শুটিং হাউজে একদিন
সাদাত হোসাইনের কণ্ঠে যখন ‘অ্যাকশন’
শনিবার (১৯ আগস্ট) অফিস শেষে ছুটলাম মিরপুর ১১ নম্বরে। সেখানে শুটিং চলছে জনপ্রিয় লেখক ও নির্মাতা সাদাত হোসাইনের একটি শর্টফিল্মের। স্পটে পৌঁছতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো। ইউনিটের সহকারী পরিচালক মাঈন উদ্দিন আহমেদের মাধ্যমে শুটিং হাউজ খুঁজে পেলাম। ভেতরে প্রবেশ করে দেখলাম লাইট-ক্যামেরা তৈরি। এখন অ্যাকশন বলা বাকি। সাদাত হোসাইন মনিটরে চোখ রেখে ‘অ্যাকশন’ বললেন। শুরু হলো অভিনয়। শিলা চরিত্রে অভিনয় করছেন সময়ের জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পী সাদিয়া আয়মান। তার শোয়ার ঘরের একটি দৃশ্য। সকালে ঘুম থেকে উঠে জানালার পর্দা সরাচ্ছেন। ফুরফুরে মেজাজ। গান শুনতে শুনতে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে ফোন হাতে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ডুব দিলেন। হঠাৎ কপালে চিন্তার ভাঁজ। কেমন আঁতকে উঠলেন। বিষাদের ছায়া চোখেমুখে। পরিচালকের কণ্ঠে এবার ‘কাট’। সবার হাততালি। সাদাত হোসাইন বললেন, ‘দুর্দান্ত হয়েছে’।
এই দৃশ্য শেষ হলে আমি প্রবেশ করলাম অন্য কক্ষে। সেখানে আড্ডা দিচ্ছিলেন অরেক শক্তিমান অভিনেতা অশোক ব্যাপারী। পর্দায় তাকে নিয়মিত দেখলেও গণমাধ্যমে তাকে নিয়ে আলোচনা কম। আমি তাকে দেখেই চিনতে পারলাম। টেলিভিশনের পরিচিত মুখ। তার সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলেন তরুণ সম্ভাবনাময় অভিনয়শিল্পী মাঈন। ‘কারাগার অন্তিম পর্বে’ কারা পুলিশের চরিত্রে সাবলীল অভিনয় করে দর্শকদের আকৃষ্ট করেছেন। আড্ডা থামিয়ে কুশলাদি বিনিময় করলেন মাঈন। আমিও যুক্ত হলাম তাদের আড্ডায়। আড্ডার বিষয় অভিনয় এবং মঞ্চনাটক।
কিছুক্ষণ পর কক্ষে প্রবেশ করলেন এই সময়ের জনপ্রিয় তরুণ অভিনয়শিল্পী খায়রুল বাশার। তার পরনে ট্রাউজার ও টি-শার্ট। দেখেই বোঝা যাচ্ছে কিছুক্ষণ পর তার দৃশ্য ধারণ করা হবে। তিনিও আড্ডায় যুক্ত হলেন। আড্ডার বিষয় এবার বিস্তৃত হলো। তবুও ঘুরেফিরে সেই অভিনয় প্রসঙ্গ। কোনো পরনিন্দা বা পরচর্চা নেই সে আলোচনায়। কে কী করছেন, কেমন করছেন—এসবই উঠে আসে আলোচনায়। এরই মধ্যে আর্টিস্ট কল আসে। বাবার সঙ্গে শুভের সিন হবে এখন। বাবা অশোক ব্যাপারী, ছেলে খায়রুল বাশার। তারা চলে গেলেন শুভর পড়ার ঘরে। সেখানেই সেট তৈরি করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: ভক্তের সঙ্গে ছবি তুললেন অহনা
সেদিন সন্ধ্যা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত শুটিং চললো। আমি চলে আসতে চাইলে সাদাত হোসাইন বাধা দিলেন। বিদেশ সফর করে এসে তিনি তিনদিন জ্বরে আক্রান্ত ছিলেন। শরীর এবং মন একটু খারাপ দেখলাম। বললেন, ‘থেকে যাও। তোমার সঙ্গ ভালো লাগছে।’ শুটিংয়ের ফাঁকে ফাঁকে কথা হচ্ছিল তার লেখালেখি নিয়ে। আগামী বইমেলার জন্য কী লিখছেন। তিনি জানালেন, এখনো শুরু করেননি। অন্তত দুটি উপন্যাস দুটি প্রকাশনা সংস্থাকে দিতেই হবে। এসব নিয়ে খানিকটা চিন্তিত তিনি। তবে সেপ্টেম্বর থেকে পুরোদমে লেখা শুরু করবেন। জানালেন ভবিষ্যতে সিনেমা নির্মাণের কথাও।
