ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. জাতীয়

ভোটের ছুটিতে বাড়ি ফেরা: সদরঘাটে উপচে পড়া ভিড়, পথে নানা ভোগান্তি

আশিকুজ্জামান | প্রকাশিত: ০৫:৩৭ পিএম, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দীর্ঘ ছুটিকে কেন্দ্র করে রাজধানী ছাড়তে শুরু করেছে মানুষ। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের ঘরমুখো মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল। ভোট দেওয়ার উৎসাহ আর পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর আনন্দ থাকলেও, পথে পথে নানাবিধ ভোগান্তি সাধারণ মানুষের কপালে ফেলছে চিন্তার ভাঁজ।

আগামীকাল বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) থেকে নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে টানা চারদিনের সরকারি ছুটি শুরু হচ্ছে। বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানেও তিন থেকে চার দিনের ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মচারীদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুবিধার্থে আজ মঙ্গলবারও (১০ ফেব্রুয়ারি) ছুটি দিয়েছে।

ফলে সকাল থেকেই সদরঘাটে পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, চাঁদপুর ও মুন্সীগঞ্জগামী পন্টুনগুলোতে ছিল মানুষের উপচে পড়া ভিড়। বন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুপুরের পর থেকে যাত্রীর চাপ আরও বাড়তে শুরু করে। রাত পর্যন্ত যাত্রীদের চাপ থাকবে।

অনেকে আগেভাগেই পরিবার পাঠিয়ে দিয়েছিলেন, আজ নিজে যাচ্ছেন। লঞ্চঘাটের স্বেচ্ছাসেবকদের ব্যস্ততা ছিল চোখে পড়ার মতো। মাইকে বারবার লঞ্চের অবস্থান ও নিরাপত্তা বার্তা প্রচার করা হচ্ছিল।

পথে পথে ভোগান্তি

সরেজমিনে দেখা যায়, আনন্দ নিয়ে বাড়ি ফিরতে চাইলেও রাজধানীর যানজট ও সড়কে অব্যবস্থাপনা যাত্রীদের নাজেহাল করে তুলেছে। বিশেষ করে সদরঘাট এলাকার প্রবেশপথগুলোতে তীব্র জট দেখা গেছে। যাত্রীদের ঘাটে আসতে গণপরিবহন থেকে নামতে হয়, প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে রায়সাহেব বাজার মোড়ে। এই সড়কটিতে বর্তমানে রিক্সা, ভ্যান ও অন্যান্য যানবাহনের তীব্র যানজট থাকায় বাধ্য হয়ে যাত্রীদের পায়ে হেঁটেই ঘাট পর্যন্ত আসতে হচ্ছে। আর সড়কের দুপাশে ফুটপাতের ওপর অস্থায়ী দোকানপাট বসায় চলাচলের পথ হয়ে গেছে সরু। ফলে মালামাল ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘাট পর্যন্ত আসতে পড়তে হচ্ছে নানা ভোগান্তিতে।

আর এসব স্থানে দায়িত্বপ্রাপ্ত নিরাপত্তা কর্মীদের উপস্থিতিও কম ছিল।

jagonews24.com

গাজীপুর থেকে সপরিবারে আসা আলী আহমেদ তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে জাগো নিউজকে বলেন, বাসা থেকে বের হয়ে সদরঘাট আসার জন্য গণপরিবহন পেতেই দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। ভাড়াও গুনতে হয়েছে বেশি। বাস থেকে রায়সাহেব বাজার মোড়ে নামার পর বিপত্তি আরও বাড়ে। সেখান থেকে লঞ্চঘাট পর্যন্ত পুরো রাস্তা যানবাহন আর ভ্যানে স্থবির হয়ে ছিল। ফুটপাতগুলো হকারদের দখলে থাকায় পরিবার নিয়ে হেঁটে আসাও অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। তবে ঘাটে এসে লঞ্চের দেখা পেয়ে সব ক্লান্তি ভুলেছি।

