চীনের কঠোর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, অবিলম্বে প্রত্যাহারের আহ্বান জাপানের
সামরিক কাজে ব্যবহারের সম্ভাবনাসম্পন্ন পণ্যের ওপর নতুন করে কঠোর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে চীন, আর তা অবিলম্বে প্রত্যাহার করার আহ্বান জানিয়েছে জাপান। এসব পণ্যের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রেয়ার আর্থ বা বিরল খনিজও থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এদিকে, এ ঘটনা কেন্দ্র করে বেইজিং ও টোকিওর মধ্যে চলমান কূটনৈতিক টানাপোড়েন আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) এক বিবৃতিতে জানায়, জাপানের ক্ষেত্রে ‘দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য পণ্যের’ ওপর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ও তা অবিলম্বে কার্যকর হবে।
এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এলো, যখন গত নভেম্বর জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ইঙ্গিত দেন যে তাইওয়ানে কোনো হামলা হলে জাপান সামরিক প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। এরপর থেকেই টোকিওর ওপর চাপ বাড়াচ্ছে বেইজিং।
চীন স্বশাসিত দ্বীপ তাইওয়ানকে নিজের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে ও প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে তা দখলের সম্ভাবনাও নাকচ করেনি। পাশাপাশি জাপানের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েও কড়া সমালোচনা করে আসছে চীন।
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে নির্দিষ্ট কোনো পণ্যের নাম উল্লেখ না থাকলেও জাপানে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে যে বেইজিং হয়তো বিরল খনিজের সরবরাহ সীমিত করতে পারে। এসব খনিজের কিছু অংশ চীনের দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য পণ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় রেয়ার আর্থ সরবরাহকারী দেশ চীন। স্মার্টফোন থেকে শুরু করে যুদ্ধবিমান, বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্যের জন্য এসব খনিজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চীনের ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এশিয়া ও ওশেনিয়া বিষয়ক ব্যুরোর মহাসচিব মাসাকি কানাই এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ‘কঠোর প্রতিবাদ’ জানান ও অবিলম্বে এই পদক্ষেপ প্রত্যাহারের দাবি তোলেন।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) গভীর রাতে দেওয়া এক বিবৃতিতে জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, চীনা দূতাবাসের উপ-মিশন প্রধান শি ইয়ংয়ের কাছে এই প্রতিবাদলিপি তুলে ধরেন মাসাকি কানাই। তিনি বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক রীতিনীতি বিচ্যুত, সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য ও গভীরভাবে দুঃখজনক।
প্রতীকী নাকি ভয়াবহ প্রভাব ফেলবে?
জাপান অর্গানাইজেশন ফর মেটালস অ্যান্ড এনার্জির তথ্য অনুযায়ী, জাপানের বিরল খনিজ আমদানির ৭০ শতাংশেরও বেশি আসে চীন থেকে। ২০১০ সালে এক কূটনৈতিক বিরোধের সময় চীন সাময়িকভাবে জাপানে রেয়ার আর্থ রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার পর থেকেই সরবরাহ উৎস বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা করে আসছে টোকিও।
বিশ্বব্যাপী ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান টেনিও বলছে, চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিবৃতির অস্পষ্ট ভাষা ইচ্ছাকৃত হতে পারে, যাতে প্রধানমন্ত্রী তাকাইচিকে চীনের প্রতি আরও সমঝোতামূলক অবস্থান নিতে চাপ দেওয়া যায়। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংক্ষিপ্ত বিবৃতি অত্যন্ত অস্পষ্ট। নতুন ব্যবস্থাগুলোর প্রভাব প্রায় পুরোপুরি প্রতীকী থেকে শুরু করে মারাত্মকভাবে বিঘ্নসৃষ্টিকারী, যেকোনো মাত্রার হতে পারে।
টেনিও আরও বলছে, চীনের এই ঘোষণায় গুরুত্বপূর্ণ শিল্প উপকরণের ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে জাপানে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে ও তাকাইচির ওপর তাৎক্ষণিক চাপ তৈরি করেছে, যাতে তিনি ছাড় দিতে বাধ্য হন।
তাদের মতে, সম্ভাব্য একটি পরিস্থিতি হতে পারে- চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রথমে সীমিত সংখ্যক রপ্তানি লাইসেন্স আবেদন প্রত্যাখ্যান করবে। এতে সরবরাহ শৃঙ্খলে সামান্য বিঘ্ন ঘটবে, তবে একই সঙ্গে ভবিষ্যতে বড় ধরনের ক্ষতির ইঙ্গিত দেবে, যদি না টোকিও সমঝোতামূলক অবস্থান নেয়।
নোমুরা রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী অর্থনীতিবিদ তাকাহিদে কিউচি বলেন, যদি চীন খনিজের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনে, তাহলে জাপানের অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব হবে ‘অত্যন্ত মারাত্মক’। তার হিসাব অনুযায়ী, তিন মাসের জন্য বিরল খনিজের রপ্তানি বন্ধ থাকলে জাপানের প্রায় ৬৬০ বিলিয়ন বা ৬৬ হাজার কোটি ইয়েনের (প্রায় ৪২০ কোটি ডলার) ক্ষতি হতে পারে ও দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) শূন্য দশমিক ১১ শতাংশ কমে যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, বিশেষ করে ডিসপ্রোসিয়াম ও টারবিয়ামের মতো রেয়ার আর্থ, যেগুলো বৈদ্যুতিক যান (ইভি) মোটরে ব্যবহৃত নিওডিমিয়াম ম্যাগনেট তৈরিতে সহায়ক উপাদান- এসব ক্ষেত্রে জাপান চীনের ওপর প্রায় শতভাগ নির্ভরশীল।
এদিকে, বুধবার (৭ জানুয়ারি) জাপানের শীর্ষ সরকারি মুখপাত্র মিনোরু কিহারা দেশটির শিল্পখাতে সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন, ব্যবস্থাগুলোর পরিধিসহ অনেক বিষয় এখনো স্পষ্ট নয়।
সূত্র: আল-জাজিরা
এসএএইচ
সর্বশেষ - আন্তর্জাতিক
- ১ ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির পতন, শেয়ারবাজারে বড় ধস
- ২ ট্রাম্পের হাত থেকে গ্রিনল্যান্ডকে রক্ষা করতে পারবে ইউরোপ?
- ৩ পুতিনের মিত্র রমজান কাদিরভকে মাদুরোর মতো অপহরণের আহ্বান জেলেনস্কির
- ৪ বিশ্বব্যবস্থা ধ্বংস করছে যুক্তরাষ্ট্র: জার্মান প্রেসিডেন্ট
- ৫ রাশিয়ার তেলবাহী জাহাজ জব্দ করলো যুক্তরাষ্ট্র, কী করবেন পুতিন?