ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. আন্তর্জাতিক

হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশ কি তারেক রহমানকেই চাইছে?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | প্রকাশিত: ০৩:১৪ পিএম, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

সময় তখন প্রায় মধ্যরাত ছুঁইছুঁই, তবু গাজীপুরের পোশাক শিল্পনগরীতে এক নির্বাচনি সমাবেশে মানুষের ঢল নামছিল। হাজার হাজার মানুষ শুধু বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দেখার অপেক্ষায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে সেখানে ভিড় জমিয়েছিলেন। চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি থেকে দেশব্যাপী এমন জনসভা করে যাচ্ছেন।

বিএনপি নেতারা তারেক রহমানের এসব সমাবেশকে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের কঠোর দমন-পীড়নের শিকার হওয়া সত্ত্বেও দলটি যে ফের শক্তভাবে সংগঠিত হতে পেরেছে, তার প্রমাণ হিসেবে দেখছেন।

গত বছর নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আওয়ামী লীগকে রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ করে, যার ফলে বৃহস্পতিবারের (১২ ফেব্রুয়ারি) নির্বাচনে বিএনপি অন্যতম শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছে। বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী এখন জামায়াতে ইসলামী, যা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েছে। এনসিপি গঠিত হয়েছে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণ নেতাদের একটি অংশকে নিয়ে।

যুক্তরাজ্যে ১৭ বছরের দীর্ঘ নির্বাসন শেষে গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশে ফেরেন তারেক। ফেরার পর থেকেই ৬০ বছর বয়সী এই নেতা বিএনপির নির্বাচনি প্রচারে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় রয়েছেন। সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) শেষ হওয়া তার প্রতিটি সমাবেশেই বিপুল জনসমাগম হয়েছে।

তারেক রহমানের উপস্থিতি বিএনপির পুনর্জাগরণের প্রতীক হিসেবে কাজ করেছে, যে দলটি হাসিনার আমলে গ্রেফতার, গুম, অভ্যন্তরীণ ভাঙন ও ভোটারদের থেকে বিচ্ছিন্নতার মতো সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে।

মূলত তার দেশে ফেরার প্রতীকী শক্তি, দৃশ্যমান, জনসংযোগ ও সামনে থেকে নেতৃত্বদান- বিএনপির তৃণমূল ভিত্তিকে আবারও উজ্জীবিত করেছে, যার শেকড় তার বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় পর্যন্ত বিস্তৃত। এই তৃণমূল ভিত্তিই ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানকে হত্যার আগ পর্যন্ত বিএনপি নামক দলটিকে গড়ে তুলেছিল।

তবে এই ব্যাপক উদ্দীপনার মধ্যেও অনিশ্চয়তা ক্রমেই বাড়ছে, ফলে পুরো নির্বাচন প্রচারণা এক ধরনের প্রত্যাশা ও সংশয়ের দ্বৈত চাপে কাটছে।

নেতৃত্বের পরীক্ষা: নির্বাসন থেকে মাঠে নেতৃত্ব

প্রায় ১৭ বছর লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি বিএনপিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তারেক। দলটির জ্যেষ্ঠ নেতৃত্ব, বিশেষ করে তার মা খালেদা জিয়াসহ অনেকেই নানা মামলা, গ্রেফতার ও রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার ছিলেন। দেশে ফিরে তার কর্তৃত্ব মাঠের রাজনীতিতে দৃশ্যমান হলেও, প্রতীকী নেতৃত্বকে কার্যকর সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণে রূপান্তর করা যে কঠিন, তা দ্রুতই পরিষ্কার হয়েছে।

বিএনপির প্রথম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল দলের শৃঙ্খলা বজায় রাখা। ৩০০ আসনের মধ্যে ৭৯টিতে ৯২ জন বিদ্রোহী প্রার্থী দলীয় মনোনীতদের বিরুদ্ধে লড়ছেন, যা স্থানীয় পর্যায়ের দীর্ঘদিনের অন্তর্দ্বন্দ্বকে আরও স্পষ্ট করেছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও বিশ্লেষক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান বলেন, বিএনপির অন্তর্দ্বন্দ্ব আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে রেকর্ড করা রাজনৈতিক সহিংসতার ৯১ শতাংশেই বিএনপি কর্মীরা জড়িত, যা দলের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

বিএনপি নেতৃত্ব নিয়ে গবেষণা করা রাজনৈতিক বিশ্লেষক দিলারা চৌধুরী বলেন, নির্বাচনি প্রচারণায় দলের শৃঙ্খলার অভাব আরও প্রকট হয়েছে। এটি বড় দুর্বলতা।

