বিদায়বেলায়ও ‘বিতর্কিত’ সিদ্ধান্ত প্রশাসনে
দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় দেড় বছর হয়ে গেছে অন্তর্বর্তী সরকারের। এ সময়ে নানান সিদ্ধান্ত নিয়েছে নতুন প্রশাসন। এর মধ্যে অনেক সিদ্ধান্তই ছিল আলোচিত-সমালোচিত। মেয়াদের শেষ সময়ে এসেও সেই ধারাবাহিকতা অব্যাহত আছে। বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে প্রশাসনের সিদ্ধান্ত।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। সেই হিসাবে এ সরকারের হাতে সময় আছে আর ১৫ দিনের মতো। এ মাসেই দেশের আট উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) বদলি করা হয়। বদলির দুদিন পরই আবার বাতিলও করা হয় সে আদেশ। শেষ সময়ে এসে এ সিদ্ধান্তটি সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
এছাড়া অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতির তোড়জোড় চলছে। কারও কারও কাছে এটি রুটিন কাজ হলেও ভোটের এত কাছাকাছি এসেও এত বড় পদোন্নতির বিষয়টি ভালো চোখে দেখছেন না অনেকে। কোনো কোনো সাবেক আমলা বলছেন, পুরো সময়েই বর্তমান প্রশাসন নিজেদের অদক্ষতার প্রমাণ রেখেছে। পদোন্নতির ক্ষেত্রে আইনগত কোনো বিধি-নিষেধ না থাকলেও অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো পরিস্থিতি এড়াতে সরকারের উচিত এ মুহূর্তে এ ধরনের সিদ্ধান্ত না নেওয়া। নির্বাচনটা কীভাবে নির্বিঘ্নে উতরে যেতে পারে, সেদিকে তাদের মনোযোগী থাকা উচিত।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে থাকা গত সরকারের আস্থাভাজন কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়। কাউকে কাউকে চাকরি থেকে বিদায় করে দেওয়া হয়, কেউ কেউ হয়েছেন বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি)।
ইউএনওদের বদলির আদেশ জারি হওয়ার পর হয়তো তাদের কাছে মনে হয়েছে, এক্ষেত্রে ঘাটতি আছে। তাই তারা বদলির আদেশটি বাতিল করেছেন। পরবর্তীসময়ে বদলির আদেশ বাতিল করার কাজটি সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য।-সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার
বিগত সরকারের সময়ে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি, ভালো ও গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বদলি-পদায়ন করা হয়। অনেক অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে ফেরানো হয় চাকরিতে। এসব করতে গিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়।
সিদ্ধান্ত গ্রহণের ত্রুটির কারণে অনেক বিতর্কিত কর্মকর্তা পদোন্নতি ও ভালো পদায়ন পান। অনেক যোগ্য ও বঞ্চিত কর্মকর্তা পদোন্নতি, গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন পাননি বলেও অভিযোগ ওঠে। এটি প্রশাসনে বিশৃঙ্খলার জন্ম দেয়। নজিরবিহীনভাবে কর্মকর্তাদের বিক্ষোভ হয় সচিবালয়ে। ডিসি পদে যতবার বড় আকারে রদবদল আনা হয়েছে, ততবারই বিতর্ক তৈরি হয়েছে। যদিও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ত্রুটি ধরা পড়ার পর তা সংশোধনের চেষ্টাও ছিল সরকারের।
আরও পড়ুন
তফসিলের পর যেভাবে চলছে প্রশাসন
পে-স্কেল বাস্তবায়ন না হলে জানুয়ারিতে প্রশাসনে আন্দোলনের শঙ্কা
পিছু ছাড়ছে না ডিসি নিয়োগে বিতর্ক
সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে কতটা প্রস্তুত প্রশাসন
একই সঙ্গে প্রশাসনে স্থিতিশীলতা আনতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ঘাটতি দেখা গেছে অন্তর্বর্তী সরকারের। তাই ত্রুটিপূর্ণ ও বিলম্ব সিদ্ধান্তে অস্থিরতায় টালমাটাল ছিল প্রশাসন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাজ-কর্মে নেমেছে স্থবিরতা।
