ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. জাতীয়

নাগরিক প্ল্যাটফর্ম

আর্থিক সক্ষমতা অনুযায়ী নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পরামর্শ

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক | প্রকাশিত: ০২:৫২ পিএম, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারকে দেশের আর্থিক সক্ষমতার বড় চ্যালেঞ্জকে বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ধাপে ধাপে এগোনোর পরামর্শ দিয়েছে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম।

বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টার ইনে ‘নতুন সরকারের সূচনাবিন্দু: অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে সংস্থাটি এ পরামর্শ দেয়। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান। উপস্থিত ছিলেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এবং সংস্থার আরেক সম্মানীয় ফেলো ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, ইশতেহারগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের দিকে এগানো উচিত। প্রথমেই সবগুলোর ব্যাপারে না যাওয়া, কারণ আর্থিক সক্ষমতা বড় চ্যালেঞ্জ হবে এটা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে। তিনি মূল প্রবন্ধে নতুন সরকারের ১০টি চ্যালেঞ্জের কথা বলেন।

ফ্যামিলি কার্ড
প্রবন্ধে বলা হয়, গ্রামীণ ৫০ লাখ পরিবারকে মাসে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা সহায়তা দিয়ে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ৫০ লাখ পরিবারকে এ সহায়তার আওতায় আনতে বছরে আনুমানিক ৯ হাজার ৬০০ কোটি থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে, যা জিডিপির প্রায় ০.১৫ থেকে ০.২০ শতাংশের সমান। এই কর্মসূচি সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থাকে সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে উপকারভোগী নির্বাচনের প্রক্রিয়া হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এক্ষেত্রে প্রচলিত প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক পদ্ধতির পরিবর্তে বৈজ্ঞানিক ‘প্রক্সি মিনস টেস্ট’ পদ্ধতি অনুসরণ করার প্রস্তাব করা হয় প্রবন্ধে।

এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠে। কার্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু আন্তর্জাতিক সূচক রয়েছে, সেটা অনুসরণ এবং রাজনৈতিক চাপ উপেক্ষা করে যদি দেওয়া হয় তাহলে প্রকৃত বঞ্চিতরা সুবিধাভোগী হবে এবং নির্বাচনি ইশতিহার বাস্তবায়ন হবে।

এছাড়া, স্থানীয় সরকার নির্বাচন হওয়ার পর ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন দেবপ্রিয়। কারণ হিসেবে তিনি বলছেন, ভোটের আগে দিলে একদিকে কার্ড নির্বাচনের ক্ষেত্রে দুর্নীতির আশঙ্কা বেশি থাকবে, অন্যদিকে প্রকৃত তথ্যের ঘাটতি থাকতে পারে। সেজন্য একটু সময় দিয়ে দিলে প্রকৃতভাবে যারা পাওয়ার যোগ্য তারা পাবেন।

দেবপ্রিয় বলেন, ‘নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। আগামী দিনে অর্থনীতি কীভাবে পরিচালিত হবে সেটা বোঝার জন্য আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি। সরকার এরই মধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করেছে, সেগুলো মূল্যায়ন করার সুযোগ আমাদের ধীরে ধীরে হচ্ছে।’

১ ট্রিলিয়ন ডলার জিডিপি
২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের জিডিপি এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ প্রসঙ্গে প্রবন্ধে বলা হয়, ২০২৫ অর্থবছরে জিডিপির আকার ছিল ৪৬২ বিলিয়ন ডলার। এই অবস্থান থেকে ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে হলে ডলার ভিত্তিতে গড়ে প্রায় ৯ শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এ লক্ষ্য অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী হলেও এটি নির্বাচনি অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যমান উদ্যোগের তুলনায় বেশি আগ্রাসী।

