শিশু মেলায় বড়দের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে শিশুরা, অসুস্থ হচ্ছে অনেকে
ঈদুল ফিতরের দ্বিতীয় দিনে রাজধানীর বিনোদনকেন্দ্রগুলোতে মানুষের উপচেপড়া। তবে সব থেকে বেশি ভিড় দেখা গেছে শিশু মেলায়। দীর্ঘ দুই বছর করোনা মহামারির কারণে বিনোদনকেন্দ্রগুলো অনেকটা বন্ধই ছিল। এবার করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে থাকায় ঈদুল ফিতরের জামাতে নামাজ আদায়ের পাশাপাশি সব বিনোদনকেন্দ্রগুলো খোলা রয়েছে।
যে কারণে রাজধানীর প্রতিটি বিনোদনকেন্দ্রেই তিল ধারণের ঠাঁই নেই। শ্যামলী শিশু মেলায় শিশুদের থেকে বড়দের ভিড় বেশি লক্ষ্য করা গেছে। এই শিশু মেলার বর্তমান নাম ডিএনসিসি ওয়ান্ডারল্যান্ড’। ছোট পরিসরের এই বিনোদনকেন্দ্রে আয়তনের তুলনায় কয়েকগুণ দর্শনার্থী দেখা গেছে।
ভিড়ের কারণে অনেক বাচ্চা পরিবারের সদস্যদের হাত ফসকে হারিয়ে যাচ্ছে। আবার অনেক শিশু ভ্যাপসা গরমে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। কেউবা রাইডসের সামনে মানুষের দীর্ঘ সারি হওয়ায় উঠতে পারছে না। ফলে অনেকে শিশু মেলা থেকে ক্ষোভ ও রাগে বের হয়ে যাচ্ছেন।

হাজারীবাগ থেকে বড় ভাইয়ের সঙ্গে রাজধানীর শ্যামলী শিশু মেলায় এসেছে সাদিয়া জাহান। কিন্তু হাজারও মানুষের ভিড়ে বড় ভাইয়ের হাত ফসকে হারিয়ে গেছে সে। এরপরে শিশু মেলার গেটে একা দাঁড়িয়ে কান্না করছে। পরে সাবওয়ের এক দোকানি তাকে উদ্ধার করে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়।
তিনি বলেন, আমি ভাইয়ার সঙ্গে এসেছি। কিন্তু ভাইয়াকে খুঁজে পাচ্ছি না। মেলার মাঝখানে ভাইয়াকে আর দেখছি না। এই বলে কান্না করতে থাকে সাদিয়া।
বুধবার (৪ মে) শ্যামলী শিশু মেলা ঘুরে দেখা গেছে, শুধু সাদিয়া নয় অনেক শিশু তার পরিবারের সদস্যদের হাত থেকে ফসকে অনাকাঙ্খিত হারিয়ে যাচ্ছে। এসব হারিয়ে যাওয়া শিশুকে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য মাইকিংয়ের কোনো ব্যবস্থাপনা নেই।
এমনকি শিশু মেলার অফিসে বারবার ঘুরে সংশ্লিষ্ট কাউকে খুঁজেও পাওয়া যায়নি। আরেকজন ভুক্তভোগী ময়না বেগম। তিনি শিশু আয়ানকে নিয়ে শিশু মেলায় এসেছেন। হাজারো মানুষের ভিড়ে বাচ্চাকে হারিয়ে পাগল প্রায় ময়না বেগম। এরপরে ৩০ মিনিট ধরে খোঁজাখুঁজি করে পেয়েছেন।
ময়না বেগম বলেন, আমার বাচ্চা হারিয়ে গেছিল। এখানে কোনো শৃঙ্খলা নাই। বাচ্চাকে যে খুঁজে পাবো সেই ব্যবস্থাও নাই। মানুষের ভিড়ে বাচ্চা আমার অসুস্থও হয়ে গেছে। প্রায় ৩০ মিনিট পর বাচ্চাকে খুঁজে পেয়েছি। অনেক খোঁজাখুঁজি করেই পরে বাচ্চাকে পেয়েছি। শিশুকে খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রে কেউ সহায়তা করেনি।
হাত ফসকে শুধু শিশু হারিয়ে যাওয়া নয় হাজারও বড়দের ভিড়ে অনেক বাচ্চা অসুস্থও হয়ে গেছে। নগরীর দক্ষিণ খান থেকে শিশুকে নিয়ে সপরিবারে ঘুরতে এসেছেন আরিফ মাহমুদ ও সোহেলি মাহমুদ দম্পতি। তারা ২০০ টাকা দিয়ে টিকিট কেটেছেন।

