আতঙ্কের নাম ‘ডিপফেক’, প্রযুক্তির ফাঁদে বেশি ফাঁসছেন নারী
এআই মোটিভ ব্যবহার করে তৈরি গ্রাফিক্স/জাগো নিউজ
দশ মাস আগে সুলতানা পারভীনের জীবনে এসেছিল আনন্দের নতুন এক ভোর। লালমনিরহাটের আদিতমারীর সেই সাধারণ মেয়েটি বিয়ে করেছিলেন জাপান প্রবাসী এক যুবককে। স্বপ্ন ছিল- কয়েক মাস পর প্রিয় স্বামীর সঙ্গে দেখা হবে, নতুন দেশে গিয়ে গড়বেন সুখের সংসার।
পরিবার, বন্ধু, প্রতিবেশী সবাই তখন তার চোখেমুখে দেখেছিল আলোর ঝিলিক, ভবিষ্যৎ স্বপ্নের বিভোরতা। কিন্তু বুকভরা স্বপ্নের সেই আলো নিভে যায় অচেনা এক অন্ধকারে। হঠাৎ ঝড়ে তাসের ঘরের মতো মুহূর্তে তছনছ হয়ে যায় জীবন।
সুলতানার সেই স্বপ্নভঙ্গের নেপথ্যে ছিল প্রযুক্তির আশীর্বাদের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অজানা অভিশাপ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি করা ভয়ঙ্কর একটি ভুয়া ভিডিও মুহূর্তেই তার জীবনে নিয়ে আসে ঘোর অমানিশা। এরপর সমাজের তিরস্কার, অবিশ্বাসের দৃষ্টি, মানহানির ভয়—সব প্রতিকূলতা ঘিরে ধরে তাকে। নিঃশেষ হয়ে যায় হৃদয়ের সব সাহস।
তখনো লড়াই থামাননি সুলতানা। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টাও হয়তো করেছেন বারবার। কিন্তু প্রযুক্তির নির্মম খেলায় জীবনের কাছে হার মানতে হয় তাকে। গত বছরের ৬ এপ্রিল বাবার বাড়িতে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে বেছে নেন আত্মহননের পথ। জীবনের সব কলুষ থেকে মুক্তি পেতে চিরবিদায় নেন নিষ্ঠুর পৃথিবী থেকে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একটি ভুয়া ফেসবুক আইডি থেকে সুলতানার স্বামী অনিকের পর্তুগাল প্রবাসী বোন জামাই মৃদুল আপত্তিকর ভিডিও ছড়িয়ে দেন। ভিডিওটি প্রথমে সুলতানাকে, পরে অনিককে পাঠানো হয়। এই ভিডিওর রেশ ধরে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে শুরু হয় ভুল বোঝাবুঝি। সুলতানার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন অনিক। এমনকি ডির্ভোস দেবেন বলেও হুমকি দেন। পরবর্তীসময়ে জানা যায়- ওই ভিডিওটি ছিল ভুয়া, এআই দিয়ে তৈরি।
ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা নীলা (ছদ্মনাম) এক সকালে অফিসে যাওয়ার আগে হঠাৎই একটি অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ পান—‘তোমার ভিডিওটি ভাইরাল হয়ে গেছে!’ কৌতূহল নিয়ে লিংকে ক্লিক করতেই নীলার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। সেটি ছিল মূলত একটি পর্নোগ্রাফিক ভিডিও, যেখানে তার মুখ জুড়ে দেওয়া হয়েছে অন্য এক নারীর দেহের সঙ্গে। পরে জানা যায়, ভিডিওটি ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা।
জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলার সময় থরথর করে কাঁপছিল নীলার কণ্ঠ। জীবনের এ রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে কাঁপা গলায় তিনি বলছিলেন, ‘আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। আমাকে নিয়ে সবাই কথা বলছিল। অথচ আমি কিছুই করিনি। এসবের কিছুই জানি না।’
আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার ভালো কাজের পাশাপাশি নেতিবাচক কাজেও দিন দিন বাড়ছে। বিশেষত সামাজিক মাধ্যমে বিভ্রান্তি, অপতথ্য ও গুজব ছড়ানোর অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠেছে এআই। এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভুয়া ভিডিও তৈরি করা হচ্ছে অহরহ, যা ‘ডিপফেক’ ভিডিও নামে পরিচিত।
৯০ শতাংশ অনলাইন সহিংসতার ক্ষেত্রে কোনো অভিযোগ করা হয় না। আইনি সহায়তার অভাবে ২৫ শতাংশ, হয়রানির ভয়ে ২৩ শতাংশ এবং সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার ভয়ে ১৭ শতাংশ ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন না।—গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য
এসব ভিডিওতে নির্দিষ্ট ব্যক্তির অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নড়াচড়া করার পাশাপাশি কণ্ঠস্বর ব্যবহার করায় অনেকেই বুঝতে পারেন না এগুলো ফেক বা ভুয়া ভিডিও। ফলে বিভ্রান্তি তৈরির পাশাপাশি মারাত্মক প্রতারণার ঘটনাও ঘটছে। এসব ভুয়া ছবি ও ভিডিও কনটেন্ট সহজেই বিশ্বাস করে সামাজিক মাধ্যমে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করছে প্রযুক্তি সম্পর্কে কম জানা ব্যবহারকারীরা। এতে সামাজিক মাধ্যমে বাড়ছে অস্থিরতা। অনেকের ব্যক্তিজীবনে ধেয়ে আসছে অশান্তির কালো ঢেউ।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, ডিপফেক হচ্ছে এমন এক ধরনের এআই প্রযুক্তি, যা ‘ডিপ লার্নিং’ অ্যালগরিদম ব্যবহার করে কারও মুখ, কণ্ঠ বা অঙ্গভঙ্গি অন্য ভিডিওর সঙ্গে নিখুঁতভাবে মিলিয়ে দিতে পারে। মাত্র কয়েকটি সহজ মোবাইল অ্যাপ দিয়েই এটি করা সম্ভব।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আগে যেখানে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে বিশাল কম্পিউটার আর প্রোগ্রামার দরকার হতো, এখন সেখানে একজন সাধারণ ব্যবহারকারীও ফ্রি অ্যাপ দিয়ে মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে ভুয়া ভিডিও বানাতে পারেন।
আরও পড়ুন
নারী সমন্বয়কদের নিয়ে অপতথ্যের জাল, শীর্ষে ফারজানা সিঁথি
ভিডিও-র মতো ‘ডিপফেক অডিও’ প্রতারণার নতুন ফাঁদ
নারীদের ডিপফেক থেকে সুরক্ষিত থাকার ৫ উপায়
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, সাইবার অপরাধ দমন ইউনিট এ বিষয়ে কঠোর নজরদারি চালাচ্ছে। অপরাধীদের শনাক্ত করতে ডিপফেক শনাক্তকরণ সফটওয়্যার ও ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণ ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে প্রযুক্তির দ্রুত উন্নয়নের কারণে অপরাধীদের ধরাও দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে।
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, ডিপফেক অপরাধের বিরুদ্ধে শক্তিশালী আইন, সামাজিক সচেতনতা ও প্রযুক্তি শিক্ষার অভাবই এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। তারা মনে করেন, ভুক্তভোগী নারীদের জন্য নিরাপদ অভিযোগ ব্যবস্থা ও মানসিক সহায়তা সেবা নিশ্চিত করা জরুরি।
