গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ!
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনে একই সঙ্গে হবে গণভোট/ প্রতীকী ছবি
শুধু একটি প্রশ্নের ওপর ভিত্তি করে দেশের ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা, নির্বাচন পদ্ধতি ও সংবিধান সংস্কারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সরকার।
‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আয়োজিত এই গণভোটকে সরকার বাংলাদেশের জন্য ‘১০০ বছরের রোডম্যাপ’ হিসেবে তুলে ধরলেও, একটিমাত্র প্রশ্নে চারটি বিশাল সংস্কার প্যাকেজ যুক্ত থাকায় ‘হ্যাঁ’ ভোট নিশ্চিত করাই এখন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা।
এক প্রশ্নে চার সিদ্ধান্ত
জনমতের জটিল সমীকরণ বলে মনে করা হচ্ছে। গণভোটে ভোটারদের সামনে একটিমাত্র প্রশ্ন রাখা হবে। প্রশ্নটি হলো ‘আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?’
এই একটিমাত্র উত্তরের (হ্যাঁ/না) ওপর নির্ভর করছে চারটি বড় সংস্কার প্যাকেজের ভবিষ্যৎ
১. নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান গঠনের নতুন প্রক্রিয়া।
২. ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ বিশিষ্ট দ্বিকক্ষ সংসদ ব্যবস্থা এবং সংবিধান সংশোধনে উচ্চকক্ষের বাধ্যতামূলক অনুমোদন।
৩. প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা নির্ধারণ (সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ), রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি এবং বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ।
৪. রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য অনুযায়ী জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার বাস্তবায়ন।
নির্বাচনি ডামাডোলে প্রচারণার ঘাটতি
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গেই এই গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি এরই মধ্যে তুঙ্গে; ৩০০ আসনে ২ হাজার ৫৬৮টি মনোনয়নপত্রের মধ্যে ১ হাজার ৮৪২টি বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। প্রার্থীরা দলীয় প্রচারণা শুরু করলেও, বিস্ময়করভাবে ‘জুলাই সনদ’ বা গণভোটের পক্ষে-বিপক্ষে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচারণা এখনও নগণ্য। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে এই জটিল সংস্কার প্রস্তাবগুলোর স্পষ্ট ধারণা পৌঁছানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকারের বহুমুখী প্রচারণা: মসজিদ থেকে সুপার ক্যারাভান
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানিয়েছেন, একসময় দেশে সাক্ষরতার হার কম থাকলেও বর্তমানে তা প্রায় ৮০ শতাংশে পৌঁছেছে। তিনি বলেন, যখন দেশের সাক্ষরতার হার কম ছিল তখন ও সাধারণ মানুষ গণভোটের ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করেনি। এবারও তারা ভুল করবে না।
৬ জানুয়ারি রাজধানীর বেইলি রোডের ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিং এ তিনি জানান, ‘হ্যাঁ’ ভোটের জনসমর্থন আদায়ে সরকার বহুমুখী প্রচার কৌশল গ্রহণ করেছে। ৯ জানুয়ারি থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত ‘ভোটের গাড়ি’ বা ৩০টি সুপার ক্যারাভান দেশের ৪৯৫টি উপজেলায় টিভিসি প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রচারণা চালাবে। এমনকি ভোলা বা হাতিয়ার মতো দুর্গম দ্বীপগুলোকেও এর আওতায় আনা হয়েছে।
ধর্মীয় নেটওয়ার্ক: দেশের ৪ লাখ মসজিদ, মন্দির ও গির্জার মাধ্যমে ইমাম ও ধর্মীয় নেতাদের এই প্রচারণায় সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এরই মধ্যে প্রায় ৫০০ জন আলেমের সঙ্গে বৈঠক করেছে ধর্ম মন্ত্রণালয়।
মক্তব ও লিফলেট: সারাদেশে প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ের ৭৭ হাজার মক্তবের শিক্ষকদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজে লাগানো হচ্ছে এবং হাজার হাজার লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে। হ্যাঁ ভোটের ব্যাপারে জনসচেতনতা সৃষ্টি ও প্রচার প্রচারণায় গণমাধ্যম কর্মীদের বেশি বেশি প্রতিবেদন প্রণয়নের পরামর্শ দেন প্রেস সচিব।
অগ্নিপরীক্ষা ও ভবিষ্যৎ
সরকার মনে করে, এই গণভোটের রায় কেবল একটি কর্মসূচি নয়, বরং আগামী দশকগুলোর রাষ্ট্রচিন্তাকে নির্ধারণ করবে। তবে সাধারণ মানুষের মতে, এতগুলো সংবেদনশীল ও কারিগরি বিষয়কে একটিমাত্র প্রশ্নে সীমাবদ্ধ করা প্রশাসনিক ও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ১২ ফেব্রুয়ারির ব্যালট পেপারে জনগণের রায়ই বলে দেবে— বাংলাদেশ কি জুলাই সনদের ‘১০০ বছরের রোডম্যাপে’ প্রবেশ করবে, নাকি নতুন কোনো সাংবিধানিক বিতর্কের মুখে পড়বে। এই পরীক্ষায় জনগণের রায়ই হবে চূড়ান্ত।
এমইউ/এমআরএম