বাংলাদেশে থাকা বিহারিদের কেন ভুলে গেছে পাকিস্তান?
১৯৭১ সালে দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বাংলাদেশের কাছে হেরে গেছে পাকিস্তান। পাকিস্তানি সেনারা ১৬ ডিসেম্বরে আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হয়েছিল যৌথবাহিনীর কাছে। বাঙালির কাছে হেরে পাক সেনারা বিদায় নিলেও এখনো বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছে পাকিস্তানের কয়েক লাখ বিহারি।
এসব বিহারিকে ফিরিয়ে নিতে পাকিস্তানের তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ দেখা যায়নি। পাকিস্তানের কায়েদে আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাজা আদনান রাজ্জাক দেশটির প্রভাবশালী দৈনিক দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের ব্লগে ‘বাংলাদেশে থাকা ২৫ লাখ শরণার্থীকে কেন ভুলে গেছে পাকিস্তান?’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেছেন।
নিবন্ধে বাংলাদেশে থাকা পাকিস্তানিদের অধিকার, দুর্দশা, মানবেতর জীবন-যাপন ও পাকিস্তান সরকার কেন তাদের ফিরিয়ে নিতে কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না সে সিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। জাগো নিউজের পাঠকদের জন্য এর চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো।
রাজা আদনান রাজ্জাক লিখেছেন, কয়েক বছর আগে লন্ডনের মেলবোর্ন স্টেশন থেকে বার্মিংহামে যাচ্ছিলাম। এশিয়ার একজন বয়স্ক মানুষের সঙ্গে বসেছিলাম, সম্ভবত বাংলাদেশি হবে। আমাদের আলোচনা এক পর্যায়ে ঢাকার পতনে গিয়ে পৌঁছে। হঠাৎ তিনি আক্রমণাত্মক সুরে বলেন, পাকিস্তান কখনো চায়নি বাংলাদেশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাক।
তিনি (বাংলাদেশি) বলেন, ১৯৪৮ সালে জিন্নাহ ঢাকায় বাঙালি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসেন। জিন্নাহ বলেন, উর্দু হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা। ওই বাংলাদেশি দুঃখ করে বলেছিলেন, শুরু থেকেই হৃদয় ও মনের বিভাজন স্পষ্ট ছিল; তাই বাংলাদেশ সৃষ্টি ছিল অনিবার্য।
পাকিস্তানি এই অধ্যাপক লিখেছেন, ঢাকার পতনের দায় কার সেটি বিরামহীন এক বিতর্ক। যুদ্ধ মানেই মৃত্যু, অসম্মান, অপহরণ, অবৈধ দখলদারি। সেই যুদ্ধের জ্বলজ্বলে তথ্য আছে, কিন্তু ভাগ্য আপনার অন্তর্বেদনা বাড়িয়ে তোলে, এর ফলে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের একজন অনুগত ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হওয়ার জন্য প্রতিনিয়ত আপনাকে ভোগান্তি পোহাতে হবে?
তিনি লিখেছেন, বাংলাদেশের জেনেভা ক্যাম্প ও অন্যান্য এলাকায় ২৫ লাখ উর্দুভাষী পাকিস্তানির ভাগ্যে ঠিক এ রকমই ঘটছে। তারা কোন পরিচয় বা সঠিক শিক্ষা ছাড়া দুঃস্থ জীবন যাপনে বাধ্য হয়েছে। একটি দেশের (পাকিস্তান) জন্য সবকিছু উৎসর্গ করে যুদ্ধের দায়ে তারা অভিযুক্ত হয়েছে।
অধ্যাপক রাজা আদনান রাজ্জাক ১৯৭১ সালের কথা স্মরণ করে বলেছেন, ভারতীয় রাজনীতিক ও ভারতীয় সেনাবাহিনী সমর্থিত মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য এসব শরণার্থী ভুল করে পাকিস্তান সরকারের পক্ষ নিয়েছিল। দুর্ভাগ্যজনক, পূর্ব পাকিস্তানে তাদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারেনি এবং যুদ্ধে পরাজিত হয়েছে।
পাক সেনাবাহিনী ভারতীয়দের কাছে আত্মসমর্পন করেছে এবং বাংলাদেশ গঠনে দ্বিজাতি তত্ত্ব আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। পাকিস্তানি এই উর্দুভাষী জনগণ বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তাদেরকে পচানোর জন্য ক্যাম্পে পাঠানো হয়েছে। তাদের পরিচয় পুরোপুরি মুছে ফেলা হয়েছে। এখন এই আটকা পড়া পাকিস্তানিরা ছোট্ট খুপড়িতে বসবাস করছে এবং একদিন তারা পাকিস্তানে প্রত্যাবাসিত হবে সেই স্বপ্ন দেখছে।
বাংলাদেশে থাকা পাকিস্তানিরা ২০০৮ সালে সুপ্রিমকোর্টের এক আদেশে ভোটাধিকার পেয়েছে, তবে তারা বাংলাদেশি নাগরিকত্ব পায়নি। রাজা আদনান প্রশ্ন করে বলেছেন, তারা কী ভোটাধিকার বা জাতীয়তা চেয়েছে? এর ফলে তারা কী লাভবান হয়েছে? বাংলাদেশে যদি পাকিস্তানি শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেওয়া হয় তাহলে তাদের পুনর্বাসনও করতে হবে। বাংলাদেশ সরকার আদৌ কী তা করবে, নাকি করবে না?
এই আটকা পড়াদের নিয়ে পাকিস্তানে কথা বলার জন্য কেউ ছিল না এবং ইচ্ছুক নয়; যেহেতু এটি তিক্ততা এবং লজ্জাকে ফিরে আনে। তাদেরকে বাংলাদেশে পুনর্বাসন করতে জেনারেল পারভেজ মোশাররফ ক্ষমা চেয়ে বাঙালির মন জয় করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সেটি শেষ পর্যন্ত হয় ওঠেনি।
বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের পরাজয়ের ৪৫ বছর কেটে গেছে। পাকিস্তানি অধ্যাপক রাজা আদনান রাজ্জাক বলেছেন, এই মানুষরা এক সময় পাকিস্তানের নাগরিক ছিলেন। ভেবেছিলেন, সঠিক কারণেই দেশ ও সরকারের জন্য তারা লড়াই করেছিলেন। কিন্তু এখন একই জাতি (পাকিস্তানি) এ রকম জ্বলন্ত একটি ইস্যুতে কেমন করে চোখ বন্ধ রেখেছে?
এসআইএস/এবিএস
সর্বশেষ - আন্তর্জাতিক
- ১ সংক্ষিপ্ত বিশ্ব সংবাদ: ৩১ মার্চ ২০২৬
- ২ ‘ধ্বংসের পথে’ পুরোনো ব্যবস্থা, ‘মাল্টিপোলার’ বিশ্বে ক্ষমতার লড়াই চলছে!
- ৩ মিত্রদের ‘সাহস করে’ হরমুজে গিয়ে তেল ‘ছিনিয়ে নিতে’ বললেন ট্রাম্প
- ৪ ইরান যুদ্ধে আমিরাতের শেয়ারবাজারে ধস, উধাও ১২ হাজার কোটি ডলার
- ৫ ইরানের ‘ব্লিটজ’ হামলায় বিপর্যস্ত যৌথ বাহিনী, ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা