টিসিবির ট্রাক সেল
‘পণ্য দিতে পারবো ৪০০ জনকে, আধাঘণ্টার মধ্যে আসবে হাজারখানেক লোক’
টিসিবির ট্রাক সেল থেকে পণ্য কিনতে আসা মানুষের ভিড়/ছবি: জাগো নিউজ
রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) বেলা দেড়টা। ভর্তুকি মূল্যে খাদ্যপণ্য বিক্রির জন্য সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) একটি ট্রাক দাঁড়িয়েছে রামপুরার হাজিপাড়া পেট্রোল পাম্পের পাশেই। ওই ট্রাকের পণ্য বিক্রি করবে ডিলার প্রতিষ্ঠান এ্যামি ইন্টারপ্রাইজ। তাদের লোকজন আছে ছয়জন। কিন্তু ট্রাক থামার কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেখানকার চিত্র পাল্টে গেলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্রেতার চাপে খেই হারিয়ে ফেললেন বিক্রেতাদের সবাই। নিমিষের মধ্যে সেখানে জড়ো হয়ে গেলো ৩০০ থেকে ৪০০ মানুষ। শুরু হলো হইহুল্লোড়, চিৎকার-চেচামেচি।
কার আগে কে নেবেন, বিশেষ করে নারীরা শুরু করে দিলেন ঠেলাঠেলি। বেশি বয়স্ক কয়েকজনকে পড়ে যেতেও দেখা গেল। বারবার ডিলারের প্রতিনিধি ইসলাম মিয়া বলছিলেন, আপনারা শান্ত হোন, লাইনে দাঁড়ান। লাইন ছাড়া কাউকে মাল (পণ্য) দেওয়া হবে না।
এর পর জাগো নিউজের প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় ওই ডিলারের প্রতিনিধির। তিনি বলেন, ‘আসলে আমরা যে বরাদ্দ পেয়েছি, তাতে ৪০০ ক্রেতাকে পণ্য দিতে পারবো। এখানে আধা ঘণ্টার মধ্যে হাজারখানেক লোক আসবে। ক্রেতারাও সেটা জানে, যে কারণে হুড়াহুড়ি করে আগে লাইনে আসতে চায় যেন পণ্যটি নিশ্চিত করতে পারে।’
সেখানে ভর্তুকি মূল্যে খাদ্যপণ্য কেনার জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছেন ষাটোর্ধ্ব বুলি বেগম। সঙ্গে এসেছেন ওই বয়সের আরও দুজন। দেখা গেল, তুলনামূলক কম বয়স্কদের ধাক্কায় তারা ওই লাইনে টিকতে পারছিলেন না। পায়ে ব্যথা পেয়ে পরবর্তীতে লাইন ছেড়ে পাশে বসে পড়েন তারা।
কার আগে কে পণ্য নেবেন এ নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে কাড়াকাড়ি/ছবি: জাগো নিউজ
পরবর্তীতে ডিলার সেখানে হাতে লেখে টোকেন বিতরণ শুরু করেন। সেখানে উপস্থিত আড়াই শ টোকেন বিতরণ করার পরে বিক্রি শুরু হয় প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে।
ওই সময়টুকু দাঁড়িয়ে দেখা যায়, রাস্তায় চলাচলকারী অনেক রিকশা, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকসহ দিনমজুররা লাইনে এসে দাঁড়াচ্ছেন, যারা অন্য কাজে যাচ্ছিলেন।
এমন একজন মজনু মিয়া বলেন, বাজারে দামের চোটে পণ্য কিনতে পারি না। ফ্যামিলি কার্ডও নেই। ফলে এসব ট্রাক সেলে পণ্য কিনতে হয়। সে কারণে কোথাও ট্রাক দেখলেই দাঁড়িয়ে পড়ি। অনেকদিন অপেক্ষার পরও টোকেন পাইনি। তারা (ডিলার) যে কয়জনকে পণ্য দিতে পারে, লাইনে তার চেয়ে আরও বেশি মানুষের অপেক্ষা থাকে।
সেখানে জামেদুল নামের একজন বলেন, মাল নিতে গিয়ে পুরান ঢাকায় কাজে যাওয়া মিস গেল। তাও তো টোকেন পেয়েছি, মাল পাব। কাজে কাল যাওয়া যাবে, কিন্তু মাল পাওয়া যাবে না।
রমজান মাস উপলক্ষে মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) থেকে সারা দেশে ২০ দিন ট্রাকে করে পণ্য বিক্রি (ট্রাক সেল) শুরু করেছে টিসিবি। এ বিক্রি কার্যক্রম চলবে ১২ মার্চ পর্যন্ত। টিসিবির ট্রাক থেকে একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ দুই লিটার সয়াবিন তেল, দুই কেজি মসুর ডাল, এক কেজি ছোলা, এক কেজি চিনি এবং আধা কেজি খেজুর কিনতে পারছেন। এর মধ্যে প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম রাখা হচ্ছে ১১৫ টাকা। প্রতি কেজি চিনি ৮০ টাকা, মসুর ডাল ৭০ টাকা, ছোলা ৬০ টাকা ও খেজুরের দাম ১৬০ টাকা।
ট্রাক সেল থেকে ন্যায্য মূল্যে টিসিবির পণ্য নিচ্ছেন ক্রেতারা/ছবি: জাগো নিউজ
অর্থাৎ টিসিবির ট্রাক সেল থেকে যে দামে পণ্য কেনা যায়, সেটা বাজার দরের চেয়ে কেজিপ্রতি ২০ থেকে ৫০ টাকা কমে পাওয়া যায়। তবে বেশি ফারাক হয় খেজুরের দামে। রমজান উপলক্ষে ১৬০ টাকায় টিসিবি যে খেজুর (জাহিদি খেজুর) দিচ্ছে বাজারে তার দাম ৪০০ টাকা।
সারা দেশে মোট ৪৫০টি ভ্রাম্যমাণ ট্রাকের মাধ্যমে প্রতিদিন (ছুটির দিন ছাড়া) নিম্নআয়ের মানুষের জন্য এসব পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। প্রতিটি ট্রাকে ৪০০ জনের জন্য পণ্য বরাদ্দ থাকবে। এভাবে ট্রাক সেলের মাধ্যমে প্রায় ৩৫ লাখ ভোক্তার কাছে ২৩ হাজার টন পণ্য বিক্রি করা হবে। যে কোনো ভোক্তা ট্রাক থেকে পণ্য কিনতে পারবেন।
তবে রমজানে মানুষের চাহিদা বেশি থাকায় লাইন ঠিক রেখে তাদের পণ্য দিতে হিমশিম খেতে হয় বলে জানান টিসিবির ডিলার আমিনুল হক। তিনি বলেন, এখানে হাজারের বেশি মানুষ হয়ে যায়। তাই আরও বেশি বরাদ্দ পেলে হয়তো বেশি মানুষকে দেওয়া যেত। সরকারের উচিত রমজানে বরাদ্দ কমপক্ষে দ্বিগুণ করা।
এদিকে টিসিবি জানিয়েছে, প্রতিদিন ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় ৫০টি জায়গায় ট্রাকে করে পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকায় ২০টি, দেশের অপর সাতটি মেট্রোপলিটন এলাকায় ১৫টি করে এবং বাকি ৫৫টি জেলায় পাঁচটি করে ট্রাকে এসব পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে।
এনএইচ/এমএমকে