আল-জাজিরাকে দিলারা বলেন, তিনি (তারেক) এখনো দলের মধ্যে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। বিদ্রোহী প্রার্থীরা উঠে এসেছেন ও অনেকে প্রকাশ্যেই কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করছেন।

হাসানুজ্জামান মনে করেন, পারিবারিক উত্তরাধিকার তারেকের জন্য নির্বাচনে সুবিধা হলেও দিলারা চৌধুরীর মতে, এটি তার ওপর প্রত্যাশা ও চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

দিলারা চৌধুরী বলেন, খালেদা জিয়া বা জিয়াউর রহমানের চেয়ে উজ্জ্বল হয়ে ওঠা সহজ নয়। আমি মনে করি না তিনি এখনো ওই পর্যায়ের ক্যারিশমা দেখাতে পেরেছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, এই নির্বাচন তারেক রহমানের নেতৃত্বদানের প্রথম বড় পরীক্ষা। যদি তিনি সব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও দলকে বিজয়ের দিকে নিতে পারেন, এটা তার নিজস্ব নেতৃত্বের প্রথম বড় সাফল্য হবে।

‘খুব কম হোমওয়ার্ক’

এদিকে, কিছু জনসভায় তারেকের বক্তব্য সমালোচনার মুখে পড়েছে। অনেক বিশ্লেষক বলেন, তার প্রতিশ্রুতিগুলো অতিমাত্রায় উচ্চাভিলাষী এবং কখনো কখনো তথ্যগত ভুলে ভরা, যা বিশেষ করে দ্বিধান্বিত ভোটারদের আস্থায় আঘাত করছে।

তারেক রহমানের বিভিন্ন দাবি নিয়ে অনলাইনে ব্যাপক ফ্যাক্টচেক ছড়িয়েছে। ফরিদপুরের এক সমাবেশে তিনি বলেন, এলাকায় প্রচুর সয়াবিন উৎপাদিত হয়। তাৎক্ষণিকভাবে এই দাবি খণ্ডিত হয়, কারণ ফরিদপুর সয়াবিনের প্রধান অঞ্চল নয়; দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলে এ ফসল বেশি হয়।

আরও একটি ভাইরাল গ্রাফিকে তার বেশকিছু প্রতিশ্রুতি বিদ্রূপাত্মকভাবে তুলে ধরা হয়, যা হয় এরই মধ্যে বাস্তবায়িত, নয়তো ২০০১-০৬ বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময়ের পুনরাবৃত্তি। এর মধ্যে ছিল চট্টগ্রামকে ‘বাণিজ্যিক রাজধানী’ ঘোষণা করার প্রতিশ্রুতি।

আল-জাজিরা বলছে, দলীয় নেতাদের অনেকে স্বীকার করেছেন, এসব ভুল তার প্রস্তুতির ঘাটতির প্রমাণ। দিলারা চৌধুরী বলেন, তিনি প্রচারণার দায়িত্ব নিয়েছেন, কিন্তু তার হোমওয়ার্ক খুবই কম। তিনি অনেক ভুল বক্তব্য দেন, যেমন ৫০ কোটি গাছ লাগানোর কথা বলা। এটা বাস্তবসম্মত নয়।

তাঁর ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রস্তাব, নারী ও বেকারদের মাসিক ভাতা দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন দিলারা। বলেন, টাকা আসবে কোথা থেকে? আর বেকার ভাতা অনির্দিষ্টকালের জন্য দিলে কর্মোদ্দীপনা কমে যাবে।

তারেক রহমানের দুর্নীতি দমনের প্রতিশ্রুতি নিয়েও সংশয় রয়েছে, কারণ ২৩ জন ঋণখেলাপিকে মনোনয়ন দিয়েছেন তারেক- এ তথ্যও তুলে ধরেছেন দিলারা চৌধুরী।

সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) জাতির উদ্দেশে টেলিভিশন বক্তব্যে তারেক এসব উদ্বেগের জবাব দিতে চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্র ও সরকারকে জনগণের জবাবদিহির আওতায় আনা ছাড়া বিকল্প নেই। ক্ষমতায় এলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ কঠোর হবো।

যুবসমর্থন ও ভাবমূর্তি সংকট

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তা খান সোবায়েল বিন রফিক বলেন, ১৮ থেকে ২৬ বছর বয়সী নতুন ভোটাররা বিএনপির আমল দেখেনি। তাদের মধ্যে বিএনপি মানেই দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি- এ ধারণা গেঁথে আছে। আর দলটি এখনো সেই ভাবমূর্তি বদলাতে পারেনি।