পুলিশ সদরদপ্তর পরিচালিত পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেনের (পিসিএসডব্লিউ) তথ্য অনুসারে, ২০২৪ সালে তারা ৯ হাজার ১১৭টি হয়রানির অভিযোগ পেয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৭১৫, ফেব্রুয়ারিতে ৬৫৩, মার্চে ৭২৩, এপ্রিলে ৭৩০, মে মাসে ৭৭৩, জুনে ৮৪২, জুলাইয়ে ৭১০, আগস্টে ৬৩০, সেপ্টেম্বরে ৯৭৯, অক্টোবরে ৮৮১, নভেম্বরে ৭১৪ ও ডিসেম্বরে পাওয়া অভিযোগের সংখ্যা ছিল ৭৬৭টি।
আন্দোলনে অংশ নেওয়া নারী অ্যাক্টিভিস্টদের মধ্যে অন্তত আটজনকে জড়িয়ে চলতি বছর ৩২টি অপতথ্য প্রচারের প্রমাণ পেয়েছে রিউমর স্ক্যানার। এর মধ্যে জুলাই আন্দোলনকারী ফারজানা সিথিকে জড়িয়েই ছড়িয়েছে ১৫টি ভুয়া ভিডিও
পিসিএসডব্লিউর প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০ সালের ১৬ নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ৪২ হাজার ৬৪২টি অভিযোগ পাওয়া গেছে। যার মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ অভিযোগকারীই পরবর্তীসময়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য দেওয়া ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
গত বছরের নভেম্বরে ঝিনাইদহের কলেজপড়ুয়া এক মেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে বন্ধু হওয়ার অনুরোধ পেয়ে তা গ্রহণ করেন। অ্যাকাউন্টটি মেয়ের নামে হলেও কিছুক্ষণ আলাপচারিতায় (চ্যাট) মেয়েটি বুঝতে পারেন, এটি আসলে কোনো ছেলের অ্যাকাউন্ট। একপর্যায়ে মেয়েটির ছবির মুখাবয়ব নিয়ে নগ্ন ভিডিও বানিয়ে তাকে পাঠিয়ে হয়রানি করা শুরু হয়।
গত বছরের ৮ জানুয়ারি থেকে সপ্তাহজুড়ে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলায় ৮ স্কুলছাত্রীসহ ১৩ জনের ছবি দিয়ে পর্নো ভিডিও তৈরি করে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর কাছে টাকা দাবি করা হয়। ওই ঘটনায় একজন ভুক্তভোগীর মা বলেন, তার বড় মেয়ের (১৬) মুখাবয়ব ব্যবহার করে পর্নো ভিডিও তৈরি করে ২০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা না পেয়ে পরে তার ও তার ছোট মেয়ের (১১) ভুয়া পর্নো ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হয় গ্রুপে।
ঝিনাইদহ ও টাঙ্গাইলের দুটি ঘটনার ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা স্থানীয় থানা ও পিসিএসডব্লিউতে অভিযোগ করেন। প্রথম ঘটনাটির ক্ষেত্রে প্রতিবেশী এক তরুণ এবং দ্বিতীয় ঘটনায় সমবয়সী কিশোরী সহপাঠীকে অভিযুক্ত হিসেবে শনাক্ত করে পিসিএসডব্লিউ। স্থানীয় থানা পুলিশ অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আটক করে।
অপরাধীরা কারা
অনুসন্ধানে জানা যায়, বেশ কিছু ডিপফেক ভিডিও তৈরি হচ্ছে বিদেশে হোস্ট করা ওয়েবসাইট ও এনক্রিপ্টেড টেলিগ্রাম গ্রুপ থেকে। অনেক সময় প্রতিশোধ, সাবেক প্রেমিক, সম্পর্ক ভাঙা বা সাইবার চাঁদাবাজির জন্য ব্যবহার করা হয় এ প্রযুক্তি।
সাইবার ক্রাইম তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, অপরাধীরা ভিপিএন ব্যবহার করে নিজেদের পরিচয় গোপন রাখছে। ফলে তাদের শনাক্ত করতে আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন হয়।
