মানবতাবিরোধী অপরাধ
সাবেক এনএসআইপ্রধানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য সম্পন্ন
ফাইল ছবি
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালীন সংঘটিত হত্যা ও গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) মুহাম্মদ ওয়াহিদুল হকের (৭৩) বিরুদ্ধে মামলার তদন্ত কর্মকর্তার (আইও) সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য আগামী ৭ জুন দিন ঠিক করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী প্রসিকিউটর রেজিয়া সুলতানা চমন জাগো নিউজকে বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত মামলার তদন্ত কর্মকর্তাসহ (আইও) মোট ১৫ জন সাক্ষী জবানবন্দি পেশ করেছেন।
রোববার (১৪ মে) ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল বেঞ্চ সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য এ দিন ধার্য করেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন- বিচারপতি আবু আহমেদ জমাদার ও বিচারপতি কেএম হাফিজুল আলম।
এদিন ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের শুনানিতে ছিলেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সীমন, মোখলেসুর রহমান বাদল ও রেজিয়া সুলতানা চমন। আর আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী আবদুস সোবহান তরফদার ও সৈয়দ মিজানুর রহমান।
২০১৮ সালের ২৪ এপ্রিল আন্তর্জাতিক অপরাধ টাইব্যুনাল গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পর ওইদিনই দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রাজধানীর বারিধারার বাসা থেকে ওয়াহিদুল হককে গ্রেফতার করে পুলিশ। সেই থেকে তিনি কারাগারে।
সাবেক এ সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত সম্পন্ন করে ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর প্রসিকিউশনে দাখিল করে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। ২০১৯ সালের ৪ মার্চ তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল।
এরপর রাষ্ট্রপক্ষ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করে। পরে আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেন আদালত। ২০১৯ সালের ৮ জুন মামলায় অভিযোগ গঠনের (ফরমাল চার্জ) বিষয়ে শুনানি শুরু হয়ে একই বছরে ১৭ অক্টোবর বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।
প্রসিকিউশন সূত্র জানায়, ১৯৬৬ সালের অক্টোবরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন ওয়াহিদুল হক। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি রংপুর সেনানিবাসে ২৯ ক্যাভালরি রেজিমেন্টের অ্যাডজুট্যান্টের দায়িত্বে ছিলেন। একই বছরের ২৮ মার্চ বিকেলে ওয়াহিদুল হকের নেতৃত্বে চারটি সামরিক জিপে মেশিনগান লাগিয়ে গুলিবর্ষণ করে রংপুর সেনানিবাস সংলগ্ন এলাকায় ৫০০-৬০০ স্বাধীনতাকামী বাঙালিকে হত্যা, গণহত্যা ও অসংখ্য মানুষকে গুরুতর আহত করার পাশাপাশি তাদের বাড়িঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
জানা গেছে, স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে দেশে ফেরেন ওয়াহিদুল হক। পরে ১৯৭৬ সালে পুলিশে যোগ দেন তিনি। এরপর বিভিন্ন সময়ে পুলিশের উচ্চপদে থেকে ১৯৯৬ সালে তিনি এনএসআইয়ের ভারপ্রাপ্ত ডিজি ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের ডিজি হন। ২০০৫ সালে পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি হিসেবে অবসর নেন ওয়াহিদুল হক।
মামলা সূত্রে জানা গেছে, আসামি ওয়াহিদুল হকের গ্রামের বাড়ি মাদারীপুর জেলায়। ১৯৬৬ সালের ১৬ অক্টোবর তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন প্রাপ্ত হন। পরবর্তীতে বদলি সূত্রে ২৯ ক্যাভালরি রেজিমেন্টে যোগদান করেন তিনি। এরপর সেখান থেকে পাকিস্তানের মুলতান ক্যান্টনমেন্টে চলে আসেন। পরে ১৯৭০ সালের মার্চ মাসে ২৯ ক্যাভালরি রেজিমেন্ট রংপুর সেনানিবাসে স্থানান্তরিত হন। ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ পর্যন্ত এই রেজিমেন্টের অ্যাডজুট্যান্ট হিসেবে রংপুর সেনা নিবাসে কর্মরত ছিলেন। ১৯৭১ সালের এপ্রিলে বদলি হয়ে আবার তিনি পাকিস্তান (পশ্চিম পাকিস্তান) চলে যান। সেখানে তিনি ১৯৭৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত অবস্থান করেন। ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে তিনি দেশে ফিরে আসেন। সে সময় তাকে সেনাবাহিনী থেকে অবসর দেওয়া হয়।
১৯৭৬ সালের ১ অক্টোবর ওয়াহিদুল হক বাংলাদেশ পুলিশের এএসপি হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৭৭ সালে কুমিল্লার এএসপি হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। পরে ১৯৭৮ সালে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, ১৯৮২ সালে নোয়াখালী জেলার পুলিশ সুপার। পরে ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত ঢাকা মেট্রোপলিটনে অতিরিক্ত কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৮৮ সালে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনার হিসেবে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত এনএসআইয়ের পরিচালক ছিলেন। পরে একই সংস্থার ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক হিসেবে তিনি দায়িত্ব পান। ১৯৯৭ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত তিনি পাসপোর্ট অফিসের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০২ সালে তিনি পুনঃনিয়োগ পান। ২০০৫ সালে পুলিশের অতিরিক্ত আইজি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এফএইচ/এমকেআর/জেএমআই