একই অভিযোগ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তামিম ইকবাল। তিনি বলেন, ভোট দেওয়া নাগরিক দায়িত্ব, তাই বাড়ি যাচ্ছি। কিন্তু সদরঘাটের সংযোগ সড়কগুলোর বিশৃঙ্খলা দূর না করলে সাধারণ মানুষের এই ভোগান্তি কোনোদিনও শেষ হবে না।

গৃহিণী রেহানা ইয়াসমীন বলেন, পরিবার আর দুই সন্তান নিয়ে মিরপুর থেকে আসলাম। রাস্তার যে অবস্থা, বিশেষ করে রায়সাহেব বাজার থেকে সদরঘাট পর্যন্ত হেঁটে আসা আমাদের জন্য বিভীষিকা ছিল। ছোট বাচ্চা নিয়ে ফুটপাত দিয়ে হাঁটার উপায় নেই, সব দোকানদারদের দখলে। কর্তৃপক্ষ যদি এই কয়েকটা দিন রাস্তা পরিষ্কার রাখতো, তবে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ অর্ধেক কমে যেত।

ঘাটে অপেক্ষমাণ যাত্রী আব্দুল খালেক বলেন, শরীরের অবস্থা ভালো না হলেও ভোটের টানে বাড়ি যাচ্ছি। নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেবো, এটা একটা বড় পাওয়া। ভোগান্তি তো আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী, তবুও বাড়ির টানে সব সহ্য করা যায়।

ভোট ও বাড়ি ফিরতে পারায় উচ্ছ্বাস

ভোগান্তি থাকলেও প্রথমবার ভোট দেওয়ার সুযোগ পাওয়ায় তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দেখা গেছে বিশেষ উদ্দীপনা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাফসান জানি জাগো নিউজকে বলেন, এবারই প্রথম ভোটার হয়েছি। নিজের পছন্দের প্রার্থীকে সরাসরি ব্যালটে ভোট দেবো। এই উত্তেজনায় রাস্তার ভোগান্তি গায়ে লাগছে না। বন্ধুদের সঙ্গে গ্রুপ করে বাড়ি যাচ্ছি, আনন্দই আলাদা।

jagonews24.com

সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধ আব্দুল হাই লাঠিতে ভর দিয়ে লঞ্চে উঠছিলেন। তিনি বলেন, ভোট দেওয়া আমাগো আমানত। শরীর চলে না, তবুও নাতি-পুতিদের নিয়ে গ্রামে যাচ্ছি যেন নিজের হকটা আদায় করতে পারি। বাড়িতে সবাই একসঙ্গে হবো, এর চেয়ে বড় পাওনা আর নাই।

চাঁদপুর যাওয়া ইডেন কলেজ শিক্ষার্থী সাদিয়া আফরিন বলেন, আমি এবার প্রথম ভোটার হয়েছি। নিজের ভোটটা নিজে দেওয়ার জন্য অনেকদিন ধরে অপেক্ষায় ছিলাম। ডিজিটাল বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে ব্যালটে সিল মারাটা আমার কাছে একটা বড় ইভেন্ট। যদিও সদরঘাট পর্যন্ত আসতে রিকশা আর ভ্যানের জটলায় দুই ঘণ্টা বসে থাকতে হয়েছে, তাও ভোট দেওয়ার রোমাঞ্চে সব কষ্ট ভুলে গেছি।

বরিশালে লঞ্চের অপেক্ষায় থাকা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা হাজী মোজাফফর আলী বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে অনেক নির্বাচন দেখেছি। নাগরিক দায়িত্ব পালনের জন্য গ্রামে যাচ্ছি। সদরঘাটে মানুষের এই যে স্রোত, এটা প্রমাণ করে মানুষ এখনো গণতন্ত্র আর উৎসবকে কতটা ভালোবাসে। তবে ফুটপাতগুলো যদি দখলমুক্ত থাকতো, তবে আমার মতো বয়স্কদের জন্য যাতায়াতটা একটু সহজ হতো।