‘সাইবার সহিংসতার শিকার নারীদের মনো-সামাজিক পরিবর্তন এবং বাংলাদেশে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার মূল্যায়ন’ শিরোনামের এক পিএইচডি গবেষণায় বলা হয়েছে, সাবেক প্রেমিকের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি সাইবার সহিংসতার শিকার হয়েছেন মেয়েরা। এ হার প্রায় ৩৩ শতাংশ। অনলাইন বন্ধুর মাধ্যমে ২০ শতাংশ, অপরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে ১৬ শতাংশ, সাবেক স্বামীর মাধ্যমে ১২ শতাংশ, বন্ধুর মাধ্যমে ৮ শতাংশ, সহকর্মী ও সহপাঠীর মাধ্যমে ৬ শতাংশ এবং স্বজনদের মাধ্যমে ৪ শতাংশ সহিংসতার শিকার হয়েছেন।
ভুক্তভোগীদের প্রায় ৯০ শতাংশই শহরের বাসিন্দা। ভুক্তভোগীদের মধ্যে প্রায় ৩৭ শতাংশ শিক্ষার্থী, প্রায় ২৯ শতাংশ সরকারি ও ২০ শতাংশ বেসরকারি চাকরিজীবী এবং ১২ শতাংশ গৃহিণী।
এআই ব্যবহার করে ভুয়া ছবি ও ভিডিও তৈরি করে ব্ল্যাকমেইল এবং যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। এ ধরনের অপরাধ শুধু নারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, সাম্প্রতিক সময়ে পুরুষরাও এর শিকার হচ্ছেন।—অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক ওমর ফারুক
এই গবেষণাটির সময়কাল ছিল ২০২১-২২ সাল। এটি প্রকাশিত হয় গত বছরের নভেম্বরে। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান ও পুলিশবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুকের তত্ত্বাবধানে গবেষণাটি করেন একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রোকসানা সিদ্দীকা।
ওই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ৯০ শতাংশ অনলাইন সহিংসতার ক্ষেত্রে কোনো অভিযোগ করা হয় না। আইনি সহায়তার অভাবে ২৫ শতাংশ, হয়রানির ভয়ে ২৩ শতাংশ এবং সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার ভয়ে ১৭ শতাংশ ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন না। বিচার পর্যালোচনার জন্য পুলিশের কাছে নথিভুক্ত ১ হাজার ১৮৯টি মামলার মধ্য থেকে ১৪৭টি মামলা নেওয়া হয়। ২০১৩ সালের ২৮ জুলাই থেকে ২০১৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনালের ৫২০টি মামলা পর্যালোচনা করে দেখা যায় ৩২৮টিই ঝরে পড়েছে।
গবেষণায় অংশগ্রহণকারী ১৪৭ জনের মধ্যে ৬১ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) বা মামলা করেছেন। এর মধ্যে ৬২ শতাংশ জানিয়েছেন, তাদের করা মামলায় অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ৬৭ শতাংশ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, সাইবার অপরাধের তদন্ত জটিলতা, প্রমাণ সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়া, কার্যকর ও সক্ষমতার সঙ্গে বিচারপ্রক্রিয়া না হওয়ার কারণে আসামির সাজা হয়নি।
ভুক্তভোগীদের নীরবতা
অনেক নারী এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা গোপন রাখেন, কারণ সামাজিকভাবে অপমানের ভয় তাদের আরও নিস্তব্ধ করে দেয়। ভুক্তভোগী নীলা বলেন, ‘আমি পুলিশের কাছে যাইনি। সবাই যদি ভাবে এটা সত্যি, তখন আমি বাঁচবো কেমন করে?’
