বই আলোচনা
আকাশে উড়িয়ে দেবো শোক: নিরীক্ষাধর্মী কাব্য
সৈয়দা নাজমুন নাহার
কবি জামসেদ ওয়াজেদ দক্ষ কবি, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তার চিত্রকল্প নির্মাণের দক্ষতা, ভাষার বলিষ্ঠতা এবং গতিময়তা অনেক শক্তিশালী। এই বলিষ্ঠতা ও গতিময়তার কারণে তার কবিতায় দুর্বোধ্যতা ফুটে ওঠে। ফলে কবিতা হয়ে ওঠে সুখপাঠ্য। তার কাব্য রচনা সমস্তটাই নিরীক্ষাধর্মী। তার প্রধান প্রেরণা এক শ্রেণির পাশ্চাত্য মননের অবক্ষয়। বাংলাদেশের মতো দরিদ্র এবং উন্নয়নশীল অর্থব্যবস্থার দেশে এ শিল্প মোটেই খাপ খায় না।
একটা বিষয় লক্ষ্যণীয়, নগর-ভাব তার মনে প্রবল হলেও যে নাগরিক ক্লান্তি এই শ্রেণির কবিদের অন্তর থেকে তারুণ্যকে শুষে নেয়। সেই ক্লান্তির বোঝা তাকে ন্যূব্জ করেনি। তিনি খুব উৎসাহী নির্হিলিষ্ট শব্দাবলি কাব্য কারুকৃতি নিয়ে চমক ও চমৎকারিত্ব সৃষ্টির জন্য যে চেষ্টা ও যত্ন করেন, তার কৃতিত্বও কম নয়। এর প্রভাবও সমকালীন বাংলা কাব্যে নগণ্য নয়।
এ প্রচেষ্টায় দেখা যায়, তার ‘সৌভাগ্যের ট্রেন’ কবিতায় উঠে আসে এ ভাবে—‘সাহস ও সুন্দরেরা মিলে মিশে আজকাল এক হয়ে উঠেছে নিলামে ফেরারি সত্যের মতো দুর্বিনীত এ দুর্যোগে চাপা পড়ে আছে অর্থনীতি অসহায় চোখগুলো যদিও আগামী মাপে ভুলে ভরা তবুও সম্প্রীতি আমাদের প্রার্থনায় ব-দ্বীপ স্টেশনে সৌভাগ্যের ট্রেন এসে নামে।’ (সৌভাগ্যের ট্রেন)
আরও পড়ুন
মাদার অফ ডেমোক্রেসি: প্রামাণ্য ঐতিহাসিক দলিল
শূন্যের দরজা: গভীর দার্শনিক যাত্রা
আবেগ কম্পিত চিন্তার বিস্তায়িত আবেগ অভিন্ন হৃদয় হয়ে এই ছত্রগুলো ইন্দ্রিয়বেদী কবিতায় রূপায়িত। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দ্বন্দ্বে আশ্রয়ী কাব্যে গূঢ়তম সত্তা কীভাবে মুখরিত মুকুলিত হয়, দেখা যাবে তার এই কবিতায়। যেমন-‘সূর্যমুখি রোদের জলে করছি স্নান কদম সাদা সন্ধ্যা তারার যত্ন করে আষাঢ় এখন ঘুমিয়ে আছে নিজের ঘরে মেঘের পাহাড় কেটে কেটে এই অভিযান
দুপুরগুলো তপ্ত যেমন তেমন রাগি পোড়াচ্ছে আজ খুব করে তো তোমার গাহন বৃষ্টি নামুক; এই আষাঢ়ই মেঘের বাহন হলুদ কদম কষ্ট বুকে আবার জাগি’ (চাঁদ ঘুমানো ভরা নদী)
শব্দের ঝনাৎকার ঐকতান তুলেছে নিবিড় বাগৈশ্বর্যে। মনে করিয়ে দেয় সুধীন্দ্রনাথ দত্তের অর্কেস্টার উদাত্ত মহীয়ান অর্গানের তান তালের সুর সমন্বয়ে। শব্দ ঝংকারে শিল্প নিপুণতার নিবিড় পরিচয় পাওয়া যায় এ দীর্ঘতম কবিতায়। ইংরেজি কাব্যশাস্ত্রের পরিভাষায় যাকে বলে সুলেলিঙ্ক, সেই মহৎ উত্তুঙ্গ কাব্যোক্তির বিচ্ছুরণের জন্য বাক সংযোজনার বিস্তৃতি আবশ্যক। যেমন-‘সোনালী আঁশের ঘরে ঠাঁই নেয় বেকার ইঁদুর গর্বভরে ওরা বলে এটিই তো ঠিক বাসাবাড়ি চঞ্চল নগরী তুমি আজ কাঁদো শুধুই নীরবে শিল্পের স্বনণে আজ অভাবের দেখি হাতছানি
আমার নগরী তুমি তাই আমি আশাহত হই সাহসী সন্তান এসে ভরে দেবে তোমার জৌলুশ আকাশ কৃপণ নয় প্রকৃতিও আছে অপেক্ষায় তোমাকে সাজিয়ে দিতে প্রিয় বন হাত পেতে আছে।’ (আমার কৈশোর)
পরাবাস্তববাদীদের কবিতায় এই বিশ্বাস ও বিশ্বাসহীনতা কখনো বড় কথা নয়, বড় সমস্যা নয়। জামসেদ ওয়াজেদের কবিতায় চিত্রের পর চিত্র সন্নিবেশ করে জীবনের দৃশ্যমান স্তরের স্বচ্ছলতার গভীরে এক অস্পষ্ট জগৎকে তুলে ধরতে প্রয়াসী হলেন তার নির্মিত কবিতায়।
এসইউ