দেশীয় কসমেটিকস ও ডার্মাস্কিন পণ্যের ভ্যাট অব্যাহতির দাবি
কালার কসমেটিকস ও ডার্মাস্কিন কেয়ার পণ্যের উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক অব্যাহতি চেয়েছে এ খাতের বাণিজ্য সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব স্কিন কেয়ার অ্যান্ড বিউটি প্রোডাক্টস ম্যানুফ্যাকচারারস অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অব বাংলাদেশ (এএসবিএমইবি)। নতুন শিল্পের বিকাশ ও সুরক্ষায় দেশে উৎপাদিত এ পণ্যগুলোর ন্যায্য বাজার প্রতিযোগিতা এবং সাশ্রয়ী মূল্যে ব্যাক্তিগত সুরক্ষা পণ্য নিশ্চিতে এ ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক অব্যাহতি চেয়েছে সংগঠনটি।
সংগঠনটি জানিয়েছে বাংলাদেশে বিশ্বমানের কালার কসমেটিকস পণ্য উৎপাদনের উদ্দেশে সংগঠনটি উদ্যোক্তাদের নতুন শিল্প স্থাপন ও বিকাশে উৎসাহিত করছে। সম্ভাবনাময় নতুন রপ্তানি খাত হিসেবে এই খাত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে দেশে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর, পরিবেশবান্ধব নতুন নতুন কারখানা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, যা জাতীয় অর্থনীতিকে আরও সমৃদ্ধ করছে।
খাত সংশ্লিষ্টদের দাবি বাংলাদেশে উৎপাদিত কালার কসমেটিকস ও ডার্মাস্কিন কেয়ার পণ্য এবং এসব পণ্যের ধারক (Packaging Container) উৎপাদনে ব্যবহৃত মৌলিক কাঁচামালের ওপর আরোপণীয় আমদানি শুল্ক মূল্যভিত্তিক ১ শতাংশের বেশি হলে, অতিরিক্ত অংশসহ আরোপিত সমুদয় রেগুলেটরি ডিউটি ও সম্পূরক শুল্ক (যদি থাকে) থেকে অব্যাহতি দেওয়ার ব্যবস্থা করা।
পাশাপাশি বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে সাবান সরবরাহ অব্যাহত রাখার স্বার্থে, সাবান উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল সোপ নুডুলস এর ওপর আরোপিত কাস্টমস ডিউটি হ্রাস এবং রেগুলেটরি ডিউটি সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার করার দাবি জানানো হয়।
সাবান উৎপাদনের অন্যতম প্রধান উপকরণ হলো সোপ নুডুলস ।কাস্টমস ট্যারিফ শিডিউল ২০২৫-২৬ অনুযায়ী, সোপ নুডুলস এর কাস্টমস ডিউটি ২৫ শতাংশ এবং রেগুলেটরি ডিউটি ৩ শতাংশ নির্ধারিত আছে। এই উচ্চ শুল্কের কারণে সাবান উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, যা সরাসরি পণ্যের বাজারমূল্যে প্রভাব ফেলে। ফলে দেশীয় সাবান উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ বহুজাতিক কোম্পানির তুলনায় বাজার প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশে অবস্থিত বহুজাতিক কোম্পানি দেশে নিজস্বভাবে সোপ নুডুলস উৎপাদনের জন্য এর মূল কাঁচামাল- আরবিডি পাম স্টিয়ারিন এবং অপরিশোধিত পাম কার্নেল তেল আমদানি করে থাকে। এই দুই উপকরণ সোপ নুডুলস তৈরির প্রধান কাঁচামাল। এই কাঁচামালের ওপর কাস্টমস ডিউটি মাত্র ১০ শতাংশ এবং রেগুলেটরি ডিউটি ০ শতাংশ। ফলে বহুজাতিক কোম্পানি তুলনামূলকভাবে অনেক কম খরচে নিজস্ব সোপ নুডুলস উৎপাদন করতে সক্ষম হয়।
