দাভোস থেকে ঢাকা: করিডোর ডিপ্লোমেসিতে বাংলাদেশের নতুন কৌশল
বিশ্ব যখন যুদ্ধ, মন্দা ও ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যদিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময় বাংলাদেশের জন্য কূটনীতি মানে আর শুধু আনুষ্ঠানিক বৈঠক বা চিঠিপত্র নয়—বরং কৌশলগত উপস্থিতি, করিডোর ডিপ্লোমেসি এবং পেশাদার এনগেজমেন্ট।
সুইজারল্যান্ডের দাভোসে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে এমনটাই জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী।
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর বেইলি রোডের ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে তিনি দাভোসে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, মন্ত্রী, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বৈশ্বিক করপোরেট নেতাদের সঙ্গে হওয়া বৈঠক ও আলোচনার বিস্তারিত তুলে ধরেন।
আনুষ্ঠানিকতার বাইরে ‘করিডোর ডিপ্লোমেসি’
লুৎফে সিদ্দিকী জানান, বর্তমান বিশ্বে কূটনীতি আর কেবল হ্যান্ডশেক আর ফটোসেশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দাভোসে তিনি ‘সেমি-ফরমাল’ কাঠামো ব্যবহার করেছেন—যার মধ্যে ছিল বাইল্যাটারাল মিটিং, প্রাইভেট রাউন্ড টেবিল এবং করিডোর ডিপ্লোমেসি। অনানুষ্ঠানিক এই পরিবেশেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কার, বিনিয়োগ সম্ভাবনা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা সরাসরি তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বাণিজ্যে বড় অগ্রগতি: জাপান, ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্র
দাভোস সফরের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অর্জনের একটি হিসেবে উঠে আসে জাপানের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (ইপিএ)। লুৎফে সিদ্দিকী জানান, বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম জাপানের সঙ্গে এমন চুক্তি অনুমোদিত হলো, যা এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর রপ্তানি ও বিনিয়োগে বড় সহায়ক হবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ২০২৯ সালের পর জিএসপি সুবিধা ধরে রাখতে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ইইউ-এর সঙ্গে একটি ‘এনগেজমেন্ট প্ল্যাটফর্ম’ স্বাক্ষর হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ আলোচনার ভিত্তি তৈরি করবে।
আরও পড়ুন
বাংলাদেশে আসতে আগ্রহী পেপাল, তবে প্রক্রিয়া দীর্ঘ: লুৎফে সিদ্দিকী
ভুয়া তথ্যে আবেদন: বস্তায় ভরে ৬০০ বাংলাদেশির পাসপোর্ট ফেরত
যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও আশাবাদের বার্তা পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের রপ্তানির ওপর বিদ্যমান প্রায় ২০ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক কমানোর বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া মিলেছে। পাশাপাশি ব্যবসার পথে বড় বাধা হয়ে থাকা নন-টারিফ ব্যারিয়ার কমানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণ নিয়েও কথা হয়েছে। বিশেষ করে থাইল্যান্ডের সঙ্গে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য খাতে বিনিয়োগ এবং সরাসরি বন্দর যোগাযোগ স্থাপনের উদ্যোগের কথা জানান তিনি।
আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সংস্কার এজেন্ডা
আইএমএফ প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বাংলাদেশের চলমান অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রশংসা করেছেন এবং সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়েছেন। লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থা এখন মাল্টিল্যাটারাল কাঠামো থেকে সরে গিয়ে রেসিপ্রোকাল বা পারস্পরিক সুবিধাভিত্তিক সম্পর্কে ঝুঁকছে—যা ডব্লিউটিও আলোচনাতেও স্পষ্ট।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) কাছে বাংলাদেশি নার্সদের বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে ‘রেড লিস্ট’ থেকে নাম সরানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে, যা হলে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানিতে নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
ডিজিটাল সংস্কারে দৃশ্যমান পরিবর্তন
প্রশাসনিক সংস্কার ও ডিজিটাল রূপান্তরের কথাও তুলে ধরেন বিশেষ দূত। কাস্টমস ও বন্দরে ‘ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো’ চালুর ফলে কিউআর কোড ও ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় ট্রাক প্রবেশের সময় ২০ মিনিট থেকে কমে মাত্র ২০ সেকেন্ডে নেমে এসেছে।
প্রবাসী কর্মীদের জন্য বিএমইটি’র আওতায় ১ জানুয়ারি থেকে ইমিগ্রেশন সার্টিফিকেশনসহ সব প্রক্রিয়া শতভাগ অনলাইন করা হয়েছে। এতে গত তিন মাসে প্রায় ১২ লাখ মানুষকে অফিসে এসে হয়রানির মুখে পড়তে হয়নি।
মেটা, পেপাল ও প্রযুক্তি কূটনীতি
নির্বাচনের আগে অপপ্রচার ঠেকাতে মেটার (ফেসবুক) সঙ্গে একটি রিয়েল-টাইম প্রটোকল তৈরির কথা জানান লুৎফে সিদ্দিকী। এর মাধ্যমে উসকানিমূলক কনটেন্ট দ্রুত শনাক্ত ও বন্ধ করা সম্ভব হবে।
পেপ্যাল বাংলাদেশে আসার বিষয়ে নীতিগতভাবে আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানটি এখনো অভ্যন্তরীণ বোর্ড পর্যায়ে আলোচনা করছে এবং নির্দিষ্ট সময়সূচি জানাতে চায়নি।
মানবিক সহায়তা, অভিবাসন ও রোহিঙ্গা ইস্যু
দাভোসে জাতিসংঘের মাধ্যমে প্রায় ২০ মিলিয়ন ডলার সমমূল্যের পটাশ সার বাংলাদেশ বিনামূল্যে পাওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। অবৈধ অভিবাসন বন্ধে ইউরোপের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে আইওএম-এর সঙ্গে কঠোর ব্যবস্থার আলোচনা হয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, মিয়ানমার পরিস্থিতিকে কেবল গণতন্ত্রের সংকট হিসেবে নয়, বরং একটি বড় মানবিক বিপর্যয় ও আন্তঃদেশীয় অপরাধের উৎস হিসেবে বিশ্বকে দেখতে হবে। এই সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।
প্রেস ব্রিফিংয়ের সারকথা টেনে লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, অনিশ্চিত এই বিশ্বে বাংলাদেশকে চিঠির জবাবের অপেক্ষায় বসে থাকলে চলবে না। পেশাদার সম্পর্ক, দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং কৌশলগত কূটনীতির মাধ্যমেই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের প্রাসঙ্গিকতা প্রমাণ করতে হবে।
এমইউ/ইএ
সর্বশেষ - জাতীয়
- ১ বাংলাদেশের নির্বাচনে কোনো পক্ষ নেবে না যুক্তরাষ্ট্র: রাষ্ট্রদূত
- ২ এনজিওগুলোর মতো, না রাজনৈতিক সরকারের মতো কাজ করছি বুঝছি না
- ৩ সামরিক সহযোগিতা জোরদারে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র ল্যান্ড ফোর্সেস টকস
- ৪ দেশে এসেছে প্রবাসীদের ভোট দেওয়া ২৯৭২৮ পোস্টাল ব্যালট
- ৫ ‘রাস্তা এমন খারাপ যে মনে হয় না এটা ঢাকার ভেতরের কোনো এলাকা’