নেপালে জেন-জির জয়যাত্রা, বাংলাদেশে পিছিয়ে কেন?
নেপালের গণঅভ্যুত্থান পরর্বর্তী নির্বাচনে জয়ী হচ্ছে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি। নির্বাচনের প্রচারে দলটির চেয়ারম্যান রবি লামিছানে (ডানে) ও প্রার্থী বালেন্দ্র শাহ। ফাইল ছবি: এএফপি
নেপালে জেন-জি প্রজন্মের সমর্থিত দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) সাম্প্রতিক নির্বাচনে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। দলটির জনপ্রিয় নেতা ৩৫ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহ দেশটির পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে। দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন, তরুণ ভোটারদের সমর্থন এবং নতুন নেতৃত্বের শক্তিশালী উপস্থিতি—এই তিনটি উপাদানকে দলটির উত্থানের প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান ঘিরে তৈরি হওয়া তরুণদের রাজনৈতিক শক্তি এখনো পুরোপুরি ভোটের শক্তিতে রূপ নিতে পারেনি। আন্দোলনের সময় বিপুল জনসমর্থন থাকলেও নির্বাচনের রাজনীতিতে সেই শক্তির প্রতিফলন সীমিত ছিল বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
তাদের মতে, আন্দোলনের সুস্পষ্ট লক্ষ্য না থাকা, নির্বাচনমুখী প্রস্তুতির অভাব, সংগঠিত কৌশলের ঘাটতি এবং আন্দোলনকারী শক্তিগুলোর মধ্যে বিভাজন—এসব কারণ বাংলাদেশে জেন-জি নেতৃত্বাধীন উদ্যোগগুলোর সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর জনতার উল্লাস, ফাইল ছবি
তবে বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর গড়ে ওঠা দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এই পরিস্থিতিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করছে। দলটির নেতাদের মতে, নতুন রাজনৈতিক শক্তির সামনে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর অসহযোগিতা এবং একটি বৈরী রাজনৈতিক পরিবেশ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদের মতে, বাংলাদেশের আন্দোলনটি শুরু থেকেই একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল না।
তিনি জাগো নিউজকে বলেন, বাংলাদেশের আন্দোলনটি কোটা সংস্কার আন্দোলন দিয়ে শুরু হয়। পরবর্তীতে এটি রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নিলেও সেই পরিবর্তনটি ছিল অনেকটা কৌশলগত এবং ধাপে ধাপে।
আরও পড়ুন
নেপালে ৫ দিন ধরে চলছে ভোট গণনা, ফলাফল ঘোষণা কবে?
নেপালে ভোটের প্রচারণায় যে কৌশলে বাজিমাত করেছেন বালেন্দ্র শাহ
নেপালে গণঅভ্যুত্থানের নেতারাই সরকার গঠন করেছে কারণ সেখানে ঢাবি নেই
সাব্বির আহমেদের ভাষায়, “আমাদের আন্দোলন খুব ভালোভাবে প্রস্তুত কোনো মুভমেন্ট ছিল না। কোটা আন্দোলন দিয়ে শুরু হয়। পরে যখন এটি রাজনৈতিক মুভমেন্টে রূপ নেয়, সেটি অনেকটা লুকোছাপা কৌশলের মাধ্যমে হয়েছে।”
অন্যদিকে নেপালের আন্দোলন শুরু থেকেই রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে গড়ে উঠেছিল বলে মনে করেন তিনি।
“নেপালের মুভমেন্টটি ছিল পুরোপুরি একটি রাজনৈতিক আন্দোলন, যা পুরো শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছিল। হয়তো শুরুতে পুরো প্রস্তুতি ছিল না, কিন্তু আন্দোলন চলাকালীন তারা প্রতিটি ধাপ পরিকল্পিতভাবে এগিয়েছে,” বলেন অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে ফিরে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, ফাইল ছবি
