ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. আইন-আদালত

নির্বাচনে ঋণ খেলাপিদের অংশগ্রহণ, দায় কার?

মুহাম্মদ ফজলুল হক | প্রকাশিত: ০২:৪২ পিএম, ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। এই নির্বাচনে অংশগ্রহণে ইচ্ছুক বেশ কয়েকজন ঋণ খেলাপির আপিল আবেদন সম্প্রতি বাতিল হয়েছে। যদিও আদালতের স্থগিতাদেশ পাওয়া প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেন। বিষয়টি আইনিভাবে সুরাহা না হলে নির্বাচিত হওয়ার পরেও ঋণ খেলাপি প্রমাণিত হলে সংসদ সদস্য পদ বাতিল হতে পারে।

তবে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় এসব ঘটনা নিয়ে নির্বাচনি আদালতে গিয়ে মামলা করলে নিষ্পত্তি হতে হতে সংসদের মেয়াদই শেষ হয় যায়। তাই এসব সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও দলীয় প্রধানদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আছে। তবে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে বেঞ্চ সুনির্দিষ্ট করে নির্বাচনের আগে এবং পরে দ্রুত সমাধান করা যেতে পারে বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার প্রক্রিয়া

মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার আগেই একজন প্রার্থীকে খেলাপি ঋণ পরিশোধ বা নবায়ন করতে হয়। নইলে তার নাম বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) তালিকায় চলে আসে। সিআইবি রিপোর্টে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ঋণ পরিশোধের ইতিহাস ও খেলাপির তথ্য থাকে। ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ অনুমোদনের আগে এই রিপোর্ট দেখে সিদ্ধান্ত নেয়। নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। সিআইবি লিস্টে থাকা ঋণখেলাপিরা প্রার্থী হতে পারেন না। ঋণখেলাপি হয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিলে তা অযোগ্য হিসেবে বাতিল করা হতে পারে।

এজন্য এবার তফসিল ঘোষণার আগেই সিআইবির ক্লিয়ারেন্স পেতে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে দৌড়ঝাঁপ করেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। এ নিয়ে গত ১৬ নভেম্বর নির্বাচনের আগে ‘সিআইবি ক্লিয়ারেন্স’ নিতে দৌড়ঝাঁপ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করে জাগো নিউজ।

আরও পড়ুন:

নির্বাচিত হলে ঋণখেলাপিদের জন্য পরবর্তী বাংলাদেশ জাহান্নাম বানিয়ে দেব

আপিলও খারিজ, নির্বাচন করতে পারবেন না হাসনাতের প্রতিদ্বন্দ্বী মুন্সী 

তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জাগো নিউজকে বলেন, প্রতিদিন ১৫-২০ জন প্রার্থী আদালতের স্টে অর্ডার নিয়ে আসছেন। অনেক ক্ষেত্রে আদালত নির্দেশ দেন ‘খেলাপি বলা যাবে না।’ অথবা ‘সিআইবি তালিকা থেকে নাম বাদ দিতে হবে।’ কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসব নির্দেশ অমান্য করতে পারে না। তাই সিআইবিতে লিখতে হয় ‘কোর্টের নির্দেশনায় আনক্লাসিফায়েড/স্ট্যান্ডার্ড।’

আদালতের স্থগিতাদেশ

বাস্তবে দেখা গেছে, কিছু প্রার্থী ঋণ খেলাপি হলেও উচ্চ আদালতে স্থগিতাদেশ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেন। তবে তাদের চূড়ান্ত যোগ্যতা আদালতের ফয়সালা ও ঋণ পরিশোধ বা নানাভাবে নিষ্পত্তির ওপর নির্ভর করে।

নির্বাচিত হওয়ার পরও ব্যবস্থা

নির্বাচিত হওয়ার পরেও যদি প্রমাণিত হয় যে কেউ তথ্য গোপন করে ঋণ খেলাপি ছিলেন, তখন নির্বাচন কমিশন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল করতে বা পদত্যাগের ব্যবস্থা নিতে পারে।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের সংবিধান সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও সিনিয়র অ্যাডভোকেট সৈয়দ মামুন মাহবুব জাগো নিউজকে বলেন, সংবিধানের পরেই যে আইন দিয়ে ইলেকশন ম্যাটারগুলো রেগুলেট হয় গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ১৯৭২ এবং সংশ্লিষ্ট ধারা ১২ ওয়ান এল এবং এম-এ আছে- কেউ যদি ঋণ গ্রহণ করেন ব্যক্তিগতভাবে এবং সেটা যদি খেলাপি হয়, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার দিন পর্যন্ত যদি খেলাপি থাকেন, তাহলে তিনি ঋণ খেলাপি এবং নির্বাচন করতে পারবেন না। উপ-ধারা এম-এর মধ্যে এটাও আছে, যদি কেউ কোম্পানির পরিচালক বা ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাকেন বা কোম্পানিতে ২০ শতাংশ শেয়ার থাকে সেই কোম্পানি যদি খেলাপি হয় তাহলেও নির্বাচন করতে পারবে না।