নিজেও হাসিনা সরকারের কঠোর নীতির শিকার ছিলেন সোবায়েল। ২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহের তদন্তে একটি ‘মিথ্যা প্রতিবেদন’ স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানানোর পর তাকে ১১ বছর মালয়েশিয়ায় নির্বাসনে থাকতে হয়।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বাংলাদেশ ও মিয়ানমারবিষয়ক পরামর্শক থমাস কীন মনে করেন, হাসিনার সময়কার দমন-পীড়নে বাংলাদেশ ফিরবে না। তবে তিনি বলেন, বিএনপিকে ঘিরে চাঁদাবাজি বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ সত্য হোক বা না হোক, দলের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

‘মেধার চেয়ে অনুগতদের প্রাধান্য বেশি’

শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) ঢাকার একটি বিলাসবহুল হোটেলে বিএনপির ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে তারেক বলেন, ‘উপযুক্ত ব্যক্তিকে উপযুক্ত জায়গায়’ বসানোর গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু বিশ্লেষক ও তার দলের ভেতরের অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন- এ নীতি তার নিজের টিমে প্রতিফলিত হচ্ছে কি না।

এক বিএনপি নেতা আল-জাজিরাকে বলেন, বিদেশে নির্বাসনকালে তার ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টারা এখনো তাকে ঘিরে আছেন, যাদের বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণা কম। অনেক কিছু বদলে গেছে ১৭ বছরে।

দলের আরেক নেতা বলেন, দেশজুড়ে ব্যাপক ভ্রমণ করলেও তিনি তৃণমূলের সরাসরি প্রতিক্রিয়া থেকে দূরে থাকছেন। তারেক রহমান মাঠে ঘুরছেন ঠিকই, কিন্তু বাস্তবতা থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন। তিনি অনুগতদেরই প্রাধান্য দিচ্ছেন, মেধাবীদের নয়। দল চালানো যায় অনুগতদের দিয়ে, কিন্তু সরকার চালানো যায় না।

দিলারা চৌধুরীও বলেন, দলের দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতাদের অনেকেই উপেক্ষিত বোধ করছেন। দেশের ভেতরের যারা বছরের পর বছর দুঃসময় সামলেছেন, তারা মনে করছেন লন্ডনঘনিষ্ঠদের বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এতে দলের ভেতরেই দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে।

রাজনৈতিক বৈধতা কি দুর্বল হবে?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহান বলেন, তারেক রহমান ‘এক কঠিন পরিস্থিতিতে’ রয়েছেন। দল ভূমিধস জয় না পেলে দোষ তার। আর জিতলে বলা হবে, এটাই তো প্রত্যাশিত! তার জন্য স্পষ্ট কোনো লাভ নেই।

সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দু মূলত তার পারিবারিক উত্তরাধিকার। অনেক তরুণ ভোটার নতুন নেতৃত্ব চান, কিন্তু একইসঙ্গে জিয়া পরিবারকে ঘিরে তৃণমূলে এখনো ব্যাপক সমর্থন রয়েছে। বিএনপি নেতারা অবশ্য এটিকে সমস্যা মনে করেন না।

সম্প্রতি আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক উত্তরাধিকার সাধারণ বিষয়, যদি নেতা দক্ষ, জবাবদিহিমূলক ও জনগণের পর্যবেক্ষণের আওতায় থাকেন।

সোবায়েল বিন রফিক ব্যক্তিকে এবং সংগঠনকে আলাদা করে দেখেন। তিনি বলেন, তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চাই। কিন্তু বিএনপি সংগঠন হিসেবে ভালো অবস্থানে নেই।

দিলারা চৌধুরী বলেন, বেসামরিক ও সামরিক আমলাতন্ত্রের একটি অংশ বিএনপিকে ‘পুরোনো স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ অবস্থায়’ ফেরার সুযোগ হিসেবে দেখছে, যাতে তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারে।

শেষমেষ বলা যায়, তারেক রহমানের কাছে এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং এক ধরনের গণরায়। ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে তার প্রত্যাবর্তন সত্যিকার পরিবর্তনের প্রতীক, নাকি পুরোনো চক্রেরই নতুন রূপ।

সোমবার (৯ জানুয়ারি) জাতির উদ্দেশে ভাষণে তিনি বলেন, অতীতে দেশ পরিচালনায় অনিচ্ছাকৃত কোনো ভুল হয়ে থাকলে আমি আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ও আমাদের অর্জনের ভিত্তিতে আমরা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই।

সূত্র: আল-জাজিরা

এসএএইচ