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের লক্ষ্যেও ছিল পার্থক্য
অধ্যাপক সাব্বির আহমেদের মতে, নেপালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের লক্ষ্য ছিল খুব স্পষ্ট—দ্রুত নির্বাচন আয়োজন করা।
তিনি বলেন, নেপালে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান নির্বাচনের বাইরে অন্য কোনো ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় ছিলেন না। তার প্রধান লক্ষ্য ছিল নির্বাচন আয়োজন এবং জনগণের ম্যান্ডেট নিশ্চিত করা।
কিন্তু বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের লক্ষ্য নিয়ে শুরু থেকেই কিছুটা অস্পষ্টতা ছিল বলে মনে করেন তিনি।
“বাংলাদেশে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় এসে রাতারাতি দেশকে সুইজারল্যান্ড বানানোর মতো উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করে। কিন্তু সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য কীভাবে এগোতে হবে, সে বিষয়ে তাদের যথেষ্ট প্রস্তুতি ছিল না,” বলেন তিনি।
নেপালে গণঅভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর জনতার উল্লাস, ছবি: কাঠমাণ্ডু পোস্ট
নির্বাচনবিমুখতা ও ঐক্যের অভাব
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আরেক অধ্যাপক মামুন আল মোস্তফা মনে করেন, আন্দোলনের শক্তিকে ভোটে রূপ দিতে না পারার বড় কারণ ছিল আন্দোলনকারীদের মধ্যে লক্ষ্য ও কৌশলের ভিন্নতা।
তিনি বলেন, “নেপালে আন্দোলনকারীদের একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ছিল—আন্দোলনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের মাধ্যমে নির্বাচনে যাওয়া। ফলে যারা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তারা আন্দোলনের আবেগকে নির্বাচনি প্রক্রিয়ার দিকে নিয়ে যেতে পেরেছেন।”
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
আরও পড়ুন
র্যাপার থেকে নেপালের ভোটের মাঠে এগিয়ে: যেভাবে হলো বালেন্দ্রর উত্থান
নেপালে সরকার গঠন করতে চলেছে গণ-অভ্যুত্থানকারীরা
নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন বালেন্দ্র শাহ?
অধ্যাপক মামুনের মতে, আন্দোলনের সময় যে ঐক্য দেখা গিয়েছিল, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা ভেঙে যায়।
“জুলাই-আগস্টে যেভাবে আন্দোলনকারীরা সংগঠিত ছিল, দেড় বছর পর সেই শক্তি বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ফলে জনগণ শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে নিজেদের মতো করে বেছে নিয়েছে,” বলেন তিনি।
অধ্যাপক মামুন আল মোস্তফার মতে, বাংলাদেশের আন্দোলনকারী শক্তিগুলোর মূল লক্ষ্য নির্বাচন ছিল না।
তিনি বলেন, আন্দোলনের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের লক্ষ্য ছিল—কেউ বিপ্লব চেয়েছেন, কেউ মৌলিক সংস্কার, কেউ মাঝারি ধরনের সংস্কার, আবার কেউ ন্যূনতম সংস্কারের পক্ষে ছিলেন।
“কেউ কেউ আবার আমূল পরিবর্তনের কথা বলেছেন, যাকে আমরা র্যাডিক্যাল রিফর্ম বলতে পারি। ফলে আন্দোলনকারী শক্তিগুলোর লক্ষ্য ও কৌশলের মধ্যেই পার্থক্য ছিল,” বলেন অধ্যাপক মামুন আল মোস্তফা।
আরও পড়ুন
র্যাপার থেকে নেপালের ভোটের মাঠে এগিয়ে: যেভাবে হলো বালেন্দ্রর উত্থান
নেপালে সরকার গঠন করতে চলেছে গণ-অভ্যুত্থানকারীরা
নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন বালেন্দ্র শাহ?