তবে সাবেক আমলা ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান প্রশাসন পুরো সময়ে দুর্বলতার পরিচয় দিয়েছে। তবে এসব সিদ্ধান্তের পেছনে যে খারাপ উদ্দেশ্য ছিল তা নয়। চেষ্টার ঘাটতি না থাকলেও মূলত তাদের অযোগ্যতা ও অদক্ষতার কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক চাপ ও কর্মকর্তাদের অনৈতিক আন্দোলনের কারণে এ প্রশাসনকে অনেক সিদ্ধান্ত নিয়ে আবার পরক্ষণেই সরে আসতে হয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিয়েছে ভুল সিদ্ধান্ত।
ইউএনও বদলি, পরক্ষণে বাতিল নিয়ে বিতর্ক
সবশেষ গত ২০ জানুয়ারি আট উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) বদলি করে প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। ভোলার চরফ্যাশন, চুয়াডাঙ্গার জীবননগর, ফরিদপুরের নগরকান্দা, পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া, বগুড়ার ধুনট, হবিগঞ্জের বাহুবল, নেত্রকোনার কমলাকান্দা ও বরগুনা জেলার পাথরঘাটা উপজেলার ইউএনওকে বদলি করা হয়। নির্বাচন কমিশনের সম্মতির পরিপ্রেক্ষিতে এ রদবদল করা হয়েছে বলে প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়।
নিরপেক্ষভাবে যদি সরকার পদোন্নতি দেয়, তবে এটি দোষের বিষয় নয়। যারা যোগ্য তারা পদোন্নতি পাবেন, পদোন্নতির সময় হলো তো আবার না দিলে বঞ্চিত করা হয়। তবে যদি কোনো উদ্দেশ্যে পদোন্নতি দেওয়া হয়, তবে তো সেটা সব সময়ের জন্যই খারাপ।-সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়া
বদলি করা এ কর্মকর্তাদের ২২ জানুয়ারির মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগদান করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যোগদান না করলে ওই তারিখের অপরাহ্নে বর্তমান কর্মস্থল থেকে তাৎক্ষণিক অবমুক্ত (স্ট্যান্ড রিলিজ) বলে গণ্য হবেন বলেও আদেশে উল্লেখ করা হয়।
এরপর ২২ জানুয়ারি আরেক প্রজ্ঞাপনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় জানায়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ২০ জানুয়ারি জারি করা আটজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বদলির আদেশ বাতিল করা হলো।
জানা যায়, একটি রাজনৈতিক দলের আপত্তির মুখে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনায় এ রদবদলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু, ভোট সামনে রেখে এ রদবদলের কারণে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। একই সঙ্গে আরেকটি রাজনৈতিক দলও এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলে সরকার আদেশটি বাতিল করতে বাধ্য হয়।
আসছে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি
নির্বাচনের আগেই দেড় শতাধিক যুগ্ম-সচিবকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি দিতে কাজ করছে প্রশাসন। মূলত বিসিএস ২০তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের পদোন্নতির জন্য বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। তাদের সঙ্গে অতীতে বিভিন্ন ব্যাচের বঞ্চিত (লেফট আউট) কিছু কর্মকর্তাও পদোন্নতি পেতে পারেন। চলতি মাসে পদোন্নতির প্রজ্ঞাপন জারি করা হতে পারে বলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এসএসবির বৈঠকে বিবেচ্য কর্মকর্তাদের কর্মজীবনের নথিপত্র পর্যালোচনা করা হয়েছে। সব মিলিয়ে পদোন্নতির জন্য প্রায় ৩শ কর্মকর্তাকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জানা যায়। পদোন্নতির জন্য গত ৭ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত এসএসবির অনেকগুলো সভাও হয়েছে।
পদোন্নতির এ সিদ্ধান্তে কর্মকর্তারা খুশি থাকলেও সাবেক আমলাদের কেউ কেউ এটিকে ভালোভাবে দেখছেন না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সচিব বলেন, ‘যখন ভোট একেবারে নাকের ডগায় এ মুহূর্তে সরকারের এ ধরনের পদক্ষেপে যাওয়া উচিত নয়। কারণ অতীত অভিজ্ঞতা ভালো নয়। এ পদোন্নতি ঘিরে না আবার নতুন কোনো বিতর্ক-বিশৃঙ্খলার মুখোমুখি হয় সরকার। তাই এ ধরনের সংবেদনশীল কাজ থেকে তাদের বিরত থাকা উচিত।’
