ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. ফিচার

এসওএস ভিলেজে কেটেছে শৈশব, তাদের অনেকে আজ সমাজ গড়ার কারিগর

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশিত: ১০:১৭ পিএম, ০৫ জানুয়ারি ২০২৬

শিশুটির হয়তো থাকার কথা ছিল মায়ের কোলে, বাবার আদরে। জন্মের পরই তার আশ্রয় হয় ঢাকার শ্যামলীর এসওএস শিশুপল্লীতে, নিজের মা নয়, অন্য এক স্নেহময়ীর কাছে। সাজানো পারিবারিক পরিবেশে তারা মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ইচ্ছেমতো খেলাধুলা করছে, দল বেঁধে স্কুলে যাচ্ছে, একসঙ্গে পড়তে বসছে, ভাগ করে নিচ্ছে দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট আনন্দ।

এমন পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুরা আজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। বড় হয়ে অনেকেই এখন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিসিএস ক্যাডারসহ সমাজের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় দায়িত্ব পালন করছেন। বাবা-মায়ের আদরবঞ্চিত হয়েও পারিবারিক আবহ, যত্ন আর ভালোবাসার ছায়ায় তারা বেড়ে উঠছে আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে। তাদের অনেকে আজ সমাজ গড়ার কারিগর

এসওএস ভিলেজে কেটেছে শৈশব, তাদের অনেকে আজ সমাজ গড়ার কারিগর

প্রায় আড়াই একর জায়গা জুড়ে গড়ে ওঠা শ্যামলীর এসওএস শিশুপল্লীতে রয়েছে লাল ইটের ছোট ছোট দোতলা বাড়ি। এক একটি সংসারের মতো করে ১৫টি পরিবার এখানে বসবাস করে। সবুজ ঘাসের বুক চিরে সরু পাকা রাস্তা একবাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে নিয়ে যায়। বাড়িগুলোর চারপাশ ঘিরে আছে আম, পেয়ারা, কামরাঙ্গা, সুপারি ও কাঁঠালের মতো ফলের গাছ। প্রকৃতির এই প্রশান্ত পরিবেশে বড় হচ্ছে বিভিন্ন বয়সী শিশুরা, ভালোবাসা, যত্ন আর স্বপ্নকে সঙ্গী করে।

রাজধানীর হারম্যান মেইনার স্কুল ও কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছে এসওএস শিশুপল্লীর শিশুরা। কৈশোর ছুঁলে ছেলেদের পাঠানো হয় মিরপুরের যুবপল্লিতে। সেখানকার কিশোররা কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করলেও ছুটির দিনে ফেরে শৈশবের পরিচিত ঠিকানায়, মায়ের কাছে। বিয়ের পর মেয়েরাও নাইয়রে ফেরে এইখানে। এই প্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়ে যাওয়া সদস্যদের বলা হয় ‘কেয়ার লিভার’।

এসওএস ভিলেজে কেটেছে শৈশব, তাদের অনেকে আজ সমাজ গড়ার কারিগর

কেয়ার লিভারদের মর্যাদা, অধিকার ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে রাজধানীর এসওএস চিলড্রেন্স ভিলেজ বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হলো ‘কেয়ার লিভারস ন্যাশনাল জেনারেল অ্যাসেম্বলি ২০২৬’। ‘লিভ নো ওয়ান বিহাইন্ড’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে গত ৩ জানুয়ারি এই ব্যতিক্রমী জাতীয় আয়োজনের উদ্যোগ নেয় টুগেদার উই ক্যান-কেয়ার লিভারস নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ। জেনারেল অ্যাসেমব্লিতে কেয়ার লিভারদের জীবনসংগ্রাম, অর্জন, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনা করা হয়। সেখান থেকে সংগঠিত অঙ্গীকার ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল জোনের অতিরিক্ত উপপুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল ইমরান, বিশেষ অতিথি প্রাণ গ্রুপের সিওও মোহাম্মদ ইব্রাহিম খলিল, এসওএস চিলড্রেন্স ভিলেজ বাংলাদেশে ন্যাশনাল ডিরেক্টর ডা. মো. এনামুল হক, চ্যানেল এস-এর ভাইস চেয়ারম্যান মো. মোনোয়ার হোসেইন মাইনুল। সম্মানিত অতিথি ছিলেন চ্যানেল এস-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও সিইও সুজিত চক্রবর্তী, এসওএস বাংলাদেশের ডেপুটি ন্যাশনাল ডিরেক্টর মো. মাসুদ রানা, এসওএস বাংলাদেশের প্রজেক্ট ডিরেক্টর মো. ইউসুফ আলী, অভিনেত্রী ও নৃত্যশিল্পী মেহবুবা মাহনূর চাঁদনী, সংগীতশিল্পী রবি চৌধুরী, শেরেবাংলা নগর থানার অফিসার ইন চার্জ মনিরুল ইসলামসহ এসওএস বাংলাদেশের সাবেক ও বর্তমান ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কেয়ার প্র্যাকটিশনার, এনজিও প্রতিনিধি, দাতা সংস্থা, পুলিশ প্রশাসনের প্রতিনিধি, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব এবং টুগেদার উই ক্যানের সদস্য ও উপদেষ্টারা।