নেপালের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন
সেখানে আন্দোলনের পর একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল—নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন ম্যান্ডেট নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, “শুধু আন্দোলন করলেই হবে না, জনগণের সমর্থনও অর্জন করতে হবে—এই বার্তাটি আন্দোলনকারীরা পরিষ্কারভাবে পেয়েছিল। ফলে তারা আন্দোলনের শক্তিকে ভোটের শক্তিতে রূপ দিতে পেরেছে।”
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন, ছবি: সংগৃহীত
এনসিপির ব্যাখ্যা: রাজনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন
নেপাল ও বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে সরলভাবে তুলনা করা ঠিক নয় বলে মনে করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন।
তবে সরকারে যেতে না পারলেও ‘বৈরী’ পরিবেশের মধ্যেও তারা ছয়টি আসন নিয়ে সংসদে যেতে পারাকে রাজনৈতিক অর্জন হিসেবে দেখছে।
মনিরা শারমিন বলেন, ‘বৈরী পরিবেশেও ৩০ জন প্রার্থী নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছি এবং সেখান থেকে ছয়জনকে সংসদে পাঠাতে পেরেছি। আমাদের কাছে এটিই একটি বড় রাজনৈতিক অর্জন। আমরা বিশ্বাস করি, নির্বাচন যদি আরও স্বচ্ছ হতো, তাহলে আরও চার-পাঁচজন প্রার্থীকে সংসদে পাঠানোর সক্ষমতাও আমাদের ছিল।’
নেপালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান, ফাইল ছবি: এএফপি
দুই দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন উল্লেখ করে মনিরা শারমিন বলেন, নেপালে সংবিধান সংস্কারের প্রশ্ন অনেক আগেই সমাধান হয়েছে। ২০১৫–২০১৬ সালে গণপরিষদের মাধ্যমে নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা হয় এবং সেটি জনগণের সমর্থনও পায়। ফলে সেখানে কাঠামোগত সংস্কারের একটি ভিত্তি আগে থেকেই তৈরি ছিল।
বাংলাদেশে সেই বাস্তবতা ছিল না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
‘এখানে সরকার গঠনের পর বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যেই কাজ করতে হয়েছে। কোনো বিপ্লবী সরকার গঠন সম্ভব হয়নি। যদি সেটি সম্ভব হতো, তাহলে নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর পথচলা ভিন্ন হতে পারত,’ বলেন মনিরা শারমিন।
নেতৃত্ব ও অভিজ্ঞতার পার্থক্য
মনিরা শারমিন বলেন, বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের বেশিরভাগই ছাত্ররাজনীতি বা গণঅভ্যুত্থান থেকে উঠে এসেছে এবং তাদের অনেকেই রাজনীতিতে নতুন।
অন্যদিকে নেপালের বর্তমান নেতৃত্বের অনেকেই আগে থেকেই স্থানীয় বা রাষ্ট্রীয় সরকারের অংশ ছিলেন—কেউ মেয়র, কেউ অন্য সরকারি দায়িত্বে। ফলে তাদের সাংগঠনিক ভিত্তি ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা আগে থেকেই ছিল বলে তিনি মনে করেন।
নেপালে গণঅভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন সহযোদ্ধারা, ফাইল ছবি: এএফপি
সহিংসতার মাত্রাও ছিল ভিন্ন
দুই দেশের আন্দোলনের সহিংসতার মাত্রাও ভিন্ন ছিল বলে উল্লেখ করেন মনিরা শারমিন।
তার মতে, নেপালের আন্দোলনে প্রায় ৭২ জন নিহত হলেও বাংলাদেশে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন এবং বহু নিরীহ মানুষ সহিংসতার শিকার হয়েছেন।
এই পরিস্থিতি নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর পথচলাকে আরও কঠিন করে তুলেছে বলে তিনি মনে করেন।
নেপালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কি, ফাইল ছবি: এএফপি
দ্রুত নির্বাচনের দিকে গেছে নেপাল
গত বছরের সেপ্টেম্বরে নেপালে জেন-জি প্রজন্ম ক্ষমতাসীনদের অব্যাহত দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে। একপর্যায়ে কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপালের কে পি শর্মা অলির নেতৃত্বাধীন সরকারের পতন ঘটে।
এরপর সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং দ্রুত নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেন।
দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় পাঁচ মাসের মধ্যেই তিনি নির্বাচন আয়োজন করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্দোলনের শক্তিকে দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক ম্যান্ডেটে রূপ দেওয়ার এই কৌশলই নেপালে নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক উত্থানের পথ তৈরি করে দিয়েছে।
তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর বাংলাদেশে ক্ষমতা গ্রহণ করে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তবে শুরুতেই সংস্কারের দিকে এগোতে থাকে তারা, যা নিয়ে তৈরি হয় নানা রাজনৈতিক মতভেদ।
এমন পরিস্থিতিতে এ বছরের জানুয়ারি মাসে কাঠমান্ডুতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে নেপালের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কার্কি বলেন, নেপালকে কোনোভাবেই বাংলাদেশের পথে হাঁটতে দেওয়া হবে না।
তবে দীর্ঘ ১৮ মাস পর বাংলাদেশেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে অংশ নেয় নতুন রাজনৈতিক শক্তি এনসিপি।
জেপিআই/এমএমএআর