চিফ অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর গোলাম রাব্বানী এসেও কুশলাদি বিনিময় করলেন। সাদাত হোসাইনের পুরো টিম আমার পরিচিত। বইমেলায়, অনুষ্ঠানে বা আড্ডায় তাদের সঙ্গে প্রায়ই দেখা হয়। তরুণ একঝাঁক সহকর্মী নিয়ে দুর্দান্ত গতিতে কাজ করছেন সাদাত হোসাইন। কাজটি হচ্ছে বিজ্ঞাপনী সংস্থা এক্সপ্রেশনের ব্যানারে। কাজটি সম্পর্কে আজ বিস্তারিত জানাচ্ছি না। তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তবে এটুকু বলা যায়, দুর্দান্ত একটি গল্পে দারুণ কাজ হচ্ছে। দর্শকদের হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মতো নির্মাণ বলা যায়। অশোক ব্যাপারী, খায়রুল বাশার, সাদিয়া আয়মান ও মাঈনের কাজ দেখে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
পুরো সময়টাতে খুব ঠান্ডা মাথায় সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছিলেন নির্মাতা সাদাত হোসাইন। এর আগেও বিভিন্ন শুটিং স্পটে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে আমার। নিজেও কাজ করেছি কয়েকটি খণ্ড নাটক ও একটি ধারাবাহিক নাটকে। শুটিং হাউজ এতটা শান্ত-শিষ্ট স্বভাবে কাজ আদায় করে নিতে পারে, তা আজকের শুটিং না দেখলে বুঝতে পারতাম না। সাজ্জাদ হোসাইন, রাজশ্রী বড়ুয়া শুচি, হৃদয় চৌধুরী, রাশেদুর রহমান রাশেদ ও জোবায়ের হোসাইনরা দারুণ জোগান দিয়ে যাচ্ছিল কাজের। দুদিনের শুটিংয়ের আজই শেষ দিন। এর আগের দিন শুটিং হয়েছে আশুলিয়া এবং উত্তরায়। তাই আজ রাত যতই হোক, সবাই আন্তরিকতার সঙ্গেই কাজ করছিলেন।
আরও পড়ুন: আজও ভক্তদের হৃদয়জুড়ে নায়করাজ
সাদাত হোসাইন এর আগেও কিছু শর্টফিল্ম, মিউজিক্যাল ফিল্ম, জীবনীভিত্তিক ফিল্ম নির্মাণ করেছেন। তার ‘বোধ’, ‘দ্য শ্যুজ’, ‘গহীনের গান’, সৈয়দ আব্দুল হাদী এবং দিলারা জামানের জীবননির্ভর কাজগুলো আমি দেখেছি। ‘বোধ’ দেশে-বিদেশে ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছে। একাধিক অ্যাওয়ার্ড লাভ করেছে। একই সঙ্গে তার লেখা উপন্যাস পাঠকরা বইমেলায় লাইন দিয়ে কিনছেন। সব মিলিয়ে সম্ভাবনাময় আগামীর প্রত্যাশা আমরা করতেই পারি। আশা করি, জনসচেতনতামূলক নির্মাণটি তাকে আরও সাফল্য এনে দেবে।
শুটিং শেষে গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন সাদাত হোসাইন। বিদায় বেলায়ও আন্তরিকতার কমতি ছিল না। তার আদর-আপ্যায়ন সত্যিই মনে রাখার মতো। মুহূর্তেই মানুষকে আপন করার এই অসীম ক্ষমতা তাকে বহুদূর নিয়ে যাবে। টিমের সবার আন্তরিকতা ও শ্রদ্ধা সত্যিই অসাধারণ ছিল। অভিনয়শিল্পীদের মন-মানসিকতা এতটাই কোমল, যা কাছ থেকে না দেখলে বোঝা মুশকিল। পর্দায় কখনো কখনো তাদের নেতিবাচক চরিত্রে দেখা গেলেও বাস্তবে তারা খুবই ইতিবাচক।
এসইউ/জিকেএস