দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে এত আলোচনা কেন?
দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে শুরু থেকেই সালিসি কাউন্সিলের অনুমতির বিধান ছিল, ফাইল ছবি
দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে হঠাৎ করেই সরগরম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ফেসবুকে ঢুকলেই চোখে পড়ছে দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে নানা পোস্ট ও মন্তব্য। কেউ প্রশ্ন তুলছেন, প্রথম স্ত্রী থাকতে দ্বিতীয় বিয়ে কেন, কেউ জানতে চাইছেন আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টি, আবার কেউ বলছেন, প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া কীভাবে দ্বিতীয় বিয়ে সম্ভব? আইন কী বলে, হাইকোর্টের রায়ে কী বলা হয়েছে, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন নেটিজেনরা।
এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর বহুবিবাহ সংক্রান্ত ধারা এবং এ বিষয়ে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়।
রিট করেছিলেন আইনজীবী ইশরাত জাহান
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৬ ধারা (বহুবিবাহ) চ্যালেঞ্জ করে ২০২১ সালের ১৩ ডিসেম্বর হাইকোর্টে রিট করেন আইনজীবী ইশরাত জাহান। রিটে তার যুক্তি ছিল, এই ধারার মাধ্যমে নারীর সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
তিনি বলেন, ইসলামে একাধিক বিয়ের অনুমতি থাকলেও শর্ত হিসেবে সব স্ত্রীর প্রতি সমান সুবিচারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আইনে সেই শর্ত বাস্তবায়নের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। শুধু ‘বিয়ে করার অনুমতি’ অংশটি নেওয়া হচ্ছে, কিন্তু সুবিচার, ভরণপোষণ কিংবা আর্থিক সক্ষমতা যাচাইয়ের সুযোগ সালিসি কাউন্সিলের নেই। এতে নারীরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
হাইকোর্টের রুল ও চূড়ান্ত রায়
রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ২০২২ সালের ৫ জানুয়ারি বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের বেঞ্চ একটি রুল জারি করেন। রুলে বহুবিবাহ সংক্রান্ত আইনের বিষয়ে নীতিমালা প্রণয়ন এবং স্ত্রীদের সম-অধিকার নিশ্চিত না করে বহুবিবাহের অনুমতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়।
রুলের শুনানি শেষে গত বছরের ২০ আগস্ট হাইকোর্ট রুল খারিজ করেন। ফলে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর বহুবিবাহ সংক্রান্ত ধারা বহাল থাকে। এই রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি প্রকাশ পাওয়ার পর নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
হাইকোর্ট কী বলেছেন
পূর্ণাঙ্গ রায় হাতে পাওয়ার পর আইনজীবী ইশরাত জাহান জানান, হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছে, মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৬ ধারা কোনোভাবেই বৈষম্যমূলক বা স্বেচ্ছাচারী নয়। এই আইন নারী ও পুরুষ, কোনো পক্ষেরই মৌলিক অধিকার খর্ব করে না।
রায়ে আরও বলা হয়, সালিসি কাউন্সিল একতরফাভাবে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারে না এবং বহুবিবাহের অনুমতি দেওয়ার বা না দেওয়ার ক্ষেত্রে আইনি কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই। এই ধারা দেশের নারীদের কোনো মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে না বলেও রায়ে উল্লেখ করা হয়। ফলে রুল সমর্থনে উত্থাপিত যুক্তির সারবত্তা নেই বলে রুল ডিসচার্জ করা হয়েছে।
দ্বিতীয় বিয়েতে তবে কার অনুমতি লাগবে?
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৬ (১) ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির বিয়ে বহাল থাকা অবস্থায় তিনি সালিসি কাউন্সিলের লিখিত অনুমতি ছাড়া আরেকটি বিয়ে করতে পারবেন না। অনুমতি ছাড়া করা বিয়ে নিবন্ধনযোগ্যও নয়।
আইনে বলা হয়েছে, আবেদনকারীকে নির্ধারিত ফি দিয়ে চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করতে হবে। আবেদনে প্রস্তাবিত বিয়ের কারণ ও বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের সম্মতি নেওয়া হয়েছে কি না, তা উল্লেখ করতে হবে। চেয়ারম্যান আবেদনকারী ও বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীর প্রতিনিধি মনোনয়ন করতে বলবেন। সালিসি কাউন্সিল প্রস্তাবিত বিয়ে প্রয়োজনীয় ও ন্যায়সঙ্গত মনে করলে অনুমতি দিতে পারবেন। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সহকারী জজের কাছে পুনর্বিবেচনারও সুযোগ রয়েছে।
অনুমতি ছাড়া বিয়ে করলে শাস্তি ও জরিমানা
সালিসি কাউন্সিলের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের দেনমোহরের পুরো টাকা তাৎক্ষণিক পরিশোধ করতে হবে। অর্থ পরিশোধ না করলে তা ভূমি রাজস্বের মতো আদায়যোগ্য হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
আগে যা ছিল, এখনও তাই আছে
আইনজীবী ইশরাত জাহান বলেন, বহুদিন ধরেই ভুলভাবে বলা হচ্ছিল যে দ্বিতীয় বিয়ের জন্য প্রথম স্ত্রীর অনুমতি বাধ্যতামূলক। বাস্তবে আইনে কোথাও প্রথম স্ত্রীর অনুমতিকে শর্ত করা হয়নি। বরং শুরু থেকেই সালিসি কাউন্সিলের অনুমতির বিধান ছিল।
তিনি বলেন, ‘হাইকোর্ট নতুন করে কিছু বলেননি। আগে যা ছিল, রুল খারিজের মাধ্যমে সেটিই বহাল রাখা হয়েছে। অর্থাৎ সালিসি কাউন্সিলের অনুমতি পেলে দ্বিতীয় বিয়ে করা যাবে, আইনের অবস্থান আগেও এমন ছিল, এখনও তাই আছে।’
রিট করার বিষয়ে ইশরাত জাহান বলেন, বহুবিবাহের বিধান (আইনের ৬ ধারা) চ্যালেঞ্জ করেই রিট আবেদনটি করা হয়। কেননা আরবিট্রেশন কাউন্সিলের কাছে এই ক্ষমতাটা থাকা সমীচীন নয়, চেয়ারম্যান পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারেন। তাই আমরা চাচ্ছিলাম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া হবে না, নতুন করে একটি নীতিমালা হোক। শুধু তাই নয়, স্ত্রীদের সম-অধিকার কীভাবে নিশ্চিত হবে, সে বিষয়ে কোনো নীতিমালা নেই। উপরন্তু একজন ব্যক্তি একাধিক বিয়ের জন্য শারীরিক, মানসিক ও অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম কি না, তা যাচাইয়ের সক্ষমতা কাউন্সিলের নেই।
এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করার সুযোগ রয়েছে বলেও জানান তিনি।
এসএনআর/এমএমএআর/এমএস