ধর্ষণ মামলা দ্রুত নিষ্পত্তিতে হাইকোর্টের ৭ নির্দেশনা

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০৬:৩১ পিএম, ১৮ জুলাই ২০১৯
ধর্ষণ মামলা দ্রুত নিষ্পত্তিতে হাইকোর্টের ৭ নির্দেশনা

ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যা মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে নিম্ন (নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনাল) আদালতের বিচারক ও মামলাসংশ্লিষ্ট সবার প্রতি সাত নির্দেশনা দিয়েছেন হাইকোর্ট।

পৃথক তিনটি ধর্ষণের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার আসামিদের জামিন আবেদনের শুনানিতে সংবিধানের ১০৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আদালত এ নির্দেশনা দেন।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণ ও ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যা মামলা নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে শেষ করা, শুনানি শুরু হলে প্রতি কার্যদিবসে টানা মামলা পরিচালনা করা, মামলায় সাক্ষীর উপস্থিতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বিষয়ে সাত দফা নির্দেশনা দিয়েছেন হাইকোর্ট।

আদালতের এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আদেশের কপি স্বরাষ্ট্র সচিব, আইন সচিব, রেজিস্ট্রার জেনারেলকে পাঠাতে বলা হয়েছে।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে করা পৃথক তিনটি মামলায় আসামিদের জামিন আবেদনের শুনানির সময় আজ বৃহস্পতিবার হাইকোর্টের বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ সংবিধানের ১০৯ অনুচ্ছেদ অনুসারে এ আদেশ দেন।

পৃথক দুই মামলায় আসামি মো. রাহেল ওরফে রায়হান ও সেকান্দার আলীর জামিন নামঞ্জুর করেছেন হাইকোর্ট। তবে নারায়ণগঞ্জের শিশু ধর্ষণের অপর এক মামলায় সারওয়ার রুবেল ও এমরানের জামিন মঞ্জুর করে আদেশ দিয়েছেন আদালত।

আদালতে আজ জামিন আবেদনকারী চার আসামির পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী গোলাম আকতার জাকির, মারজিয়া জামান ও আবদুল্লাহ আল মাহবুব। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল হাসিনা মমতাজ ও শাহানা পারভীন।

হাইকোর্টের নির্দেশনাগুলো হলো

ক. দেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোতে বিচারাধীন ধর্ষণ এবং ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যা মামলাসমূহ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আইনের নির্ধারিত সময়সীমার (বিচারের জন্য মামলা পাপ্তির তারিখ থেকে ১৮০ দিন) মধ্যে যাতে বিচারকাজ সম্পন্ন করা যায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের সব ধরনের আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া যাচ্ছে।

খ. ট্রাইব্যুনালগুলোকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ এর ধারা ২০ এর বিধান অনুযায়ী মামলার শুনানি শুরু হলে তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি কর্মদিবসে একটানা মামলা পরিচালনা করতে হবে।

গ. ধার্য তারিখে সাক্ষীর উপস্থিতি ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রতি জেলায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন), সিভিল সার্জনের একজন প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটরের সমন্বয়ে একটি মনিটরিং কমিটি গঠন করতে হবে। ট্রাইব্যুনালে পাবলিক প্রসিকিউটর কমিটির সমন্বয়কের দায়িত্বে থাকবেন এবং কমিটির কার্যক্রম সম্পর্কে প্রতি মাসে সুপ্রিম কোর্ট; স্বরাষ্ট্র, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন প্রেরণ করবেন। যে সব জেলায় একাধিক ট্রাইব্যুনাল রয়েছে সে সব জেলায় সব ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটররা মনিটরিং কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হবেন এবং তাদের মধ্যে যিনি জ্যেষ্ঠ তিনি সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করবেন।

ঘ. ধার্য তারিখে রাষ্ট্রপক্ষ সংগত কারণ ছাড়া সাক্ষীকে আদালতে উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হলে মনিটরিং কমিটিকে জবাবদিহি করতে হবে।

চ. মনিটরিং কমিটি সাক্ষীদের ওপর দ্রুততম সময়ে যাতে সমন জারি করা যায় সে বিষয়েও মনিটরিং করবেন।

ছ. ধার‌্য তারিখে সমন পাওয়ার পরও অফিসিয়াল সাক্ষীরা, যেমন- ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, ডাক্তার বা অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা সন্তোষজনক কারণ ছাড়া সাক্ষ্য প্রদানে উপস্থিত না হলে, ট্রাইব্যুনাল ওইসব সাক্ষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ এবং প্রয়োজনে বেতন বন্ধের আদেশ প্রদান বিবেচনা করবেন।

জ. আদালতের সুচিন্তিত অভিমত এই যে, অবিলম্বে সাক্ষী সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন এবং আদালত এটাও প্রত্যাশা করছে যে, সরকার অতি স্বল্প সময়ে উক্ত বিষয়ে আইন প্রণয়ন করবে।

বগুড়া নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এ বিচারাধীন মামলার আসামি মো. রাহেল ওরফে রায়হান গত বছরের ২৮ জুন তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় বগুড়ার সারিয়াকান্দি থানায় মামলা করেন ছাত্রীর বাবা।

এ ঘটনায় তদন্ত শেষে পুলিশ ২ সেপ্টেম্বর অভিযোগপত্র জমা দেয়। ওই মামলায় এখন পর‌্যন্ত অভিযোগ গঠন না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালে জামিন চাইলে গত ১ জুলাই তার জামিন আবেদনটি খারিজ হয়। ওই আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট জামিন আবেদন করেন আসামি। আজ সেই আবেদন নামঞ্জুর করে দেন হাইকোর্ট।

অন্যদিকে, ২০১৭ সালের ১১ অক্টোবর নোয়াখালীর নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনালে একটি মামলা হয়। এই মামলায় আসামি সারোয়ার রুবেল ও এমরানকে গত বছরের ২৯ মে এক বছরের জন্য জামিন দেন আদালত। এই জামিনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নোয়াখালীর নারী শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৩ গত ৩ জুলাই তাদের কারাগারে পাঠান। এই আদেশের বিরুদ্ধে জামিন চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেন আসামি।

হাইকোর্ট আসামিদের জামিন মঞ্জুর করেছে বলে জানান তাদের আইনজীবী মার্জিয়া জামান।

অপর একটি মামলায় ২০ মার্চ ধর্ষিতার মা বাদী হয়ে ডেমরা থানায় মামলা করেন। এতে আসামি করা হয় সেকেন্দার আলীকে। এ মামলায় অভিযোগ গঠন পর্যায়ে রয়েছে। তবে, বিচারিক আদালতে ২৪ জুন তার জামিন আবেদন খারিজ করে দিলে এর বিরুদ্ধে হাইকোর্ট জামিন আবেদন করেন আসামি। ওই আবেদন খারিজ করা হয়েছে।

এফএইচ/এসআর/এমকেএইচ

সর্বশেষ - আইন-আদালত

জাগো নিউজে সর্বশেষ

জাগো নিউজে জনপ্রিয়