিশ্বাস জাগো নিউজকে বলেন, প্রায় ৫০ বছর ধরে পল্লিগ্রামের বৈঠকি গানের সঙ্গে জড়িত। এ গানের প্রধান বাদ্যযন্ত্র ছিল হারমোনিয়াম, ঢোল, খোল, বাঁশি, জুড়ি, তবলা। আগে প্রায় গ্রামে দুই-চারটি হারমোনিয়াম তবলা ছিল। আর এখন দুই-তিন গ্রাম খুঁজেও একটি হারমোনিয়াম একজোড়া তবলা পাওয়া যাবে না। আগে গ্রামে সন্ধ্যার হারিকেনের আলোতে বৈঠকিসহ নানা গানের আসর বসতো। এখন সেই গানও নেই, সেসব বাদ্যযন্ত্রের কদরও নেই।

ফরিদপুরের সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘আজকের প্রজন্ম’ ও ‘শিবাজি নিকেতন’র সাধারণ সম্পাদক বিজয় পোদ্দার জাগো নিউজকে বলেন, এখনকার নতুন প্রজন্ম এত কষ্ট করে গান-বাজনা শিখতে আগ্রহী নয়। সংগীতে হারমোনিয়াম-তবলা, ঢোল-খোল, বাঁশির ব্যবহার হ্রাস পাচ্ছে। তুলনামূলক সহজ হওয়ায় বর্তমান প্রজন্ম ইলেকট্রিক বাদ্যযন্ত্রের দিকে বেশি ঝুঁকছে। দেশীয় সংস্কৃতি বাঁচাতে যথাযথভাবে এই শিল্পের সংরক্ষণের দাবি আমাদের মতো সাংস্কৃতিক কর্মীদের।
এ বিষয়ে ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. কামরুল আহসান তালুকদার বলেন, স্থানীয় বিসিকের মাধ্যমে দেশীয় বাদ্যযন্ত্র টিকিয়ে রাখতে সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এন কে বি নয়ন/এমআরআর/জেআইএম