ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

তাদেরও ক্লাস নিতে হয়

প্রকাশিত: ১২:০৭ পিএম, ০৫ এপ্রিল ২০১৬

স্কুলে আসার পর থেকেই ছোটাছুটিতে ব্যস্ত তারা। এক ক্লাসের শিশুদের নিবৃত্ত করতে না করতেই আরেক ক্লাসে শুরু হয়ে যায় চিৎকার-চেঁচামেচি। যে সময়টাতে শিশুদের মগ্ন থাকার কথা অধ্যয়নে। সে সময়টা কাটে তাদের হৈ-হুল্লোড় আর লাফালাফি করে।

ওদিকে, প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রতি ক্লাসে ঢু মারতে মারতেই সময় শেষ হয়ে যায় স্কুলের একমাত্র শিক্ষিকার। শিশুদের বশে রাখতে আর তাদের দেখভাল করতেই দিন শেষ হয়ে যায়। ১৫৯ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একা শিক্ষক হিসেবে পাঠদান দেওয়া সম্ভব হয়ে ওঠেনা ওই শিক্ষিকার। তাই বাধ্য হয়ে স্কুলের ছোট ছোট শিক্ষার্থীরাই প্রতিদিন শিক্ষকের ভূমিকায় ক্লাস নিয়ে থাকে।

Rajbari

২য় শ্রেণির সুমি জানালো, আপা ছাড়া স্কুলে আর কোনো শিক্ষক নাই। উনি সব ক্লাস নিতে পারে না তাই আমাদের মধ্য থেকে ভালো ছাত্র-ছাত্রীরা মাঝে মধ্যে ক্লাস নেয়।
 
এভাবেই চলছে রাজবাড়ী জেলা সদরের বরাট ইউনিয়নের কাশিমনগর দেলন্দী এলাকার ফুরসাহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পড়াশোনা।

অথচ দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে শিক্ষা যখন বিশেষভাবে অগ্রাধিকার পাচ্ছে, শিক্ষায় সরকারের গুরুত্ব বাড়ছে। প্রাথমিক শিক্ষা সর্বজনীন করে তুলতে চলছে জোর তোড়জোড়। সে সময় রাজবাড়ীর এ স্কুলের শিক্ষার চিত্র হতাশ করে তুলেছে সচেতন মহল ও সংশ্লিষ্টদের।

সম্প্রতি সরেজমিনে স্কুলটি ঘুরে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জেলা সদরের বরাট ইউনিয়নের পদ্মা নদীর কোল ঘেষে নির্মিত স্কুলটি। ১৯৭২ সালে স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত হলেও রেজিস্ট্রেশন হয় ১৯৭৯ সালে এবং জাতীয়করণ হয় ২০১৩ সালে। স্কুলের চারপাশে চরের আবাদি কৃষি জমি ও বসতবাড়ি।

Rajbari

নদী শাসনের জন্য তৈরি বাঁধের রাস্তা থেকে নেমে খানিকাটা হেঁটে কৃষি জমির আইল দিয়ে যেতে হয় স্কুলটিতে। বলার মতো কোনো শ্রী নেই স্কুলটির। শিক্ষার্থীদের পিপাসা মিটানোর জন্য একটি টিউবওয়েল থাকলেও কয়েক মাস ধরে সেটিও অকেজো। পিপাসা নিবারণের জন্য শিক্ষার্থী ও শিক্ষককে যেতে হয় স্কুল সংলগ্ন বাড়িতে।

জানা যায়, ফুরসাহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকের পদ রয়েছে ৫টি, কিন্তু আছেন ১ জন। তিনি হলেন, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ফাতেমা খাতুন। তবে তাকে সহযোগিতার জন্য গত ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ডেপুটেশনে আসেন বরাট ভাকলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন ও ১৪ মার্চ বামনীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বাবন নামে আরেকজন শিক্ষককে আনা হয়।

স্কুল সূত্র জানায়, গত বছরের ১৯ আগস্ট আবুল কালাম আজাদ ও ৩০ নভেম্বর আব্দুর রহমান নামের দুই শিক্ষক অবসরে যান। সে থেকেই স্কুলটি একজন শিক্ষিকা পরিচালনা করছেন।

স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখা মিললো চমৎকার দৃশ্যের। চোখে পড়লো ৫ম শ্রেণিতে ক্লাস নিচ্ছেন ধারে আসা শিক্ষক, ৪র্থ শ্রেণিতে একমাত্র শিক্ষিকা নিজেই। আর ৩য় শেণিতে আশা নামের একটি শিশু ক্লাস নিচ্ছে, সেও ওই শ্রেণির ছাত্রী। আশা শিক্ষকের মতো করে বই হাতে নিয়ে এদিক ওদিক ঘুরে হেঁটে হেঁটে উচ্চস্বরে ক্লাস নিচ্ছে। পরে জানা গেলো শিক্ষক সঙ্কট থাকায় বাধ্য হয়েই প্রতিটি ক্লাসের শিক্ষার্থীরা নিজেরাই নিজেদের পড়ায়।

Rajbari

এ বিষয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি আরজু প্রামাণিক জানান, এখানে প্রতি মাসে মাসিক মিটিং করে তার রেজুলেশন অফিসে পাঠানো হয়। তাছাড়া এখানে অফিসাররা আসলে জানানো হয় সমস্যার কথা, কিন্তু লেখাপড়ার অনেক ক্ষতি হচ্ছে।

স্কুলের শিক্ষার্থীরা জানায়, স্কুলের বড় সমস্য হচ্ছে এখানে আসার রাস্তা-ঘাট ভাঙা। বর্ষার শুরতেই নদীর পানিতে এ এলাকা তলিয়ে যায়। রাস্তা-ঘাট না থাকায় তাদের যাতায়াতে অনেক সমস্যা হয় বলেই শিক্ষকরা এখানে আসতে চায় না। তাদের দাবি বাঁধের রাস্তা থেকে স্কুল পর্যন্ত একটি রাস্তা করা হোক।

ফুরসাহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ফাতেমা খাতুন জানান, শিক্ষক আমি একাই। আরেকজন ডেপুটেশন শিক্ষক পেয়েছি। উনার সহযোগিতায় শ্রেণিকক্ষে পাঠদান চলছে। এভাবে পাঠদানে খুব সমস্যা হচ্ছে। কারণ দুজন শিক্ষক দিয়ে সম্ভব না স্কুল পরিচালনা করা। ১৫৯ শিক্ষার্থী পাঠদানে দু’জন শিক্ষকের জন্য খুবই কষ্টকর। এখানে যেহেতু পদ আছে সেক্ষেত্রে আরো শিক্ষক পেলে শতভাগ পাঠদান সম্ভব হতো। তবে ১৪ মার্চ ডেপুটেশনে আরেকজন শিক্ষক পেয়েছি।

সদর উপজেলা শিক্ষা অফিসার নাছরিন আক্তার জানান, সদর উপজেলায় ১৩৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এতে অনুমোদিত পদ আছে ৭৮৫। শূন্য পদ আছে ১০২টি। এটি সদ্য জাতীয়করণকৃত বিদ্যালয় তাতে অনুমোদিত পদ আছে ৪টি। স্কুলের একজন শিক্ষক এলপিআরে গেলে আমরা মন্ত্রণালয়ে জানিয়েছি।

এমএএস/এবিএস