রিউমর স্ক্যানার বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট চেকিং নেটওয়ার্ক স্বীকৃত বাংলাদেশের একটি ফ্যাক্ট চেকিং বা তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান। রিউমর স্ক্যানারের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে ৯ মাসে যত গুজব শনাক্ত হয়েছে তার অন্তত ২১ শতাংশ নারীদের ঘিরে। এসময়ের মধ্যে অন্তত ২৭৬ জন নারীকে জড়িয়ে ৫৬৭টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার।
প্রতিষ্ঠানটি বলছে, এসব অপতথ্যের শিকার হয়েছেন রাজনীতি, বিনোদন, জাতীয়সহ বিভিন্ন অঙ্গনের পরিচিত ব্যক্তিরা। এমনকি সাধারণ অনেক নারীও নিয়মিত এমন অপতথ্যের শিকার হচ্ছেন।
নারী অ্যাক্টিভিস্টদের জড়িয়ে ক্রমাগত অপপ্রচার
রিউমর স্ক্যানার দাবি করেছে, জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের সময় আলোচিত এক নাম হয়ে ওঠেছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। কোটা আন্দোলন থেকে সরকার পতনের সময়টায় সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে এ সংগঠন। সংগঠনটিকে জড়িয়ে পরবর্তীসময়ে নিয়মিতই ভুয়া তথ্যের প্রচার লক্ষ্য করা যায়।

এ আন্দোলনে অংশ নেওয়া নারী অ্যাক্টিভিস্টদের মধ্যে অন্তত আটজনকে জড়িয়ে চলতি বছর ৩২টি অপতথ্য প্রচারের প্রমাণ পেয়েছে রিউমর স্ক্যানার। এর মধ্যে জুলাই আন্দোলনকারী ফারজানা সিথিকে জড়িয়েই ছড়িয়েছে ১৫টি ভুয়া ভিডিও। এগুলোর একটি ছাড়া বাকিগুলো ছিল এআই এবং ডিপফেক পদ্ধতির ব্যবহারে তৈরি ভিডিও ফুটেজ। প্ল্যাটফর্মটির সাবেক কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক উমামা ফাতেমাকে জড়িয়ে অন্তত সাতটি অপতথ্য ছড়িয়েছে।
এছাড়া, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও জুলাই আন্দোলনকারী নাফসিন মেহনাজকে জড়িয়ে পাঁচটি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার, যার মধ্যে তিনটিতেই ছিল নাফসিনের আপত্তিকর দৃশ্যের ছবি। এর বাইরে সামিয়া মাসুদ মম, তিলোত্তমা ইতি, সাবরিনা আফরোজ সেবন্তি, এথিনা তাবাসসুম মীম ও আনিকা তাসনিমকে জড়িয়ে একটি করে অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে।
আরও পড়ুন
‘ডিপফেক’ এআইয়ের আরেক ফাঁদ, রক্ষা পাবেন যেভাবে
প্রযুক্তি বিশ্বে আলোচিত যেসব বিষয় বাংলাদেশেও প্রভাব ফেলেছে
আসল ও এআইয়ের বানানো ছবির পার্থক্য বুঝবেন যেভাবে
ডিপফেক ভিডিও এড়ানোর অনুরোধ সরকারের
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের আরও সতর্ক থাকা এবং জুয়াড়িদের তৈরি এআই জেনারেটেড ডিপফেক ভিডিও দ্বারা প্রতারিত না হতে অনুরোধ জানিয়েছে।
এআই দিয়ে বর্তমান সরকারে থাকা উপদেষ্টাদেরও ছবি-ভিডিও বিকৃত করে ছাড়া হচ্ছে। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে।—আইনজীবী ফাওজিয়া করিম ফিরোজ
এক বিবৃতিতে প্রেস উইং বলেছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় বাংলাদেশি ব্যবহারকারীদের লক্ষ্য করে জুয়ার বিজ্ঞাপন নতুন নয়, তবে এটি একটি বিরক্তিকর মোড় নিয়েছে। এখন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিশাল জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে জুয়াড়িরা তাদের সাইটে জনসাধারণকে আকৃষ্ট করতে সংবাদ প্রতিবেদন এবং ভুয়া বিবৃতি অনুকরণ করতে এআই জেনারেটেড ডিপফেক ভিডিও তৈরি করছে।
অশ্লীল বার্তা পাঠালে কারাদণ্ড, আছে জরিমানাও
মোবাইল ফোনে অশ্লীল, আপত্তিকর বা অশোভন বার্তা পাঠালে দুই বছরের কারাদণ্ড বা দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। এছাড়া কাউকে বারবার ফোন করে বিরক্ত করলেও এক লাখ টাকা জরিমানা বা অনাদায়ে ছয় মাসের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এই নিয়মগুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ‘বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ খসড়ায়।