কর-জিডিপি অনুপাত
অন্যদিকে, রাজস্ব আহরণ বাড়ানোও এই লক্ষ্য অর্জনের অন্যতম শর্ত। ২০২৫ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ছিল ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০২৬ সালের জন্য ৮ দশমিক ৩ শতাংশ লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও তা অর্জন করা কঠিন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অগ্রগতি ধরলেও প্রতি বছর প্রায় ০ দশমিক ৯ শতাংশ পয়েন্ট করে উন্নতি প্রয়োজন, যাতে ২০৩১ সালে কর-জিডিপি অনুপাত প্রায় ১১ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। তবে সংস্কারভিত্তিক পদক্ষেপ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে স্বল্পমেয়াদে জিডিপির অতিরিক্ত ২ শতাংশ সমপরিমাণ রাজস্ব অর্জন সম্ভব, যা ২০৩১ সালে কর-জিডিপি অনুপাতকে ১৩ দশমিক ৩ শতাংশে উন্নীত করতে সহায়ক হতে পারে। সামগ্রিকভাবে আগামী পাঁচ বছরে গড়ে প্রায় ১ দশমিক ২৫ শতাংশ পয়েন্ট হারে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর প্রয়োজন হবে।

এ বিষয়ে তৌফিকুল ইসলাম বলেন, বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৪ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হলে এবং একই সঙ্গে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে চাইলে, এমন উচ্চ রাজস্ব প্রবৃদ্ধিও যথেষ্ট নাও হতে পারে। ফলে লক্ষ্য অর্জন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, কার্যকর সংস্কার ও শক্তিশালী রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ওপরই নির্ভর করতে হবে।

তিনি জানান, অর্থনীতিতে তিনটি প্রধান বাধা রয়েছে। সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা একটা দুর্বল জায়গার ভেতরে রয়েছে। ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান দুর্বল স্থানে রয়েছে। সরকারের আর্থিক ক্ষমতাও খুব সংকুচিত আছে।

তবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ভালো জায়গায় আছে। এটা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। বিনিময় হারে স্থিতিশীলতা রয়েছে। এটা আসার পেছনে আমদানি নিয়ন্ত্রণ কাজ করেছে। এটা প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার বাঁচিয়েছে। এতে অভিঘাতটা হলো মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে। দুই অর্থবছরে স্বস্তির জায়গা ছিল রেমিট্যান্স। খারাপ অবস্থায় ছিল বৈদেশিক ঋণের পরিস্থিতি, যোগ করেন তৌফিকুল ইসলাম।

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ খাতে প্রবৃদ্ধি কমেছে। এটা কমার মূল জায়গা শিল্প ও সেবা খাত। আগামী দিনে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে এগুলো বাড়াতে হবে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বড় ধরনের কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার লক্ষণ তথ্য-উপাত্ত থেকে পাওয়া যাচ্ছে।

সরকার কী ধরনের নীতিমালা নিতে পারে- পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ছোটখাট হলেও নীতি সুদের হার করা দরকার। আগামী চার মাস রিজার্ভ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা। ধীরে হলেও অল্প অল্প করে সামনের দিনে অবচয় পদ্ধতি রাখা উচিত। টাকার মান একটু একটু ছাড়া উচিত। এটা রপ্তানি ও রেমিট্যান্সে সুবিধা দেবে।

সরকারের ব্যয় হ্রাস
তৌফিকুল ইসলাম জানান, বিপুল পরিমাণ প্রণোদনার ব্যয় আছে রপ্তানি ও রেমিট্যান্সে। এটা ধীরে ধীরে তুলে নেওয়ার এখন সুযোগ আছে। এ অর্থবছর থেকে শুরু করে আগামী অর্থবছরে এটা তুলে দেওয়া প্রয়োজন। সরকারের ব্যয়ের চাপ আছে। সেটা থেকে বের হয়ে আসা দরকার।

তিনি বলেন, সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে আরও বেশি রক্ষণশীল পন্থা নেওয়া দরকার। নতুন প্রকল্পে ধীরে চলার নীতি অনুসরণ ও বিদেশি অর্থায়নের প্রকল্পে মনোযোগী হওয়া দরকার। করহার বাড়াতে পদক্ষেপ, সরকারের লাভবান প্রতিষ্ঠানের শেয়ার অফলোড করা ও পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে মনোযোগী হতে হবে। এ সরকারের প্রথম পরীক্ষা হবে তারা কতখানি বাস্তবসম্মতভাবে বাজেট সংশোধন করতে পারে।

এসএম/একিউএফ