সংগ্রাম আর বেঁচে থাকার লড়াইয়ে গাজায় নতুন বছর শুরু
যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা/ ছবি: এএফপি
দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ-সংঘাতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে গাজাবাসী। বেঁচে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত লড়াই, সংগ্রাম করে যাচ্ছে অবরুদ্ধ এই উপত্যকার সাধারণ মানুষ। ভয়াবহ মানবিক সংকটে দিশেহারা তারা। নতুন বছরেও তাদের মনে কোনো আনন্দ নেই। আছে শুধু বিষাদ আর হতাশা। এমনই একজন সানা ইসরা।
সাদা প্লাস্টিকের তেরপলিন দিয়ে তৈরি তাঁবুতে সানা ইসা তার মেয়েদের সঙ্গে বসেছিলেন। নতুন বছর এবং গাজায় আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর নিয়ে সানা আল জাজিরার সঙ্গে কথা বলেছেন। কিন্তু বৃষ্টিতে তাঁবুতে ভেজা কম্বলের ওপর শুয়ে থাকা সানার কাছে ইতিবাচক হওয়ার মতো তেমন কোনো বিষয় এখন আসলে নেই।
গাজা উপত্যকায় তিনি এবং তার মতো অন্যান্য বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের যে কঠিন বছরের মুখোমুখি হতে হচ্ছে তার বর্ণনা দিয়ে সানা আল জাজিরাকে বলেন, আমরা যুদ্ধ, ঠান্ডা, নাকি ক্ষুধাকে দোষ দেব তা বুঝতে পারছি না। আমরা এক সংকট থেকে অন্য সংকটে চলে যাচ্ছি।
মানবিক অবস্থার অবনতির মধ্যে গাজার ফিলিস্তিনিদের একসময়ের উচ্চাকাঙ্ক্ষী আশা, উন্নত ভবিষ্যৎ, সমৃদ্ধি এবং পুনর্গঠনের স্বপ্ন, হারিয়ে গেছে। এর বদলে জায়গা করে নিয়েছে মৌলিক মানবিক চাহিদা- আটা, খাবার এবং বিশুদ্ধ খাবার পানি নিশ্চিত করা, ঠান্ডা থেকে রক্ষা করার জন্য তাঁবু সংগ্রহ করা, চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করা এবং বোমাবর্ষণ থেকে বেঁচে থাকা।
সানার মতো ফিলিস্তিনিদের জন্য, নতুন বছরের আশা বেঁচে থাকার জন্য প্রতিদিনের সংগ্রামে পরিণত হয়েছে। ৪১ বছর বয়সী সানা সাত সন্তানের জননী। ২০২৪ সালের নভেম্বরে গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যার প্রথম বছরের শেষে ইসরায়েলি হামলায় তার স্বামী নিহত হওয়ার পর থেকে তিনি তার সন্তানদের লালন-পালনের একমাত্র দায়িত্বে ছিলেন।
সানা তার পরিবারের সাথে আল-বুরেইজ থেকে মধ্য গাজার দেইর এল-বালাহ এলাকায় পালিয়ে আসেন। শিশুদের প্রতি দায়িত্ব, স্থানচ্যুতি, খাবার ও পানীয়ের ব্যবস্থা, এখানে-সেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া সবকিছুই তার কাছে ছিল বেশ কঠিন বিষয়।
২০২৫ সালে সানার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ‘একটি রুটি’ জোগাড় করা এবং তার পরিবারের জন্য প্রতিদিন এক কেজি আটা জোগাড় করা।
তিনি তিক্ত স্বরে বলেন, দুর্ভিক্ষের সময় আমি একটাই ইচ্ছা নিয়ে ঘুমাতাম এবং জেগে উঠতাম, সেটা হলো দিনের জন্য পর্যাপ্ত রুটি জোগাড় করা। যখন আমার বাচ্চারা আমার সামনে অনাহারে ছিল, আর আমি কিছুই করতে পারছিলাম না আমার মনে হচ্ছিল আমি মারা যাচ্ছি।
আটার সন্ধানে অবশেষে সানা গাজাজুড়ে মে মাসের শেষের দিকে খোলা মার্কিন-সমর্থিত জিএইচএফ ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রগুলোতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
তিনি বলেন, প্রথমে আমি ভীত এবং দ্বিধাগ্রস্ত ছিলাম, কিন্তু আমরা যে ক্ষুধার মধ্য দিয়ে বাস করছি তা আপনাকে এমন কিছু করতে বাধ্য করতে পারে যা আপনি কখনো কল্পনাও করেননি।
কিন্তু সাইটগুলিতে যাওয়া কেবল সানার জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ছিল না, এটি এমন একটি পথ ছিল যা তার মর্যাদা কেড়ে নিয়েছিল এবং স্থায়ী ক্ষত রেখে গিয়েছিল।
একবার মধ্য গাজার নেটজারিম বিতরণ পয়েন্টে সাহায্যের জন্য অপেক্ষা করার সময় সানা তার বাহুতে ছুরি দিয়ে আঘাত পান এবং রাফাহর পূর্বে মোরাগ পয়েন্টে তার ১৭ বছর বয়সী মেয়ে বুকে আঘাত পান।
কিন্তু তার এই আঘাত তাকে আবারও চেষ্টা করা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। যদিও এরপর থেকে তিনি তার সন্তানদের তুলনামূলকভাবে নিরাপদ এলাকায় রেখে একাই যাওয়া শুরু করেন।
গাজায় যুদ্ধের ফলে খাদ্য ও মানবিক সহায়তায় মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটে। গত বছরের মার্চের শেষের দিকে এই পরিস্থিতি শুরু হয় এবং জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি ঘোষণা করে যা অক্টোবর পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। যদিও যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর এই পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে তবে সংকট একেবারে শেষ হয়নি।
গাজার কিছু অংশে খাদ্য সংকট ভয়াবহ পর্যায়ে প্রবেশ করায় খাদ্য, পানি এবং ওষুধের তীব্র ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে শিশু এবং গর্ভবতী নারীদের মধ্যে অপুষ্টির হার বেড়ে গেছে।
টিটিএন