গোপালগঞ্জের ডাকাত আতঙ্কে গ্রামবাসীর নির্ঘুম রাত
গোপালগঞ্জে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত চারটি গ্রামের মানুষ ডাকাত আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন। সদর উপজেলার করপাড়া ইউনিয়নের পানাইল, ডেমাকুড়, পুইশুর ও তাড়গ্রামে দীর্ঘদিন ধরে এ ঘটনা ঘটে আসছে। এ কারণে ওইসব এলাকার সাধারণ মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, রাত নেমে এলেই এলাকার নারী পুরুষ নির্বিশেষে রাতভর পাহারা দিয়ে নিজেদের নিরাপত্তা দিচ্ছেন। অনেকবার বৌলতলী পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রসহ বিভিন্ন জায়গায় প্রতিকার, নিরাপত্তা জোরদার ও চৌকিদারি পাহারা দেয়ার দাবি জানানো সত্ত্বেও পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে গ্রামবাসীর অভিযোগ।
ডাকাতরা দলে দলে বাড়িতে ঢুকে কেবল লুটপাটই করছে না, সেই সঙ্গে তারা নারী ও কিশোরীদের নির্যাতনও করছে।
এলাকার একদল দুষ্কৃতিকারী উদ্দেশ্যেমূলকভাবে সংখ্যালঘূ অধ্যুষিত এসব গ্রামে অত্যাচার নির্যাতন ও ডাকাতির ঘটনা ঘটায় বলে এলাকাবাসী জানিয়েছেন। অনেকে তাদেরকে চিনলেও ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পায় না বা সুনির্দ্দিষ্ট কোনো অভিযোগ করতে তারা ভয় পায়।
গত সোমবার রাতে ডেমাকুড় গ্রামের পোলট্রি ব্যবসায়ী গোবিন্দ বিশ্বাসের (৪২) বাড়িতে ডাকাতরা হামলা করে মালামাল নেয়ার চেষ্টা করলে তিনি তাদের বাধা দেয়ার চেষ্টা করেন। এসময় ডাকাতরা তাকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে এবং তার স্ত্রীকে মারধর করেন।
এ ঘটনার পরের দিন পুলিশ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে পানাইল গ্রামে হাবোল বিশ্বাসের ছেলে কপিল বিশ্বাস (৩২), সৈয়দ শেখের ছেলে রানা (৩০) ও জিন্নাত মিয়ার ছেলে জজ মিয়াকে আটক করে এবং মুখোশ, সেন্ডেল ও দাসহ ডাকাতির আলামত উদ্ধার করে।
এছাড়া এর আগে পানাইল গ্রামের ফটিক বিশ্বাস ও পবিত্র বিশ্বাস, নজরুল মোল্লা ও অমূল্য বিশ্বাসের বাড়িতেও ডাকাতি হয়।
পানাইল গ্রামের সন্তোষ বিশ্বাস অভিযোগ করে জানান, আমাদের এলাকায় প্রায় ডাকাতি হচ্ছে। আমরা আতঙ্কিত। আমাদের এলাকায় কেউ কোনো ঋণ উত্তোলন, ফসল ও মাছ বিক্রি করলেও ডাকাতরা ঘটনা জেনে যায় এবং ওই সব বাড়িতে মুখোশ পরে দেশীয় অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে হামলা চালিয়ে সেসব টাকা পয়সা লুটে নিয়ে যায়।
ওই এলাকার লক্ষ্মী রাণী বিশ্বাস (৪০) জানান, দিনভর আমরা জমিতে খাটি। পুরুষরাও মাঠে কাজ করে। রাতে বাড়িতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে চাই। কিন্তু ডাতাত আতঙ্কে আমাদের রাতভর জেগে থাকতে হয়। একটুও ঘুমাতে পারিনা। এভাবে আর কতদিন আমাদের জীবন চলবে।
বিশ্বনাথ বিশ্বাস (৬২) বলেন, আমরা বাড়িতে শান্তিতে বসবাস করতে পারিনা। দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকে মুখোশ পরা লোকজন আমাদের হা-পা বেঁধে মারপিট করে মালামাল নিয়ে যায়। সুযোগ পেলে তারা বিভিন্নস্থানে নারী নির্যাতন করে বলে তিনি অভিযোগে জানান। পুলিশকে জানালে রাতে আমাদের পাহারা দেয়ার কথা বলেন। সারাদিন জমিতে কাজ করে রাত জেকে পাহারা দেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। টহল পুলিশ আসার কথা বললেও তারা আসেন না। আমাদের জানমাল আমরাই নিজেরা কোনো রকম রক্ষা করে চলছি।
ডেমাকুর গ্রামের তারা বেগম (৪০), রুনা বেগম (৩৪) ও আমেনা বেগম (৩০) অভিযোগ করে বলেন, রাতে যখন পুরুষ লোক থাকে না তখন দল বেঁধে মুখোশধারী কতিপয় দুর্বৃত্ত আমাদের ঘর-বাড়িতে চড়াও হয়। ভয়ভীতি দেখিয়ে নিপীড়ন ও নির্যাতন চালানোর চেষ্টা করে।
ডেমাকুড় গ্রামের মিরাজ শেখ (৪৬) জানান, বিভিন্ন সময় আমরা এ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রানের জন্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছি। কিন্তু ভালো কোনো সুফল পাইনি। যাদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে এরাই এসব দুষ্কর্মের হোতা। এদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হলে এলাকার পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে আসতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
গোপালগঞ্জ থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সেলিম রেজা জানান, আটকদের বিরুদ্ধে কোনো সুনিদ্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া না যাওয়ায় মামলা হয়নি। তবে এলাকায় আটকদের বিরুদ্ধে জনশ্রুতি থাকায় তাদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।
এস এম হুমায়ূন কবীর/ এমএএস/এবিএস