চাকমাদের মূলবিজু উৎসব ১৩ এপ্রিল
প্রতি বছরের মতো ১৩ এপ্রিল চাকমারা পালন করবে মূলবিজু। এদিন যার যা সাধ্য-সামর্থ্য অনুযায়ী ঘরে ঘরে আয়োজন করা হয় সবার জন্য নানা খানা-পিনার উৎসব। উৎসবে একসঙ্গে মেতে ওঠে সব বয়সের নারী-পুরুষ। এদিন ঘরে যেই উঠুক, যেই বয়সেরই হোক সবাই অতিথি-আপনজন। সাধ্যমতো আপ্যায়ন করা হয় অতিথিদের।
তবে তিন দিনের মূল উৎসব ঘরে ঘরে শুরু হবে ১২ এপ্রিল ভোরে নদীর জলে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে। চাকমারা এই দিবসটি পালন করে ফুলবিজু নামে। এদিন মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা জানিয়ে পুরনো বছরের সব দুঃখ-গ্লানি, আপদ-বিপদ ফুল দিয়ে পানিতে ভাসিয়ে দেয় তারা। শপথ নেয় নতুন বছরে জীবনের সফলতা, মঙ্গল, সুখ-শান্তির প্রার্থনায় নতুন উদ্যমে এগিয়ে যাওয়ার।
আর শেষ দিন নববর্ষের পহেলা বৈশাখ চাকমারা পালন করে গোজ্যাপোজ্যে দিন নামে। এদিন সাধারণত মন্দিরে মন্দিরে ধর্মীয় উৎসব উদযাপিত হয়ে থাকে। ঘরের বয়স্কদের সম্মানে আয়োজন চলে প্রীতি ভোজের। ভোরে ও সন্ধ্যায় জ্বালানো হয় মঙ্গলপ্রদীপ। সবাই মত্ত হয় ধর্মীয় ও পুণ্যকর্মে। তাদের বিশ্বাস এসব পুণ্যকর্ম দ্বারা অর্জিত হবে ভবিষ্যতের অনাবিল সুখ-শান্তি। একই সঙ্গে একযোগে নিজ নিজ ভাষা ও রীতিতে তিন দিনের উৎসবে মেতে ওঠে অন্য পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীর লোকজন।
উৎসবটিকে চাকমাদের বিজুর পাশাপাশি মারমারা সাংগ্রাই, ত্রিপুরারা বৈসুক, তঞ্চঙ্গ্যারা বিষু, রাখাইনরা সাংক্রোন ও অহমিয়া জনগোষ্ঠী বিহু নামে পালন করে। প্রতি বছর চৈত্র সংক্রান্তিতে বর্ষ বিদায় ও বরণ উপলক্ষে পালন করা ঐতিহ্যবাহী এই উৎসবটির প্রথমদিনে চাকমারা ফুলবিজু, মারমারা পাইংছোয়াই, ত্রিপুরারা হারিবৈসুক, দ্বিতীয় দিন অর্থ্যাৎ উৎসবের প্রধান দিবসটিকে চাকমারা মুলবিজু, মারমারা সাংগ্রাইং আক্যা আর ত্রিপুরারা বৈসুকমা এবং শেষদিন বাংলা নববর্ষের প্রথমদিন চাকমারা গোজ্যেপোজ্যা দিন, মারমারা সাংগ্রাইং আপ্যাইং ও ত্রিপুরারা বিসিকাতাল নামে উদযাপন করে।
উৎসব উপলক্ষে প্রতি বছর আয়োজন করা হয় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, মেলা, সংস্কৃতি, খেলাধূলাসহ নানা কর্মসূচি। বৈসাবির সঙ্গে একাট্টা হয়ে আবহমান বাংলার নববর্ষ বরণ উপলক্ষে বৈশাখীর বর্ণাঢ্য কর্মসূচি ঘিরে মেতে ওঠে পাহাড়ি জনপদ রাঙামাটি।
এবারও উৎসবটিকে সামনে রেখে ঘরে ঘরে চলছে আয়োজনের ব্যাপক প্রস্তুতি। শহরসহ তিন পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের পাহাড়ি পল্লীগুলোতে উৎসবের আমেজ সর্বত্র। আর মাত্র দুইদিন পেরুলেই পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীর প্রাণের উৎসব। পাহাড়িদের ঐতিহ্যবাহী এই প্রধান সামাজিক উৎসবটি পরিচিত বৈসুক-সাংগ্রাই-বিজু তিন জাতিগোষ্ঠীর ভাষার আদ্যাক্ষর নিয়ে বৈসাবি নামে।
চৈত্র সংক্রান্তী এবং বাংলাবর্ষ বিদায় ও বরণ উপলক্ষে রাঙামাটিতে উদযাপিত হচ্ছে বৈসাবি-বৈশাখীর বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালা। রাঙামাটিতে ‘জুম্ম সংস্কৃতি বিলুপ্তির ষড়যন্ত্র প্রতিরোধে ঐক্যবদ্ধ হোন’ এমন ডাকে বিজু সাংগ্রাই বিষু বিহু সাংক্রোন উদযাপন কমিটি-২০১৬ আয়োজিত তিন দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য কর্মসূচি শুরু হচ্ছে ১০ এপ্রিল। সকাল ৯টায় রাঙামাটি পৌরসভা প্রাঙ্গনে তিন দিনের কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন জাতীয় সংসদের পার্বত্য রাঙ্গামাটি আসনের সদস্য ঊষাতন তালুকদার। উদ্বোধনীর পর শহরে বের করা হবে এক বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। বিকেলে রাঙামাটি স্টেডিয়ামে আয়োজন করা হয়েছে শিশু চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা।
এছাড়া ১১ এপ্রিল বিকাল ৫টায় রাঙামাটি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ১২ এপ্রিল সমাপনীর দিন ভোর ৬টায় শহরের রাজবন বিহার পূর্ব ঘাটে আনুষ্ঠানিক ফুল ভাসনো ও বিকেল ৩টায় রাঙামাটি স্টেডিয়ামে ঐতিহ্যবাহী বলী খেলা অনুষ্ঠিত হবে। ঘরে ঘরে বিজুর মূল উৎসব পালিত হবে ১২-১৪ এপ্রিল। এছাড়া ১৫ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হবে মারমা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী জলোৎসব।
একই সঙ্গে বৈশাখী উৎসব উপলক্ষে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় প্রাঙ্গনে ১০-১৪ এপ্রিল আয়োজন করা হয়েছে পাঁচ দিনব্যাপী বৈশাখী মেলা। আজ বিকাল ৩টায় এ মেলার উদ্বোধন হবে। এছাড়া নববর্ষের পহেলা বৈশাখ ১৪ এপ্রিল জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হবে দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালা। এতে রয়েছে ওই দিন সকালে শহরে আনন্দ শোভাযাত্রা, যেমন খুশি তেমন সাজো, বৈশাখী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পান্তা উৎসব, বিকেলে শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, বলী খেলা, বিনোদনমূলক ক্রীড়ানুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
এর আগে ৪-৬ এপ্রিল পাহাড়ি সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী প্রাণের উৎসব বৈসাবি উপলক্ষে রাঙামাটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট আয়োজিত তিন দিনব্যাপী বিজু সাংগ্রাই বৈসুক বিষু মেলা-২০১৬ শেষ হয়েছে। বৃহস্পতিবার জেলা শিল্পকলা একাডেমী মিলনায়তনে জুম ঈসথেটিকস কাউন্সিলের (জাক) উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়েছে সম্মাননা ও বিচিত্রা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
এফএ/এবিএস