এসওএস ভিলেজে কেটেছে শৈশব, তাদের অনেকে আজ সমাজ গড়ার কারিগর

আব্দুল্লাহ আল ইমরান বলেন, ‘এমন একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ও কর্মদক্ষতা দেখে আমি সত্যিই অভিভূত। ছোট ছোট শিশুদের সব ধরনের চাহিদা পূরণ করে যেভাবে তাদের সুন্দরভাবে গড়ে তোলা হচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য। এই উদ্যোগের সাফল্য কামনা করি। ভবিষ্যতে যেন এই নেটওয়ার্ক আরও শক্তিশালী হয় এবং এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়া কেয়ার লিভারসদের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক বজায় থাকে সেই প্রত্যাশাই রইল।’

মোহাম্মদ ইব্রাহিম খলিল বলেন, ‘প্রাণ গ্রুপের পক্ষ থেকে এই অনুষ্ঠানে যুক্ত থাকতে পেরে সম্মানিত বোধ করছি। এসওএস ভিলেজ শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, এটি ভালোবাসা ও মানবিকতার এক প্রতীক। আপনাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, আপনাদের সংগ্রামী জীবন। নিজের ওপর বিশ্বাস রাখুন, নিষ্ঠার সঙ্গে পরিশ্রম করুন, সফলতা অবশ্যই আসবে।’

এসওএস ভিলেজে কেটেছে শৈশব, তাদের অনেকে আজ সমাজ গড়ার কারিগর

জেনারেল অ্যাসেমব্লিতে টুগেদার উই ক্যান-এর সভাপতি ডা. ইসতিয়াক আহমেদ প্রস্তাবিত ‘ফাইভ জিরো থিওরি’ সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। এই দিক নির্দেশনামূলক কাঠামোর মাধ্যমে কেয়ার লিভারদের জীবনকে অধিকার ও মর্যাদার আলোকে দেখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়।

কী এই পাঁচ শূণ্য
১. শূন্য বঞ্চনা (জিরো এক্সক্লুশন), যার আওতায় কেয়ার লিভারদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও সামাজিক সুরক্ষা থেকে কোনোভাবেই বঞ্চিত করা যাবে না।
২. শূন্য বৈষম্য (জিরো ডিসক্রিমিনেশন), অর্থাৎ সমাজ, কর্মক্ষেত্র ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে কেয়ার লিভারদের প্রতি সকল ধরনের কলঙ্ক ও বৈষম্যের অবসান ঘটাতে হবে।
৩. শূন্য অপ্রস্তুত রূপান্তর (জিরো আনপ্রিপেয়ার্ড ট্রানজিশন), যাতে কেয়ার থেকে বেরিয়ে আসার সময় কোনো তরুণ প্রস্তুতি ও সহায়তা ছাড়া একা হয়ে না পড়েন।
৪. শূন্য অনিরাপত্তা (জিরো ইনসিকিউরিটি), যার মাধ্যমে কেয়ার লিভারদের নিরাপদ আবাসন, মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যসেবা এবং জরুরি সহায়তার নিশ্চয়তা দিতে হবে।
৫. শূন্য নীরবতা (জিরো সাইলেন্স), অর্থাৎ কেয়ার লিভারদের জীবনসংক্রান্ত কোনো নীতি বা সিদ্ধান্ত তাদের অংশগ্রহণ ছাড়া গ্রহণযোগ্য হবে না।