এরপরে রাইডসে চড়ার জন্য আরও ১০০ টাকা খরচ করেছেন দু’জনে। পরে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে রাইডসে চড়তে পারেননি। এর মধ্যেই মানুষের ভিড়ের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েছে তার শিশু। ফলে কোনো রাইডসে না চড়েই ৩০০ টাকা গচ্চা দেয়াসহ বাচ্চাকে অসুস্থ করে বাড়ি ফিরে গেলেন এই দম্পতি।
আরিফ মাহমুদ বলেন, শিশু মেলায় এমন ভিড় হবে কল্পনার বাইরে ছিল। আগে জানলে আসতাম না। হাজার টাকা সিএনজি ভাড়া ও শিশু মেলায় ৩০০ টাকা লোকসান করে বাড়ি ফিরে যাচ্ছি। সব থেকে বেদনাদায়ক মানুষের ভিড়ে ও ভ্যাপসা গরমে বাচ্চা অসুস্থ হয়ে গেছে। যত দ্রুত বাড়িতে যাব ততই মঙ্গল।
সরেজমিনে দেখা গেছে, শিশু মেলায় প্রবেশ মূল্যই জনপ্রতি ১০০ টাকা। এরপর ভেতরে প্রবেশ করে প্রতিটি রাইডের মূল্য ৫০ টাকা করে। যে কারণে একটা বাচ্চা যদি দশটি রাইডে চড়ে তাহলে তার জন্য প্রায় এক হাজার টাকা খরচ করতে হয়। কারণ বাচ্চারা একা একা রাইডে বসতে পারে না, সঙ্গে বাবা-মা কারো না কারো থাকতে হয়। যে কারণে প্রতিটি রাইডের জন্য মিনিমাম দুইটা টিকিট দরকার হয়।
এ প্রসঙ্গে মোহাম্মদপুর কাটাসুর থেকে আসা মিজানুর রহমান বলেন, এখানে প্রবেশমূল্য অনেক বেশি। এটা একটু কম করলে ভালো। এর থেকে বড় কথা কি পরিমাণে লোক প্রবেশ করানো যাবে তার একটা নিয়মনীতি থাকা দরকার।

বিষয়টি নিয়ে শ্যামলী শিশুমেলা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলেও সেখানে দায়িত্বশীল কাউকে পাওয়া যায়নি। রাইড পরিচালনাকারীদের কাছে জানতে চাইলে তারা বলেন, এ সিদ্ধান্ত তো আমরা জানাতে পারব না। আমাদের পরিচালক আছেন তিনি ভালো বলতে পারবেন।
তবে সাময়িকভাবে হারিয়ে যাওয়ার শিশুদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া ও বাড়তি লোক প্রবেশ করার বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)।
ডিএনসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা (যুগ্ম সচিব) মো. মোজাম্মেল হক জাগো নিউজকে বলেন, সাময়িকভাবে কোনো শিশু মেলায় হারিয়ে গেলে খুঁজে পাওয়ার জন্য আমি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। শিশু মেলাটি ইজারা দেওয়া। এই বিষয়ে ইজারাদারকে পদক্ষেপ নিতে বলবো।
বাড়তি মানুষ প্রবেশ প্রসঙ্গে প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা বলেন, অতিরিক্ত মানুষ প্রবেশের বিষয়ে কোনো নিয়ম-কানুন নেই। যতো লোক প্রবেশ করবে ততোই ইজারাদারদের লাভ। তারপরও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এমওএস/এমআরএম/জিকেএস