যা বলছেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক আমলারা
ইউএনওদের বদলি করে আবার তা বাতিলের বিষয়ে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক আমলা মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া জাগো নিউজকে বলেন, ‘এ ধরনের সিদ্ধান্ত প্রশাসনের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করে। আদেশ জারির আগেই তো তাদের এ বিষয়ে চিন্তা করার কথা ছিল। এটা ভালো নজির নয়।’
বর্তমান প্রশাসন স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের সবচেয়ে দুর্বল প্রশাসন মন্তব্য করে প্রশাসন বিষয়ক বহু গ্রন্থের রচয়িতা ফিরোজ মিয়া বলেন, ‘শীর্ষ পদগুলোতে যারা আছেন তারা কেউই যোগ্যতা ও দক্ষতা দেখাতে পারেননি। এই যে বদলি করে আবার বাতিল করা হলো, এটার প্রভাব কিছুটা হলেও তো নির্বাচনে পড়বে বলে আমি মনে করি।’
তিনি বলেন, ‘এক পক্ষ তো বলবে বদলি নিশ্চয়ই কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে করেছিল, পরে আপস করে সেই আদেশ বাতিল করা হয়েছে। জনমনে তো এটা নিয়ে একটা সন্দেহ তৈরি হবে- কেনই বা বদলি করলো আবার কেনই বা বাতিল করলো।’
অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতির বিষয়ে সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়া বলেন, ‘নিরপেক্ষভাবে যদি সরকার পদোন্নতি দেয়, তবে এটি দোষের বিষয় নয়। যারা যোগ্য তারা পদোন্নতি পাবেন, পদোন্নতির সময় হলো তো আবার না দিলে বঞ্চিত করা হয়। তবে যদি কোনো উদ্দেশ্যে পদোন্নতি দেওয়া হয়, তবে তো সেটা সব সময়ের জন্যই খারাপ।’
ইউএনওদের বদলির বিষয়ে সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার জাগো নিউজকে বলেন, ‘ইউএনওদের বদলির আদেশ জারি হওয়ার পর হয়তো তাদের কাছে মনে হয়েছে, এক্ষেত্রে ঘাটতি আছে। তাই তারা বদলির আদেশটি বাতিল করেন। পরবর্তীসময়ে বদলির আদেশ বাতিল করার কাজটি সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য।’
তিনি বলেন, ‘তবে এ সময়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে আবার তা বাতিল করার মতো বিষয় এখন না আসাই ভালো। এতে তো একটা গ্যাপ তৈরি হয়।’
পদোন্নতি প্রশাসনের নিয়মিত বিষয়- মন্তব্য করে আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, ‘নির্বাচন ঘনিয়ে এলেও পদোন্নতির ক্ষেত্রে আইনগত কোনো বাধা নেই। এ পদোন্নতি ভোটেও কোনো প্রভাব ফেলবে না। তবে এ সময়ে এটি না দেওয়া ভালো বলে আমি মনে করি।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান সরকারের যোগ্যতার ঘটতি ছিল, কিন্তু আন্তরিকতার ঘাটতি ছিল না। তাদের নানা রাজনৈতিক চাপ ও কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে এগোতে হয়েছে। তাই হয়তো কাঙ্ক্ষিত অনেক কিছুই এ প্রশাসন করতে পারেনি।’
যা বলছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়
এসব বিষয়ে কথা বলতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হককে অসংখ্যবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠিয়েও সাড়া পাওয়া যায়নি।
নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রেষণ (এপিডি) অনুবিভাগের যুগ্ম-সচিব মিঞা মুহাম্মদ আশরাফ রেজা ফরিদী জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের পর্যায়ে বলার মতো এখনো কোনো তথ্য নেই। তবে অনেক দিন ধরেই তো এটা নিয়ে (অতিরিক্ত সচিব পদোন্নতি) কাজ চলছে।’
এ পর্যায়ে পদোন্নতির বিষয়টি অনেকে ভালো চোখে দেখছেন না- দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, ‘পদোন্নতি দেওয়ার বিষয়টি তো সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত।’
আরএমএম/এএসএ