এই ঘোষণার মাধ্যমে টুগেদার উই ক্যান, কেয়ার লিভারস নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ জানায়, ‘ফাইভ জিরো থিওরি’ বাস্তবায়নে সংগঠনটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করবে। সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী, করপোরেট সেক্টর ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে নীতিগত পরিবর্তনের পক্ষে কাজ করা হবে। একই সঙ্গে কেয়ার লিভারদের জন্য টেকসই ট্রানজিশন সাপোর্ট নিশ্চিত করা, তাদের নেতৃত্ব ও কণ্ঠস্বর জোরদার করাও সংগঠনের প্রধান লক্ষ্য।

এসওএস ভিলেজে কেটেছে শৈশব, তাদের অনেকে আজ সমাজ গড়ার কারিগর

জেনারেল অ্যাসেমব্লিতে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন এসওএস চিলড্রেন্স ভিলেজ ইন্টারন্যাশনাল গ্লোবাল ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট অ্যাডভাইজার পূর্ণিমা কে জিন্দাল। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও আয়োজন সম্মেলনে কেয়ার লিভারদের জীবনমান উন্নয়ন ও অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি সম্মিলিত ঘোষণা গ্রহণ করা হয়। অনুষ্ঠানে নবনির্বাচিত কার্যনির্বাহী কমিটি ও উপদেষ্টা পরিষদের আনুষ্ঠানিক অভিষেক অনুষ্ঠিত হয়। কমিটির সদস্যদের উত্তরীয় পরিয়ে বরণ করে নেন অভিনেত্রী ও নৃত্যশিল্পী মেহবুবা মাহনূর চাঁদনী এবং কণ্ঠশিল্পী রবি চৌধুরী। অনুষ্ঠানে কেয়ার লিভারদের মধ্য থেকে সমাজে বিশেষ অবদানের জন্য সম্মাননা দেওয়া হয়। পাশাপাশি এসওএস ভিলেজে শিশুদের লালন-পালনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা মা ও খালাদেরও সম্মান জানানো হয়।

মডেল ও কোরিওগ্রাফার বুলবুল টুম্পা ও তার দলের পরিবেশনায় ছিল ফ্যাশন শো। একইসঙ্গে এসওএস ভিলেজে বেড়ে ওঠা শিশুদের প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক পরিবেশনা আয়োজনটিকে আরও রঙিন করে তোলে। পুরো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ডা. ইসতিয়াক আহমেদ ও রাণী চৌধুরী। অনুষ্ঠানটির টাইটেল স্পনসর ছিল প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ, মিডিয়া পার্টনার ছিল চ্যানেল এস এবং জাগো নিউজ।

নতুন কমিটিতে যুক্ত হলেন যারা

কার্যনির্বাহী কমিটি
সভাপতি ডা. ইসতিয়াক আহমেদ, সহ সভাপতি মো. আজমল হোসেন, সাধারণ সম্পাদক রানী চৌধুরী, যুগ্ম সম্পাদক মো. আওলাদ হোসেন, কোষাধ্যক্ষ সাকিনা সুলতানা, সাংগঠনিক সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনির, দপ্তর সম্পাদক নিসাত আরা টুম্পা, সমাজসেবা সম্পাদক তানিয়া আক্তার লিপি, তথ্য ও প্রযুক্তি সম্পাদক জাকারিয়া হোসেন।

কার্যনির্বাহী সদস্য
রজব আলী, সাদিয়া চৌধুরী, খালেদা রহমান সেতু, মাজেদা বেগম নিলুফা, সানজানা তাসনিম, মুনতাসির মোরশেদ

উপদেষ্টা পর্ষদ
প্রধান উপদেষ্টা কামরুজ্জামান টিটু, উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. ইন্দিরা সুফিয়া খান, এনায়েতউল্লাহ, পারভিন আক্তার, শফিকুর রহমান, ফজলুল হক বকুল, ইলিয়াস হোসেন খান, মো. আবুল কামাল, আবু সাইদ, মো. আবুল কাশেম, আবুল কালাম


এসএকেওয়াই/আরএমডি