সাভার থেকে আসা পোশাক শ্রমিক কামাল হোসেন বলেন, সারাবছর তো খাটি, এই ছুটির উছিলায় একটু বাড়ি যাওয়া। লঞ্চে তো পা ফেলার জায়গা নেই। তবুও ডেক-এ জায়গা পেয়েছি, এটাই অনেক। পরিবারের সঙ্গে ভোট উৎসব পালন করতে পারবো, এই আনন্দেই বাড়ি ফেরা।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম বলেন, টানা ছুটি পাওয়ায় বাড়ি যাওয়ার সুযোগটা হাতছাড়া করলাম না। আমরা বন্ধুরা মিলে একসঙ্গে যাচ্ছি। লঞ্চে ওঠার সময় ভিড় সামলানো কঠিন ছিল, তবে স্বেচ্ছাসেবকরা সাহায্য করায় বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। গ্রামে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা আর ভোট, সব মিলিয়ে একটা জমজমাট সময় কাটবে আশা করি।

চকবাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রতন শেখ পরিবার নিয়ে মুন্সিগঞ্জের বাড়িতে ফিরছেন। তিনি বলেন, নির্বাচনের কারণে দোকান আগেভাগেই বন্ধ করে দিয়েছি। নিজের ভোটটা নিজের গ্রামে গিয়ে দেবো। পথের ভোগান্তি তো বাংলাদেশে নতুন কিছু না, প্রতিবারই এমন হয়। তবে এবার ঘাটে নিরাপত্তাব্যবস্থা আগের চেয়ে একটু ভালো মনে হচ্ছে, পুলিশি টহল থাকায় ভয়টা কম লাগছে।

বন্দরে নিরাপত্তা ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

বাংলাদেশ লঞ্চ মালিক সমিতি কার্যালয়ের দপ্তর সম্পাদক প্রদীপ বড়াই জাগো নিউজকে বলেন, কয়েকটি এলাকার প্রতিদ্বন্দিতা করা প্রার্থীরা সেসব এলাকার যাত্রীদের জন্য বিশেষ লঞ্চ সার্ভিসের ব্যবস্থা করেছে। এছাড়াও, কিছু ক্ষেত্রে লঞ্চের সংখ্যাও বাড়িয়েছে। সন্ধ্যার পরে আরও যাত্রীদের চাপ বাড়বে আশা করি।

যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে বন্দর কর্তৃপক্ষ কী কী উদ্যোগ নিয়েছে জানার জন্য ঢাকা নদী বন্দরে নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগে বিকেল সাড়ে ৩টায় গেলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে দপ্তরে পাওয়া যায় নি। দপ্তরের অন্যান্য কর্মকর্তারাও গণমাধ্যমে বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের আওতাধীন সদরঘাট পুলিশ ফাঁড়ির কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে, ফাঁড়ির ইনচার্জ নির্বাচনি দায়িত্ব পালনে রয়েছেন বলে জানান কার্যালয়ে থাকা এক পুলিশ সদস্য।

jagonews24.com

যাত্রীদের নিরাপত্তায় কতজন পুলিশ সদস্য দায়িত্বে রয়েছেন বা অন্য কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না- এসব বিষয়ে এই পুলিশ সদস্য জানাতে পারেননি।

পরবর্তীতে মুঠোফোনের মাধ্যমে কোতোয়ালি থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও পুলিশ ফাঁড়িটির ইনচার্জের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা ফোন ধরেনি।

সদরঘাট নৌ থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সোহেল রানা জাগো নিউজকে বলেন, সমন্বিত সবার সঙ্গে সমন্বয় সভা করে যাত্রীরা যেন নিরাপদে ভ্রমণযাত্রা করতে পারেন সেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আমাদের থানায় এখন পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার অভিযোগ আসেনি। নিয়মিত আমাদের টহল দল নিরাপত্তা বিষয়গুলো তদারকি করছেন।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গনভোট অনুষ্ঠিত হবে।

এমডিএএ/এএমএ