ফলে দেশীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যখন সরাসরি সোপ নুডুলস আমদানি করে সাবান তৈরি করে, তখন তাদের উৎপাদন খরচ বহুজাতিক কোম্পানির তুলনায় অনেক বেশি হয়। এই বৈষম্যমূলক শুল্ক কাঠামোর কারণে দেশীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ জনগণের কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে সাবান সরবরাহ করতে পারছে না, অথচ বহুজাতিক কোম্পানিগুলো একই পণ্য বিক্রি করে অধিক মুনাফা অর্জন করছে। দেশীয় সাবান উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বহুজাতিক কোম্পানির নিকট তাদের উৎপাদিত সোপ নুডুলস ক্রয়ের প্রস্তাব দেওয়া হলেও তারা সোপ নুডুলস বিক্রিতে অনীহা প্রকাশ করে।
সংগঠনের সভাপতি আশরাফুল আম্বিয়া বলেন, প্রসাধনীর পুরো বাজার অনেক সম্ভাবনাময়। দেশে গুণগত মানের পণ্য উৎপাদন শুরু হয়েছে, যা আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে, ডলার সাশ্রয় এবং কর্মসংস্থান নিশ্চিত করছে। পাশাপাশি রপ্তানি বাজারে উদীয়মান শিল্প হিসেবে বড় ভূমিকা পালন করতে পারবে। কিন্তু, দেশীয় এমন উদ্যোক্তাদের ওপর বিদ্যমান অতিরিক্ত ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক এই খাতকে বিদেশিদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে দিচ্ছে।
তিনি বলেন, আমদানি করা পণ্যের ট্যারিফ ভ্যালু এতই কম যে তা বৈষম্যমূলক। কসমেটিকস পণ্যের ট্যারিফ ভ্যালু আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শুল্কায়নের দাবি করে বলেন, আমদানি পর্যায়ে প্রকৃত ক্রয়মূল্য গোপন করে ন্যূনতম ট্যারিফ মূল্যে শুল্কায়নের ফলে আমদানিকৃত কালার কসমেটিকস পণ্য সামগ্রীর ল্যান্ডেড কস্ট স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কালার কসমেটিকস পণ্যের উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক কম হয়। যে কারণে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কালার কসমেটিকস ও আমদানিকৃত কালার কসমেটিকস পণ্যের মধ্যে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকে না। তাই কালার কসমেটিকস পণ্য-সামগ্রীর ন্যূনতম ট্যারিফ মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারে সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নেট ওয়েট এর পরিবর্তে গ্রস ওয়েট বিবেচনায় নিয়ে কাস্টমস শুল্কায়ন করা আবশ্যক বলে দাবি করেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, দেশে ২০ থেকে ৩৯ বছর বয়সী নারীর সংখ্যা প্রায় দুই কোটি ৭৩ লাখ। এসব নারীর ৭০ শতাংশকে প্রসাধনী সামগ্রীর ক্রেতা বলে বিবেচনা করা হয়েছে বিটিটিসির ওই গবেষণায়। সেক্ষেত্রে এসব ক্রেতা প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার কালার কসমেটিকস এবং ২৫ হাজার কোটি টাকার ত্বকচর্চার পণ্য ব্যবহার করছেন। লাইট ক্যাসেল পাটনার্স ও অ্যালাইড মার্কেট রিসার্চের মতো গবেষণা সংস্থাগুলোর ভাষ্যমতে, ২০২০ সালে দেশে প্রসাধন পণ্যের বাজার ছিল ১২৩ কোটি মার্কিন ডলারের, যা বেড়ে ২০২৭ সালের মধ্যে ২১২ কোটি ডলারে উন্নীত হবে। ২০২১ থেকে ২০২৭ সাল পর্যন্ত এই বাজার ৮ দশমিক ১ শতাংশ হারে বাড়বে বলে জানায় গবেষণা সংস্থা দুটি।
প্রসাধনী আমদানিকারক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার প্রসাধনী আমদানি করে। তাদের হিসাব বিবেচনা করলেও ২৫ হাজার কোটি টাকার প্রসাধনীর বাজার কালোবাজারিদের দখলে।
এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী বলেন, বিদেশি মানহীন পণ্য আমদানির ফলে বিপুল অঙ্কের টাকা চলে গেছে বিদেশে। ফলে সরকারের উচিত নিম্নমানের পণ্য আমদানি বন্ধ করে দেশি উৎপাদকদের নীতি সহায়তা দেওয়া। তাতে অর্থপাচার কমে রাজস্ব বাড়বে।
বর্তমানে স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আরোপযোগ্য পণ্যের তালিকায় রয়েছে ওষ্ঠাধার প্রসাধন, চক্ষু প্রসাধন, হাত, নখ বা পায়ের প্রসাধন, পাউডার, সুগন্ধিযুক্ত বাথ সল্ট এবং গোসল সামগ্রীসহ সংশ্লিষ্ট প্রসাধনসামগ্রী।
অ্যাসোসিয়েশন অব স্কিনকেয়ার অ্যান্ড বিউটি প্রোডাক্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক জামাল উদ্দীন বলেন, বিদেশি পণ্যের নামে বাজারে চোরাই পণ্য আনা হচ্ছে, যা দেশি বাজারের জন্য যেমন হুমকি, পাশাপাশি রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। কসমেটিকসের বাজারের পরিসর অনেক। কিন্তু সে অনুযায়ী দেশীয় শিল্প গড়ে ওঠেনি কেবল নীতিসহায়তার অভাবে।
তিনি বলেন, আমাদের দেশের চাহিদার বড় অংশই পূরণ হয় শুল্ক ফাঁকি দেওয়া কসমেটিকস ও নকল পণ্য সরবরাহের মাধ্যমে। যে কারণে সরকার বিশাল অংকের রাজস্ব হারাচ্ছে। এখন সরকারের উচিত দেশি এ খাতকে এগিয়ে নেওয়া। তিনি বলেন, বাজারের চাহিদা পূরণে অসৎ ব্যবসায়ীরা হয় মিথ্যা ঘোষণায় শুল্ক ফাঁকি দিয়ে পণ্য দেশে আনছে, নাহয় স্থানীয়ভাবে নকল পণ্য তৈরি করে তা সরবরাহ করছে। ফলে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যেমন বিপাকে পড়ছে, তেমনি নকল পণ্যের ব্যবহারে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। দেশীয় শিল্প স্থাপনে সরকারের পলিসি সাপোর্ট বড় একটি বিষয়। এখন কসমেটিকসের কাঁচামাল ও তৈরি পণ্যের দাম বেশি পড়ে যায়। কারণ কাঁচামালে শুল্ক-কর বেশি, বিপরীতে সরাসরি কসমেটিকস আমদানিতে শুল্ক-কর কম। যে কারণে দেশীয় উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসছে না।
তিনি বলেন, এরইমধ্যে দেশে উৎপাদিত আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের কসমেটিকস পণ্য মধ্যপ্রাচ্য, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইনসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে । আমদানির বিকল্প ও বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের লক্ষ্যে স্থানীয় শিল্প সুরক্ষা জরুরি। বিদ্যমান বিনিয়োগের সুরক্ষা নিশ্চিত করলে এই খাতে বিনিয়োগ করতে দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসবেন। যা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হবে।
এএমএ
সর্বশেষ - অর্থনীতি
- ১ এবার স্টেডফাস্ট কুরিয়ারের তথ্যফাঁসের অভিযোগ
- ২ মালয়েশিয়া সিন্ডিকেট না ভাঙলে আমরণ অনশনের হুঁশিয়ারি বায়রার সদস্যদের
- ৩ ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে কার্ড পেমেন্টে ৫% প্রণোদনার প্রস্তাব
- ৪ বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ পেছাতে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে জাতিসংঘ
- ৫ মোবাইলের সর্বনিম্ন কলরেট প্রত্যাহার নিয়ে মতভেদ বিশেষজ্ঞদের