ইচ্ছাকৃত ও স্বেচ্ছায় ঋণ খেলাপি

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব আরও বলেন, আমার কথা হচ্ছে, কেউ ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপি। আবার কেউ নানা কারণে। যেমন আওয়ামী লীগের সময় যারা ভিন্নমতের রাজনীতি করতেন তারা তো ব্যবসাই করতে পারেননি। গ্রেফতার হতেন বা তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা হতো। এখন যে রকম আওয়ামী লীগদের ওপরে হচ্ছে। এটা ঋণ খেলাপি হওয়ার একটা কারণ। আর যারা বড় বড় ঋণ খেলাপি এস আলম, সালমান এফ রহমান বা ভবিষ্যতে যারা এস আলম হবেন সেটার ব্যাপারে তো রাষ্ট্র, বাংলাদেশ ব্যাংক সবসময় উদাসীন থাকে।

তিনি আরও বলেন, আমার অভিজ্ঞতা হলো, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বা এরপরে ভবিষ্যতে উপজেলা বা যাই হবে তখন বরং এই ছোট ছোট যারা ঋণ খেলাপি এক-দুই কোটি টাকা বাকি তাদের টাকা ব্যাংক কিছু আদায় করতে পারে। সেটা নির্বাচনের সময় এলে। কিন্তু ঋণের পুনঃতফসিলীকরণ করাটা একদিনে গড়ে ওঠেনি। এই সংস্কৃতি এরশাদের আমল থেকে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। মুক্তবাজার অর্থনীতির নাম করে ব্যাংকগুলোকে ঋণ খেলাপির জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সাইফুল আসলাম উজ্জ্বল জাগো নিউজকে বলেন, নির্বাচন শুরু হলে একটা আবেদন করে পার পাওয়ার পরে ওই অ্যাকশন আর হয় না। আদালতের আদেশে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরক্ষণে যদি দেখা যায় দল ক্ষমতায়, তখন ব্যাংকে চাপ দিয়ে, প্রভাবিত করে পুনঃতফসিল বা এই জায়গায় কিছু একটা করে। অনেকে আবার করেও না। তখন কারো বা কোনো ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানের সাহসে কুলায় না সরকারি দলের এমপির বিরুদ্ধে একটা রিট ফাইল করতে বা নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালে যেতে। কেননা নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালে গেলে তো আর এমপি থাকার যোগ্যতা থাকে না। নির্বাচনি ট্রাইব্যুনাল, তারপরে হাইকোর্টে যেতে হয়। এই লম্বা সময়ের মামলা শেষ হতে হতে দেখা যায় এমপির মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট জগলুল হায়দার আফ্রিক জাগো নিউজকে বলেন, খেলাপি ঋণ যদি পুনঃতফসিল করা না থাকে আদালতের স্থগিতাদেশের মাধ্যমে তা অনুমতি দেওয়া উচিত নয়। এমন কোনো প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ করা উচিত নয় নির্বাচন কমিশনের। কারণ তিনি তিন মাসের জন্য সংসদ সদস্য হতে আসছেন না। তিনি দায়িত্ব পালন করবেন ৫ বছর।

আরও পড়ুন:

ছবিসহ ঋণখেলাপিদের নামের তালিকা প্রকাশের প্রস্তাব ব্যাংকগুলোর 

অর্ধেকের বেশি খেলাপি ঋণ ১৭ ব্যাংকে, ছয়টির অবস্থা ভয়াবহ 

খেলাপি ঋণ ২৮৪৯৭৭ কোটি, ঝুঁকি বাড়ছে আর্থিক খাতে 

জগলুল হায়দার আফ্রিক বলেন, যদি খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল হয়ে থাকেন, খুব ভালো। কার দায় কে নেবে? পরবর্তী যে সরকার আসবে তিনি যদি ক্ষমতাসীন দলের এমপি হন তখন চাপ দিয়ে কাজ করবে। দেখা যাবে যে, নির্বাচিত ব্যক্তির দল সরকারে যাওয়ার পরে ওই ব্যাংকের ম্যাক্সিমাম শেয়ারহোল্ডার তিনি ও তার পরিবার পরিচালক হয়ে বসে আছেন। তার আত্মীয়স্বজন আসছেন অথবা দলের কেউ পরিচালক হয়ে থাকবেন। তখন আমি বললাম যে ভাই আমার তো ১০ কোটি টাকা ঋণ আছে, তুমি এখন ৫০ লাখ টাকা নাও, আমারে ঋণ পুনঃতফসিলের ব্যবস্থা করে দাও। এতে দেশের জন্য ক্ষতি, অর্থনীতির জন্য ক্ষতি, দেশের কল্যাণকর ও সুষ্ঠু রাজনীতির জন্যও ক্ষতি।

তিনি আরও বলেন, প্রতিটা রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে দেখবেন যে তারা বলে ঋণ খেলাপিদের উৎসাহিত করবে না। যদি উৎসাহিতই না করে তাহলে মনোনয়ন দেওয়ার আগেই তাদের যাচাই-বাছাই করে নিতে হবে যে কেউ খেলাপি ঋণগ্রহীতা আছে কি না। যদি থাকে, তাকে যদি দলের খুব প্রয়োজন হয়, তাহলে তাকে সময় দেওয়া হোক যে তুমি ঋণ পুনঃতফসিল করে এসে প্রমাণ দিতে পারলে মনোনয়ন পাবা নয়তো পাবা না।

ঋণ খেলাপিদের বিষয়ে কীভাবে সমাধান আসতে পারে

আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব বলেন, ঋণ খেলাপির বিরুদ্ধে শুধু নির্বাচনের সময় ঝাঁপাঝাঁপি করলে তো হবে না। ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে হবে। সামাজিক আন্দোলন করতে হবে এবং ব্যাংকগুলোরও ভূমিকা খুবই বিতর্কিত। ব্যাংকগুলোর বিষয়ে অভিজ্ঞতা হচ্ছে যদি আপনি ২০০ কোটি টাকা নেন তাহলে ব্যাংক আপনাকে হুজুর হুজুর করবে। আর আপনি যদি এক কোটি টাকা নেন ৫০ লাখ নেন তাহলে ব্যাংক আপনাকে চেপে ধরবে। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

‘ঋণ খেলাপিদের সংসদ সদস্য হওয়ার জন্য আগে ও পরে সুপ্রিম কোর্টের সুনিদির্ষ্ট কোর্ট থাকলেও সেই কোর্ট এই মামলাগুলো শুনানিতে গুরুত্ব দিচ্ছে না, আবার গুরুত্ব দিলেও পরবর্তীতে ওইসব মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে না’ উল্লখ করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ইমরান এ সিদ্দিক জাগো নিউজকে বলেন, সংসদ সদস্য হওয়ার আগে বা পরে ঋণ খেলাপিদের বিষয়ে সুরাহা করতে অগ্রাধিকার ভিত্তিত নির্দিষ্ট বেঞ্চে শুনানি হওয়া উচিত। তারা শুনানি করে নিষ্পত্তি করবেন, সেটা আবার আপিল বিভাগে গিয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি হলে একটা সুরাহা হবে।

তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, ‘দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আসন নিয়ে আমরা যখন মামলা করলাম, তো হাইকোর্টে হারলাম। পরে এটা আবার আপিল বিভাগে যেতে যেতে এটার (সংসদের ৫ বছরের) মেয়াদই শেষ হয়ে গেলো। এটা একটা বাস্তব কথা।’

ঋণ খেলাপিদের বিষয়ে আদালতের সিদ্ধান্ত জানতে চাইলে ইমরান এ সিদ্দিক বলেন, ‘যেদিন মনোনয়ন দাখিল করতে হবে, ওই দিন পর্যন্ত তিনি ঋণ খেলাপি থাকতে পারবেন না। কোর্ট এটা লিবারেলি মানে কোর্ট বলতে ইলেকশন কমিশন লিবারেলি দেখছে। হাইকোর্টও লিবারেলি দেখছে। কিন্তু এই বিষয়টা সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত আসেনি, সেটেলও নেই।’

রাজনৈতিক দলগুলো যা করতে পারে

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী জাগো নিউজকে বলেন, দলগুলোর দায়বদ্ধতা হলো আমি পার্টির চেয়ারম্যান হলে সংবাদপত্র ও টেলিভিশনে গণবিজ্ঞপ্তি দিতাম। সব সব ব্যাংকের উদ্দেশে বলতাম, বছর বা ছয় মাস আগে দলীয় নেতাদের মনোনয়ন দিয়েছি। আমার এই তিনশ বা আরও বেশি প্রার্থীর বিরুদ্ধে কারো কোনো ব্যাংকে খেলাপি ঋণ আছে কি না? কোনো ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে কি না? তাহলে প্রমাণসহ নিয়ে আসেন, আমি দেওয়ার ব্যবস্থা করবো। এরপর দলীয় নেতাদের সময় দিতাম যে তুমি ব্যাংক থেকে এনওসি আনো, অন্যথায় মনোনয়ন পাবে না। কারণ প্রতিটি আসনে পাঁচ থেকে সাতজন যোগ্য প্রার্থী ছিল। তাহলে আমার এই ঋণ খেলাপিকে মনোনয়ন দিতে হবে কেন? এখানে দলীয় প্রধান হিসেবে দায়বদ্ধতা আছে।

এফএইচ/এসএনআর/এমএমএআর/এমএস