জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ
১৮ মাস পর ৮ জনের পরিচয় শনাক্ত, কবর দেখে আবেগাপ্লুত পরিবার
১৮ মাস পর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের কবর দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্যরা/ ছবি: জাগো নিউজ
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অনেক অজ্ঞাতপরিচয়ের মরদেহ দাফন করা হয়। পরিবারের সদস্যরা এতদিন জানতেন না নিহতদের কবর কোথায়। ১৮ মাস পর তাদের কবর দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। এসময় এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
২০২৪ সালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অজ্ঞাতপরিচয়ের শহীদদের মরদেহ উত্তোলন ও শনাক্তকরণ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এখন পর্যন্ত ৮ জনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর রায়েরবাজার কবরস্থান থেকে এ পর্যন্ত ১১৪ জনের অজ্ঞাতপরিচয়ের মরদেহ উত্তোলন, ময়নাতদন্ত ও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ সম্পন্ন করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে এবং আদালতের নির্দেশে পরিচালিত এই কার্যক্রমের মাধ্যমে ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের মাধ্যমে এরই মধ্যে ৯টি ভুক্তভোগী পরিবারের দেওয়া নমুনার ভিত্তিতে ৮ জন শহীদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। অবশিষ্ট একটি মরদেহের পরিচয় শনাক্তকরণ প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।
সোমবার (৫ জানুয়ারি) রাজধানীর রায়েরবাজার কবরস্থানে ‘অজ্ঞাতপরিচয়ের শহীদদের মরদেহ পরিচয় শনাক্তকরণ’ অনুষ্ঠানে সিআইডি প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. ছিবগাত উল্লাহ এসব তথ্য জানান।

আটটি পরিবারের কাছে কবর শনাক্তের পর বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এসময় পরিবারের সদস্যরা কান্নায় ভেঙে পড়েন।
মরদেহের পরিচয় শনাক্ত হলো যাদের—
ঢাকা মাদারটেকের শহীদ কাবিল হোসেন (৫৮), ঢাকার মোহাম্মদপুরের শহীদ সোহেল রানা (৩৮), শেরপুরের শহীদ আসাদুল্লাহ (৩১), ফেনীর শহীদ রফিকুল ইসলাম (২৯), ময়মনসিংহের শহীদ মাহিম (৩২), কুমিল্লার শহীদ ফয়সাল সরকার (২৬), পিরোজপুরের শহীদ রফিকুল ইসলাম (৫২) ও চাঁদপুরের শহীদ পারভেজ বেপারী (২৩)।

অনুষ্ঠানে মুক্তিযোদ্ধা উপদেষ্টা ফারুক ই আজম, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে গণঅভ্যুত্থানে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে শহীদ বহু ব্যক্তির মরদেহ অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফন করা হয়। পরবর্তীতে শহীদ পরিবারের দাবি ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে মরদেহ উত্তোলন ও শনাক্তকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

নিহতের পরিচয় শনাক্তে আন্তর্জাতিক মান ও বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ততা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই সংবেদনশীল কার্যক্রমের সার্বিক তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পায় সিআইডি। কার্যক্রমটির নেতৃত্বে ছিলেন সিআইডি প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি মো. ছিবগাত উল্লাহ।
জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের সহযোগিতায় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফরেনসিক অ্যানথ্রোপোলজিস্ট ও ফরেনসিক কনসালটেন্ট ড. লুইস ফনডেরিডার-এর প্রত্যক্ষ দিকনির্দেশনায় গত বছরের ৭ ডিসেম্বর থেকে মরদেহ উত্তোলন কার্যক্রম শুরু হয়।

এর আগে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি, যিনি বিচারবহির্ভূত ও নির্বিচার হত্যাকাণ্ড বিষয়ক স্পেশাল র্যাপোর্টিয়ার, তিনি বাংলাদেশে এসে সিআইডির ফরেনসিক, ডিএনএ ও মেডিকেল ফরেনসিক টিমকে দুই দিনব্যাপী বিশেষ প্রশিক্ষণ দেন।
মিনেসোটা প্রটোকল অনুসরণ মরদেহ উত্তোলন, ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ, প্রোফাইলিং এবং পুনঃসমাধিস্থকরণ—সমগ্র প্রক্রিয়াটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অনুসরণ করে সম্পন্ন করা হয়েছে। এই প্রটোকল সম্ভাব্য বিচারবহির্ভূত মৃত্যুর তদন্তে মানবাধিকার ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার আন্তর্জাতিক নির্দেশিকা হিসেবে স্বীকৃত।
রায়েরবাজার কবরস্থানে অস্থায়ী মর্গ স্থাপন করে গত ৭ ডিসেম্বর থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১১৪টি মরদেহ উত্তোলন ও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়।

সহযোগী সংস্থাসমূহ এই কার্যক্রমে সিআইডির পাশাপাশি ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি), ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি), ঢাকা জেলার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থা সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করে।
রায়েরবাজারে পরিচালিত এই বৃহৎ পরিসরের ফরেনসিক কার্যক্রম বাংলাদেশে মানবাধিকারভিত্তিক তদন্তের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এর মাধ্যমে শহীদ পরিবারের দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা দূর হয়েছে এবং ভবিষ্যৎ বিচারিক কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ফরেনসিক প্রমাণ সংরক্ষিত হয়েছে।
টিটি/এমআইএইচএস/জেআইএম