গত বছরের ৬ নভেম্বর ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ অধ্যাদেশের খসড়া প্রকাশ করেছে। খসড়ার ধারা ৬৯ অনুযায়ী, টেলিযোগাযোগ বা বেতার যন্ত্রের মাধ্যমে অশ্লীল, ভীতিকর, অপমানজনক বা অশোভন কোনো বার্তা, ছবি বা ভিডিও পাঠালে দুই বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ দেড় কোটি টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হবে। গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘ডিবির সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টার ও সিটিটিসির সাইবার ইউনিট রয়েছে। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। যে কেউ স্বাচ্ছন্দ্যে অভিযোগ দিতে পারেন। পুলিশ এ ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জাগো নিউজকে বলেন, ‘ভুক্তভোগীদের প্রতি অনুরোধ—সাইবার জগতে কেউ হয়রানির শিকার হলে অবশ্যই আপনারা পুলিশের কাছে অভিযোগ জানাবেন। অভিযোগ না পেলে পুলিশের পক্ষে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না।’
তিনি বলেন, ‘যদি থানায় অভিযোগ জানাতে না চান তবে পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেনে (পিসিএসডব্লিউ) অভিযোগ জানাবেন। পিসিএসডব্লিউতে ভুক্তভোগী নারীদের সেবায় নারী পুলিশ সদস্যরা সার্বক্ষণিক দায়িত্বে রয়েছেন।’
কাউন্টার এআই প্রস্তুতি প্রয়োজন
অপরাধ বিশ্লেষক এবং টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুক জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রযুক্তির অপব্যবহার বর্তমানে সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তির ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।’
তিনি বলেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ভুয়া ছবি ও ভিডিও তৈরি করে ব্ল্যাকমেইল এবং যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। এ ধরনের অপরাধ শুধু নারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, সাম্প্রতিক সময়ে পুরুষরাও এর শিকার হচ্ছেন।’
‘সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এআই একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যে ধরনের কাউন্টার এআই বা প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি প্রয়োজন, তা এখনো পর্যাপ্ত নয়। ফলে এ ধরনের অপরাধ ক্রমেই বাড়ছে।’
পুলিশের সাইবার ইউনিটের কার্যক্রম সীমিত পরিসরে পরিচালিত হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠনের ওপর জোর দেন। তা না হলে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভুক্তভোগীর সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
অধ্যাপক ওমর ফারুকের ভাষ্য, ভয় বা সামাজিক লজ্জার কারণে অনেক ভুক্তভোগী পুলিশের কাছে অভিযোগ জানাতে যান না। অথচ এসব ঘটনায় যত দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেওয়া যাবে, তত দ্রুত অপরাধীদের দৌরাত্ম্য কমানো সম্ভব হবে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী ফাওজিয়া করিম ফিরোজ জাগো নিউজকে বলেন, ‘সচেতনতার অভাব রয়েছে। মনিটরিংয়ে টেকনোলোজির উন্নতি প্রয়োজন। এআই দিয়ে বর্তমান সরকারে থাকা উপদেষ্টাদেরও ছবি-ভিডিও বিকৃত করে ছাড়া হচ্ছে। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে। যারা ভুক্তভোগী তাদেরও উচিত সময়মতো আইনের দ্বারস্থ হওয়া।’
টিটি/এমকেআর/এএসএ/এমএফএ/এমএস