একটি জন্মদিন, কিছু স্মৃতি আর অনেক না-বলা কথা
সুশান্ত সিং রাজপুত, ছবি: সোশ্যাল মিডিয়া থেকে
আজ কোনো কেক কাটার ছবি নেই, নেই নতুন সিনেমার পোস্টার কিংবা জন্মদিনের হাসিমুখ। তবু দিনটা থেমে থাকে না। কারণ আজ সুশান্ত সিং রাজপুতের জন্মদিন, যে মানুষটি চলে গিয়েও স্মৃতির ভিড়ে অদ্ভুতভাবে উপস্থিত। এই জন্মদিন তাই উদযাপনের নয়, ফিরে তাকানোর; আলো ঝলমলে সাফল্যের নয়, নীরব অনুভবের।

সুশান্ত ছিলেন এমন একজন অভিনেতা, যাকে শুধু তার পর্দার চরিত্রে বাঁধা যায় না। তার চোখে ছিল প্রশ্ন, কথায় ছিল খোঁজ আর নীরবতায় লুকিয়ে থাকত অনেক না-বলা গল্প। জনপ্রিয়তার দৌড়ে তিনি ছিলেন অংশগ্রহণকারী, কিন্তু অন্ধ অনুসারী নন। হয়তো সেই কারণেই তার জীবনের অনেক অধ্যায় রয়ে গেছে অসম্পূর্ণ, অনেক কথাই বলা হয়নি সময় থাকতে।

আজ এই জন্মদিনে তাই হিসাব মেলানোর চেষ্টা নয়, চেষ্টা তাকে অনুভব করার। একজন অভিনেতা হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবে; যিনি স্বপ্ন দেখতেন নক্ষত্র ছোঁয়ার, কিন্তু পৃথিবীর বাস্তবতায় আটকে পড়েছিলেন। কিছু স্মৃতি, কিছু ছবি, কিছু সংলাপ আর তার মাঝখানে জমে থাকা অগণিত না-বলা কথা নিয়েই আজকের এই লেখা।

বলিউডে তার যাত্রা ছিল অপ্রথাগত। টেলিভিশনের জনপ্রিয়তা পেরিয়ে বড় পর্দায় আসা অনেকেই হারিয়ে যান, কিন্তু সুশান্ত হারাননি। কারণ তিনি অভিনয়কে দেখতেন আত্মপ্রকাশের একমাত্র পথ হিসেবে নয়; বরং জ্ঞান, অনুসন্ধান আর নিজের ভেতরের কৌতূহলকে প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে।

সুশান্তের নাম উচ্চারিত হলেই শুধু সিনেমার দৃশ্য নয়, মনে পড়ে তার বই পড়ার ছবি, টেলিস্কোপের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মুহূর্ত, কিংবা মহাকাশ নিয়ে তার বিস্ময়। তিনি বলতেন, ‘আমি জানতে চাই।’ এই জানার তৃষ্ণাই তাকে আলাদা করেছিল।

পদার্থবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, দর্শন এসব ছিল তার নিত্যসঙ্গী। অনেক তারকাই ‘বুদ্ধিমান’ তকমা পান, কিন্তু সুশান্তের ক্ষেত্রে তা ছিল অনুশীলিত ও গভীর। তিনি নিজ উদ্যোগে টেলিস্কোপ কিনেছিলেন, নাসা ভ্রমণের স্বপ্ন দেখতেন, এমনকি মহাকাশে যাওয়ার প্রশিক্ষণ নেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন।

সুশান্ত এমন চরিত্র বেছে নিতেন, যেগুলো তাকে প্রশ্ন করতে শেখায়। সফল ক্রিকেটার, সংগ্রামী প্রেমিক, ব্যর্থ অথচ জেদি যুবক প্রতিটি চরিত্রে তিনি খুঁজতেন মানবিক দ্বন্দ্ব। স্টারডমের সহজ পথে না হেঁটে তিনি বেছে নিয়েছিলেন ঝুঁকিপূর্ণ পথ।
এই ঝুঁকিই তাকে কখনো আকাশচুম্বী প্রশংসা দিয়েছে, আবার কখনো একাকীত্ব। বলিউডের চকচকে দুনিয়ায় নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চাপ তিনি অনুভব করতেন, কিন্তু সেটাকে মেনে নিতে পারেননি পুরোপুরি। হয়তো পারেননি বলেই তিনি আজও আলাদা।

আজকের দিনে তারকারা যখন সামাজিক মাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতি জাহির করতে ব্যস্ত, সুশান্ত তখন সেখানে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতেন। কখনো বিজ্ঞান নিয়ে, কখনো জীবনের অর্থ নিয়ে, কখনো মানুষের সম্ভাবনা নিয়ে। তার পোস্টগুলো ছিল আত্মমগ্ন, কিন্তু আত্মকেন্দ্রিক নয়; বরং অনুসন্ধানী।

তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ কেবল তার পরিচয় দিয়ে সীমাবদ্ধ নয়। একজন অভিনেতা একই সঙ্গে গবেষক হতে পারে, পাঠক হতে পারে, স্বপ্নদ্রষ্টা হতে পারে।
২০২০ সালের জুনে তার মৃত্যু শুধু একটি জীবনাবসান নয়, এক সামাজিক আলোচনার সূচনা করে। মানসিক স্বাস্থ্য, ইন্ডাস্ট্রির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, একাকীত্ব সবকিছু নতুন করে সামনে আসে। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আলোচনার ঝড় থেমে গেছে, থেকে গেছে শূন্যতা।

আজ তার জন্মদিনে প্রশ্নটা তাই শুধু ‘কেন গেলেন’ নয়; ‘তিনি কী রেখে গেলেন?’
তিনি রেখে গেছেন স্বপ্ন দেখার সাহস। নিজের মতো করে বাঁচার সাহস। জনপ্রিয়তার বাইরে দাঁড়িয়ে নিজের কণ্ঠস্বর শোনানোর সাহস। তিনি প্রমাণ করে গেছেন সফলতা মানে কেবল পুরস্কার নয়, নিজের ভেতরের আগুনটাকে জিইয়ে রাখা।

আজকের দিনে কেক কাটার ছবি নেই, নেই নতুন সিনেমার ঘোষণা। আছে স্মৃতি, আছে অনুপ্রেরণা। সুশান্ত সিং রাজপুত যেন আমাদের মনে করিয়ে দেন জীবনটা শুধু দৌড় নয়, বোঝারও।

তিনি চলে গেছেন, কিন্তু যে প্রশ্ন করতে শিখিয়েছিলেন, যে কৌতূহল জাগিয়েছিলেন সেগুলো আজও বেঁচে আছে। জন্মদিনে সেটাই তার সবচেয়ে বড় উপহার। নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে থাকা মানুষটি হয়তো আজ নক্ষত্রেই মিশে গেছেন, কিন্তু তার আলো এখনও পথ দেখায়।
জেএস/