চানখাঁরপুলে ৬ হত্যার রায়
সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড
সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান/ফাইল ছবি
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর চানখাঁরপুলে আনাসসহ ৬ জনকে হত্যার অভিযোগে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড দিয়ে রায় ঘোষণা করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপ-কমিশনার শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলাম।
পলাতক রমনা অঞ্চলের সাবেক সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ ইমরুলের ৬ বছর আর বাকি ৩ জনের প্রত্যেককে তিন বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তারা হলেন-কনস্টেবল সুজন হোসেন, নাসিরুল ইসলাম ও ইমাজ হোসেন। এছাড়া শাহবাগ থানার সাবেক পরিদর্শক (অপারেশন) মো. আরশাদ হোসেনের ৪ বছর কারাদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
সোমবার (২৬ জানুয়ারি) ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন, বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে এই মামলায় শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। সেই সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামীম, সহিদুল ইসলাম ও আবদুল্লাহ আল নোমানসহ অন্য প্রসিকিউটররা। অন্যদিকে আসামি ইমাজ হোসেন ইমনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. জিয়াউর রশিদ এবং পলাতক চার আসামির পক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী হিসেবে ছিলেন কুতুবউদ্দিন আহমেদ।
রায়ের পর এক প্রতিক্রিয়াই চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম তিন আসামির মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তবে বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের দণ্ড বাড়ানোর বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টে আপিল আবেদন করা হবে বলে জানিয়েছেন।
শহীদ পরিবারের সদস্যরা রায়ের প্রতিক্রিয়াই জানিয়ে বলেন, আমরা আজকের এ রায় ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করছি! এসময় পরিবারের সদস্যরা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন এবং তাদের আসামিরা মুক্তি পাওয়ার পর ভিকটিম পরিবার ও ভোক্তভোগী পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন।
গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় এ নিয়ে দ্বিতীয় কোনো মামলার রায় এটি। চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর রায় সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার রায় পড়ে শোনান। রায়ে ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী ও রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহ্ আলম মো. আখতারুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল। এই তিন আসামির সম্পদ জব্দের আদেশও দেওয়া হয়েছে রায়ে।
রায়ে ডিএমপির রমনা অঞ্চলের সাবেক সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ ইমরুলকে ছয় বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। শাহবাগ থানার সাবেক পরিদর্শক মো. আরশাদ হোসেনকে চার বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। আর সাবেক কনস্টেবল মো. সুজন হোসেন, ইমাজ হোসেন ও মো. নাসিরুল ইসলামকে তিন বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয় রায়ে।
মামলার আসামিদের মধ্যে চারজন পলাতক। তারা হলেন হাবিবুর, সুদীপ, আখতারুল ও ইমরুল। গ্রেফতার আছেন আরশাদ, সুজন, ইমাজ ও নাসিরুল। চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর রায় সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। এর আগে গ্রেফতার হওয়া আসামিদেরকে কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চানখাঁরপুল এলাকায় শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে গুলি চালায় পুলিশ। এতে শাহরিয়ার খান আনাস, শেখ মাহদী হাসান জুনায়েদ, মো. ইয়াকুব, মো. রাকিব হাওলাদার, মো. ইসমামুল হক ও মানিক মিয়া শাহরিক নিহত হন।
এ ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গত ২৫ মে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে ওই দিন পলাতক চার পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
চানখাঁরপুলের মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছিল ২০২৫ সালের ২১ এপ্রিল। পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালে এটিই ছিল প্রথম তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল। একই বছরের ২৫ মে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। সেদিনই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল। এরপর ৩ জুন পলাতকদের হাজির করতে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।
বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরও হাজির না হলে ১৪ জুলাই আট আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আদালত। তারই ধারাবাহিকতায় ১০ আগস্ট সূচনা বক্তব্যে উপস্থাপন এবং ১১ আগস্ট সাক্ষী গ্রহণ শুরু হয়। একই দিন চানখাঁরপুলে শহীদ শিক্ষার্থী শাহারিয়ার খান আনাসের বাবা সাহরিয়ার খান এ মামলায় প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন।
এ মামলায় সাক্ষ্য দেন সাবেক স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। প্রসিকিউশন এই মামলায় ২৬ জন সাক্ষী উপস্থাপন করে। আসামিপক্ষও এ মামলায় সাক্ষী উপস্থাপন করে। গত বছরের ১০ ডিসেম্বর এ মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ সমাপ্ত হয়। এ মামলায় রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষে গত ২৪ ডিসেম্বর রায় ঘোষণার জন্য গত ২০ জানুয়ারি দিন ঠিক করেছিলেন ট্রাইব্যুনাল। তবে রায় প্রস্তুত না হওয়ায় পরে তা পেছানো হয় বলে জানায় প্রসিকিউশন।
এর আগে গত বছরের ১৭ নভেম্বর ট্রাইব্যুনাল থেকে জুলাই আন্দোলনের প্রথম রায় এসেছিল। ওই রায়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। মামলার অন্য আসামি পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সাবেক আইজিপি মামুন নিজের অপরাধ স্বীকার করে ওই মামলায় অ্যাপ্রুভার (রাজসাক্ষী) হয়েছিলেন।
এফএইচ/এসএনআর/এমআইএইচএস/জেআইএম
সর্বশেষ - আইন-আদালত
- ১ উত্তরা স্কয়ারে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় গ্রেফতার ১১ জন কারাগারে
- ২ উত্তরা স্কয়ারে হামলার মামলায় দুই নারীর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি
- ৩ রাকিব হত্যা: দুই আসামি স্বীকারোক্তি, দুইজনের ৫ দিনের রিমান্ড
- ৪ উত্তরায় শপিং কমপ্লেক্সে ভাঙচুর, গ্রেফতার ১১ জন রিমান্ডে
- ৫ ২ লাখ গরু আমদানির নামে জালিয়াতি, ২০ কোটি টাকা প্রতারণার চেষ্টা