অনাহারের নির্মম চিত্র
ক্ষুধার জ্বালায় বাচ্চাদের পাথর খাওয়াচ্ছে আফ্রিকার পেঙ্গুইনরা
আফ্রিকান পেঙ্গুইন/ ফাইল ছবি: পেক্সেলস
দক্ষিণ আফ্রিকার বেটিস বে’র উপকূলে গ্রীষ্মের এক পরিষ্কার সকালে সাদা পেট সূর্যের দিকে রেখে দাঁড়িয়ে আছে একদল পেঙ্গুইন। এরা হলো আফ্রিকান পেঙ্গুইন। অ্যান্টার্কটিকার পেঙ্গুইনদের মতো নয়, তুলনামূলক ছোট আকৃতির এই প্রজাতিটি উষ্ণ আবহাওয়ায় টিকে থাকতে পারে। এরা সাধারণত দক্ষিণ আফ্রিকা ও নামিবিয়ার নাতিশীতোষ্ণ উপকূলজুড়ে বসবাস করে।
দেখতে আকর্ষণীয় এই পাখিরা প্রতিবছর দক্ষিণ আফ্রিকায় হাজার হাজার পর্যটক টানলেও বাস্তবতা হলো—এরা দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) আফ্রিকান পেঙ্গুইনকে ‘চরম বিপন্ন’ প্রজাতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। বর্তমানে বন্য পরিবেশে এদের প্রজননক্ষম জোড়ার সংখ্যা ১০ হাজারেরও কম বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলীয় পাখি সংরক্ষণ সংস্থা সানকব দীর্ঘদিন ধরে পেঙ্গুইনসহ সামুদ্রিক পাখি রক্ষায় কাজ করছে। ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থাটি উদ্ধার, পুনর্বাসন ও গবেষণার মাধ্যমে আফ্রিকান পেঙ্গুইন সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
আরও পড়ুন>>
আফ্রিকার উপকূলে খাদ্য সংকট, ৬০ হাজার পেঙ্গুইনের মৃত্যু
আটলান্টিকে অনাহারে মরছে পেঙ্গুইন, ভেসে এলো হাজার হাজার দেহ
জলবায়ু পরিবর্তন/ বদলে গেছে পেঙ্গুইনের জীবনচক্র, আছে বিলুপ্তির শঙ্কা
সানকবের পুনর্বাসন ব্যবস্থাপক জেড সুকহু জানান, প্রতিদিনই গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত ও অপুষ্টিতে ভোগা পেঙ্গুইন তাদের কাছে আসছে। তার কথায়, বন্য পরিবেশে এরা চরম সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
গত তিন দশকে দূষণ, আবাসস্থল ধ্বংস ও খাদ্যসংকটের কারণে আফ্রিকান পেঙ্গুইনের সংখ্যা প্রায় ৮০ শতাংশ কমে গেছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, অনাহার এখন এই পেঙ্গুইনদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ।
দক্ষিণ আফ্রিকার বন, মৎস্য ও পরিবেশ দপ্তর এবং যুক্তরাজ্যের এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণায় উঠে এসেছে, ২০০৪ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে রবিন ও ডাসেন দ্বীপে ছয় হাজারের বেশি পেঙ্গুইন অপুষ্টিতে মারা গেছে। এই দ্বীপ দুটি দেশটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রজনন এলাকা।
খাদ্যসংকটে পেঙ্গুইন
আফ্রিকান পেঙ্গুইন মূলত সার্ডিন ও অ্যাঙ্কোভির মতো ছোট ঝাঁকবদ্ধ মাছের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন ও বাণিজ্যিক কারণে অতিরিক্ত শিকারের কারণে এসব মাছের মজুত মারাত্মকভাবে কমে গেছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলে সার্ডিনের সংখ্যা ক্রমেই কমছে। ফলে পেঙ্গুইনদের খাবারের সন্ধানে অনেক দূরে সাগরে যেতে হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে প্রাপ্তবয়স্ক পেঙ্গুইনের টিকে থাকা ও বাচ্চাদের বেঁচে থাকার ওপর।
