সুস্থ মাতৃত্বের প্রথম ধাপ, গর্ভধারণের আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা
প্রতীকী ছবি, এআই দিয়ে বানানো, পাশে অধ্যাপক ডা. রেজাউল করিম কাজল
গর্ভধারণ একটি আনন্দের মুহূর্ত। কিন্তু এটি শুধু প্রস্তুতি নয়, বরং স্বাস্থ্যসচেতনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ও বটে। গর্ভধারণের আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা নারীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি মা ও শিশুর সুস্থতার নিশ্চয়তা দেয়। গর্ভধারণের আগে যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা উচিত সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়েছেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের অধ্যাপক ডা. রেজাউল করিম কাজল।
ডা. রেজাউল করিম কাজলের মতে, গর্ভধারণের আগে নারীর মাসিক চক্র এবং প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে জানা গুরুত্বপূর্ণ। যদি মাসিক চক্র অনিয়মিত হয় বা দীর্ঘদিন ধরে প্রজননজনিত সমস্যা থাকে, গর্ভধারণের আগে তা সমাধান করা জরুরি।
প্রজনন ও মাসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা
মাসিক চক্রের নিয়মিততা: অনিয়মিত মাসিক গর্ভধারণে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
ডিম্বাশয়ের কার্যকারিতা: আল্ট্রাসাউন্ড বা হরমোন পরীক্ষা ডিম্বাশয়ের কার্যকারিতা ও অ্যানড্রোমেটিক সমস্যা নির্ধারণে সাহায্য করে।
প্রজনন সংক্রান্ত রোগের পরীক্ষা: পেলভিক ইনফেকশন বা জরায়ুর সমস্যা থাকলে তা গর্ভধারণে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
হরমোন পরীক্ষা
থাইরয়েড ফাংশন পরীক্ষা: থাইরয়েড হরমোনের অস্বাভাবিকতা গর্ভধারণে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
প্রজনন হরমোনের পরীক্ষা: এফএসএইচ, এলএইচ, প্রোজেস্টেরন, এইসব হরমোনের মাত্রা ডিম্বাশয়ের কার্যকারিতা এবং গর্ভধারণের সম্ভাব্যতা নির্ধারণে সাহায্য করে।
ডা. কাজল জানান, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা অনেক সময় গর্ভধারণকে বিলম্বিত করে। তাই প্রয়োজনীয় পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ছবি: বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের অধ্যাপক ডা. রেজাউল করিম কাজল
সংক্রামক রোগ ও রক্ত পরীক্ষা
গর্ভধারণের আগে সংক্রামক রোগ পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।
এইচআইভি, হেপাটাইটিস বি ও সি, সিফিলিস: এই রোগগুলি মা থেকে শিশুর কাছে সংক্রমণ ঘটাতে পারে।
রক্তের সাধারণ পরীক্ষা: অ্যানিমিয়া, হিমোগ্লোবিন এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রক্ত উপাদান যাচাই করা।
রুবেলা ও টিটানাসের ভ্যাকসিনেশন চেক: এই ভাইরাসগুলো গর্ভকালীন শিশুর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
সাপ্লিমেন্ট ও পুষ্টি পরীক্ষা
গর্ভধারণের আগে পুষ্টি যাচাই এবং সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ জরুরি।
ফলিক অ্যাসিড: শুরুর দিক থেকেই নিয়মিত ফলিক অ্যাসিড গ্রহণের মাধ্যমে নিউরাল টিউব ত্রুটি প্রতিরোধ করা যায়।
আয়রন ও ক্যালসিয়াম: গর্ভকালীন অ্যানিমিয়া প্রতিরোধ এবং হাড়ের স্বাস্থ্য রক্ষা করতে গুরুত্বপূর্ণ।
ভিটামিন ডি পরীক্ষা: ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি মা ও শিশুর হাড়ের জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।
ডা. কাজল বলেন, ভাল পুষ্টি এবং সাপ্লিমেন্টের সঠিক ব্যবহার গর্ভকালীন জটিলতা কমাতে সাহায্য করে।
আরও পড়ুন:
- বিয়ের আগে যাদের জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল খেতে হয়
- বিয়ের অনেক বছর পার হলেও সন্তান হচ্ছে না?
- নিঃসন্তান দম্পতিদের চিকিৎসায় আইভিএফ, যা জানা জরুরি
অন্যান্য স্বাস্থ্য পরীক্ষা
উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস পরীক্ষা: গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিস মা ও শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
ওজন ও বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই) যাচাই: অত্যধিক বা অল্প ওজন গর্ভধারণ ও শিশুর স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করতে পারে।
হৃদরোগ ও কিডনি ফাংশন পরীক্ষা: দীর্ঘমেয়াদী রোগ থাকলে তা গর্ভধারণের পরিকল্পনায় বিবেচনা করা জরুরি।
মানসিক ও মানসিক চাপ যাচাই
গর্ভধারণ শুধুই শারীরিক প্রক্রিয়া নয়, মানসিক প্রস্তুতিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্ট্রেস ও ডিপ্রেশন স্ক্রিনিং: মানসিক চাপ কমাতে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সমর্থন।
পরিবারিক ও সামাজিক সমর্থন: সুস্থ মাতৃত্বের জন্য পরিবার ও সমাজের সহযোগিতা অপরিহার্য।
ডা. কাজল বলেন, শারীরিক স্বাস্থ্য ঠিক থাকলেও মানসিক চাপ থাকলে গর্ভধারণ এবং পরবর্তী মাতৃত্ব প্রক্রিয়ায় সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই মানসিক প্রস্তুতি নেওয়াও জরুরি।
তিনি আরও বলেন, গর্ভধারণের আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা শুধু সতর্কতার অংশ নয়, এটি সুস্থ মা ও শিশুর নিশ্চয়তা দেয়। প্রজনন স্বাস্থ্য, হরমোন, সংক্রামক রোগ, পুষ্টি, ও মানসিক প্রস্তুতির পরীক্ষা গর্ভধারণকে নিরাপদ ও সুস্থ করে তোলে। প্রতিটি নারীকে গর্ভধারণের আগে অন্তত একবার সম্পূর্ণ স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো উচিত, যাতে মাতৃত্ব অভিজ্ঞতা আনন্দদায়ক ও ঝুঁকিমুক্ত হয়।
জেএস/
