ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

মেঘ দেখেই পাহাড় কাটার মহোৎসব

প্রকাশিত: ০৫:২৬ এএম, ০৯ এপ্রিল ২০১৬

আকাশে মেঘের গর্জন এবং বিজলীর চমকানি জানান দিচ্ছে বর্ষা ঋতু অচিরেই হাজির হচ্ছে। চৈত্রের খরতাপে হালকা ও মাঝারি বৃষ্টিপাতেও নামছে পাহাড়ী ঢল। তাই এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এক শ্রেণির মানুষ গত কয়েক দিনের মেঘলা ও বৃষ্টিস্নাত আবহাওয়ার সুযোগে কক্সবাজার জেলাব্যাপি নেমেছে পাহাড় কাটা ‘উৎসবে’। এ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন পরিবেশবাদীরা।

গত সপ্তাহের তিন দিন রাতের বেলায় হালকা বৃষ্টিপাত হয়েছে। পাহাড় বেয়ে নামা পানিতে বন্যা না হলেও নদী ও নালায় স্রোত কম ছিল না। এমনটি দেখে এক শ্রেণির ভূমিগ্রাসী কক্সবাজার শহরসহ জেলাব্যাপী পাহাড় কাটা শুরু করেছে।

এর ফলে এক দিকে পর্যটনগরীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বিনষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে জীব বৈচিত্র্য। পাহাড় কাটার ফলে বাড়ছে ভূমি ধসের ঝুঁকিও। জেলায় গত ৫ বছরে পাহাড় ধসে ২ শতাধিক নারী-পুরুষ ও শিশু মর্মান্তিকভাবে নিহত হয়েছে।

Paher

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কক্সবাজার শহরের ৫ শতাধিক স্থানে এবং জেলার অন্যান্য এলাকার আরও ২ হাজারের বেশি স্থানে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে পাহাড় কাটা চলছে। পাহাড় কেটে নির্মাণ করা হচ্ছে বসতি, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থাপনা। আবার অনেকেই সরকারি পাহাড়ী জমি দখল করে পাহাড় কেটে প্লট তৈরি করে বিক্রি করছে।

কক্সবাজার শহরের ঘোনার পাড়া এলাকায় কোনো প্রকার অনুমতি ছাড়া দুই’শ থেকে আড়াই’শ ফুট উঁচু বিশাল পাহাড় কেটে তৈরি করা হচ্ছে প্লট ও রাস্তা। এখানে কর্মরত শ্রমিক মোহাম্মদ আলম ও কাশেম জানান, কক্সবাজার জেলা প্রশাসনে কর্মরত জেলা কলেক্টরেট ৩য় শ্রেণির কর্মচারী সমিতির সভাপতির নেতৃত্বে তারা এ পাহাড় কাটছেন।

একইভাবে শহরতলীর বিসিক শিল্পনগরী এলাকায় বন বিভাগের মালিকানাধীন প্রায় ১০ একর পাহাড় দখল করে চলছে পাহাড় কাটা। পাহাড় কেটে এখানে তৈরি করা হচ্ছে চার শতক আকারের একেকটি প্লট। এখানে কর্মরত শ্রমিক আমির হোসেন জানান, স্থানীয় প্রভাবশালী একটি গ্রুপ এসব প্লট ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা করে বিক্রি করছে।

অভিযোগ রয়েছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে এভাবে পাহাড় কাটা চলছে।

Paher

বন বিভাগের স্থানীয় লিংক রোড বিট কর্মকর্তা তৌহিদুর রহমান বন বিভাগের জমি দখলের কথা স্বীকার করে বলেন, জনবল সংকটের কারণে সঠিক সময়ে অভিযান পরিচালনা করা যাচ্ছে না। তারপরও সাধ্যমত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

শুধু কক্সবাজার শহর ও লিংক রোড নয়, জেলার ৮ উপজেলায় একইভাবে চলছে পাহাড় কাটা।

কক্সবাজার বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, প্রশাসনের কতিপয় কর্মকর্তার দায়িত্বে অবহেলা ও রাজনৈতিক নেতাদের সদিচ্ছার অভাবে এভাবে কক্সবাজারে পাহাড় কাটা বাড়ছে।

এ প্রসঙ্গে পরিবেশ অধিদফতর কক্সবাজার কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সরদার শরিফুল ইসলাম বলেন, পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদফতরের পক্ষ থেকে প্রতিনিয়তই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এমনকি গত তিন বছরে পাহাড় কাটা সংক্রান্ত দুই শতাধিক মামলাও করা হয়েছে।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন বলেন, পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসন সব সময় শক্ত অবস্থানে রয়েছে। খবর পাওয়া মাত্রই অভিযান পরিচালনা করা হয়।

Paher

উল্লেখ্য, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি জেলায় সরকারি অনুমোদন ছাড়া যেকোনো ধরনের পাহাড় কাটা বন্ধ রাখার নির্দেশ রয়েছে হাইকোর্টের। ২০১২ সালের ১৯ মার্চ বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন ও বিচারপতি জাহাঙ্গীর আলমের সমন্বিত বেঞ্চ এ নির্দেশ দেন। পাহাড় কেটে স্থাপনা নির্মাণ পরিবেশের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় বয়ে আনবে। একই সঙ্গে ভূমি ধসে যে কোনো সময় বিপুল প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে এমনটা উল্লেখ করে দায়ের করা এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ নির্দেশ দেন আদালত।

জেলা প্রশাসনের ত্রাণ শাখা সূত্রে জানা যায়, ২০১০ সালে পাহাড় ধসে সেনাবাহিনীর সাত সদস্যসহ প্রাণ হারান ৫৮ জন। পরের বছর ২০১১ সালে জেলার বিভিন্ন স্থানে একইভাবে ২১ জনের মৃত্যু হয়। এছাড়া ২০১২ সালে পাহাড় ধসে মারা যান ৬৪ জন।

কর্মকর্তারা জানান, এরপর ২০১৩ ও ২০১৪ এ  দুই বছরে পাহাড় ধসে বড় ধরনের কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু ২০১৫ সালে আবারও বেড়ে যায় পাহাড় ধসে নিহতের সংখ্যা। এ বছর খোদ জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের দুই কিলোমিটারের মধ্যে পাহাড় ধসে একই পরিবারের মা-মেয়েসহ ৫ জন মারা যান। এছাড়া জেলার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ১৫ জন মারা যান।

এসএস/এমএস