গবেষণায় দেখা গেছে, গত দুই দশকে সার্ডিনের সংখ্যা আগের তুলনায় মাত্র ২৫ শতাংশে নেমে এসেছে। নামিবিয়ার উপকূলে সার্ডিন তো প্রায় বিলুপ্তই হয়ে গেছে। এর পেছনে রয়েছে সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার পরিবর্তন ও অতিরিক্ত মাছ ধরা।
সানকবের রবিন ফ্রেজার-নোলস বলেন, মাছ ধরার শিল্প অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও লাগামছাড়া মাছ ধরলে পুরো বাস্তুতন্ত্র ধসে পড়বে।
অনাহারের নির্মম চিত্র
সানকবের পুনর্বাসন কেন্দ্রে আহত, অসুস্থ ও অপুষ্ট পেঙ্গুইনদের সার্বক্ষণিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। গত বছর সেখানে ৯৪৮টি পেঙ্গুইন আনা হয়। অধিকাংশই ছিল মারাত্মকভাবে দুর্বল।
সেখানে একটি প্রাপ্তবয়স্ক পেঙ্গুইনের ওজন পাওয়া গেছে মাত্র ১ দশমিক ৯ কেজি, যেখানে স্বাভাবিক ওজন হওয়া উচিত প্রায় চার কেজি।
সানকবের গবেষক আলবার্ট স্নাইম্যান তার ল্যাবে রাখা কিছু পাথরের দিকে ইঙ্গিত করে জানান, এসব পাথর পাওয়া গেছে মারা যাওয়া পেঙ্গুইন ছানাদের পাকস্থলীতে। চরম ক্ষুধায় বাবা-মা ছানাদের পাথর খাইয়েছে। এসব পাথর খাবারের পুষ্টি শোষণে বাধা সৃষ্টি করে, ফলে ছানারা বাঁচেনি।
এ ছাড়া বাবা-মায়ের পরিত্যাগও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। খাবারের খোঁজে দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকতে গিয়ে অনেক সময় এক অভিভাবক আর ফিরে আসে না। তখন অন্য অভিভাবকও খাবারের সন্ধানে বাসা ছেড়ে চলে যায়, ফলে ডিম বা ছানারা অনাথ হয়ে পড়ে।
একাধিক হুমকিতে বিপন্ন ভবিষ্যৎ
সানকবের পশু চিকিৎসক ডেভিড রবার্টস জানান, অপুষ্টির পাশাপাশি দূষণ, প্লাস্টিকে জড়িয়ে যাওয়া, সিল ও হাঙরের আক্রমণেও পেঙ্গুইনরা আহত হচ্ছে। মাছের সংকটে দুর্বল পেঙ্গুইনরা শিকারির হাত থেকে পালাতে পারছে না।
এ ছাড়া জাহাজ চলাচল, তেল দূষণ, শব্দ দূষণ, বার্ড ফ্লু ও এভিয়ান ম্যালেরিয়াও বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।
আশার আলো
সব সংকটের মধ্যেও কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি রয়েছে। গত বছর দক্ষিণ আফ্রিকায় ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ প্রজনন এলাকায় ১০ বছরের জন্য ‘নো-টেক জোন’ ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে মাছ ধরা ও খনন নিষিদ্ধ থাকবে।
এ ছাড়া পরিত্যক্ত ছানা উদ্ধার প্রকল্পের মাধ্যমে সানকব এরই মধ্যে ১০ হাজারের বেশি পেঙ্গুইনকে আবার প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দিয়েছে। ২০২১ সালে দেশটির প্রথম কৃত্রিম সুরক্ষিত পেঙ্গুইন কলোনিও স্থাপন করা হয়েছে।
সানকব বলছে, আগামী পাঁচ থেকে ১০ বছরে সফলতা পেতে হলে প্রাকৃতিক কলোনিগুলো স্থিতিশীল করা, সংরক্ষিত এলাকা বাড়ানো এবং সার্ডিন ও অ্যাঙ্কোভি ধরার কোটা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো জরুরি।
সংস্থাটির মতে, আফ্রিকান পেঙ্গুইনের মৃত্যু প্রমাণ করছে, পুরো বাস্তুতন্ত্র মারাত্মক সংকটে রয়েছে। খাদ্যনিরাপত্তা না থাকলে এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনেও এসে পড়বে।
সূত্র: সিএনএন
কেএএ/