বৈশ্বিক মন্দা-ডলার সংকটে উন্নয়ন জোয়ারে ভাটা
ছবি- জাগো নিউজ
ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে ফাইভ-জি প্রযুক্তি চালু করতে চায় রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান টেলিটক। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ২৩৬ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। তবে প্রকল্পের ৮০ শতাংশ যন্ত্রাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হবে। যার জন্য গুনতে হবে ডলার। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটে ব্যয় সংকোচনের জন্য প্রকল্পটি অনুমোদন না দিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছে একনেক। একইভাবে বিদেশি ঋণনির্ভর বা বৈদেশিক আমদানিনির্ভর প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া থেকে বিরত রয়েছে সরকার। বর্তমান প্রেক্ষাপটে যাচাই-বাছাই করে প্রকল্প অনুমোদন দিচ্ছে কমিশন। ২০২২ সালে চোখে পড়ার মতো কোনো মেগা প্রকল্পও অনুমোদন দেওয়া হয়নি।
চলতি বছরের শুরুতে প্রতিটি একনেক সভায় ১০-১২টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হলেও বছরের শেষে তা কমে দাঁড়িয়েছে ছয়টিতে। বছর দেড়েক আগেও প্রকল্প অনুমোদনে প্রতি সপ্তাহে হতো জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠক। এখন প্রতি মাসে হচ্ছে গড়ে একটি। অন্যদিকে একনেকে প্রকল্পও উঠছে খুব কম। ফেরত পাঠানো হচ্ছে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো থেকে আসা অনেক প্রকল্প প্রস্তাব। মূলত সরকারি ব্যয়ে কৃচ্ছ্রসাধন নীতির কারণেই কমছে প্রকল্প অনুমোদন।
এ বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান জাগো নিউজকে বলেন, বর্তমানে আমরা খুব ভেবেচিন্তে প্রকল্প অনুমোদন করছি। যে কারণে প্রকল্পের সংখ্যাও কমছে। আগে নিয়মিত প্রতি মঙ্গলবার একনেক বৈঠক হতো। কিন্তু করোনা পরিস্থিতি এবং এর পরে বৈশ্বিক মন্দাবস্থার কারণে কৃচ্ছ্রসাধন নীতি নিতে হয়েছে সরকারকে। অনেক যাচাই-বাছাই করে প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। জরুরি না হলে অনুমোদন পাচ্ছে না কোনো প্রকল্প। ভেবেচিন্তে প্রকল্প অনুমোদন করছি বলেই আমরা টিকে আছি। এখন বেঁচে থাকার সময়, সাশ্রয় করার সময়। মন্ত্রণালয়-বিভাগ প্রকল্প প্রস্তাব পাঠালেই তা অনুমোদন হবে এমনটি নয়। আমাদের কয়েকটি চেকপোস্ট আছে। সেখানে প্রকল্পগুলো ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করছি। এর পরেই একনেক সভায় প্রকল্প উপস্থাপন করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: ডলার সাশ্রয়ে টেলিটকের ফাইভ-জি স্থগিত
আরও পড়ুন: সাত জলাশয়ের সৌন্দর্যবর্ধনে ৬০ কোটির প্রস্তাব, কমিশনের ‘না’
আরও পড়ুন: ‘আমার গ্রাম-আমার শহর’ বাস্তবায়নে ২৪৫ প্রকল্প
পরিকল্পনা কমিশন জানায়, চলতি অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) থেকে এক লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করা যাবে। আগে প্রতি মঙ্গলবার একনেক বৈঠক হতো। কিন্তু এখন তা আর প্রতি সপ্তাহে হচ্ছে না। সর্বশেষ একনেক বৈঠক হয়েছে গত ২২ নভেম্বর। এরপর আর হয়নি। চলতি অর্থবছরের গত ছয় মাসে মাত্র পাঁচটি একনেক বৈঠক হয়েছে। এসব বৈঠকে অনুমোদন পেয়েছে ৩০টি প্রকল্প। যাতে ব্যয় হবে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। গত অর্থবছরে একনেক বৈঠক হয় ১৮টি। অথচ করোনার আগে প্রতি অর্থবছরে গড়ে ৫০টির মতো একনেক বৈঠক হতো।
চলতি অর্থবছরে বড় কোনো প্রকল্প একনেক সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়নি। যদিও ইভিএম কেনার বড় একটা প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। তবে এটা এখনও অনুমোদন দেওয়া হয়নি। আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কমপক্ষে দেড়শ আসনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করতে চায় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৭১১ কোটি টাকা। প্রতিটি ইভিএমের দাম ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৩৩ হাজার টাকা। ফলে ইভিএম কিনতে খরচ হবে ৬ হাজার ৬৬০ কোটি ২৯ লাখ টাকা। এছাড়া জমিসহ দশটি ওয়্যারহাউজ নির্মাণে খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ৭৭ কোটি টাকা। সবমিলিয়ে প্রকল্পের মোট ব্যয় ৮ হাজার ৭১১ কোটি ৪৪ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
একনেক বৈঠক সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রায় ১১ হাজার ২১১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০টি প্রকল্প অনুমোদন দেয়। এরপর ২৫ জানুয়ারি প্রায় ৪ হাজার ৬২১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০টি প্রকল্প অনুমোদন দেয় একনেক। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৩ হাজার ৫৫ কোটি ২১ লাখ এবং বৈদেশিক অর্থায়ন এক হাজার ৫৬৬ কোটি ১৩ লাখ টাকা। পরে ৮ ফেব্রুয়ারি একনেক বৈঠকে ৩৭ হাজার ৫০৭ কোটি ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে ১১টি প্রকল্প অনুমোদন করা হয়।
আরও পড়ুন: তিন প্রকল্পে বদলে যাবে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি
আরও পড়ুন: থোক বরাদ্দ ৫ হাজার কোটি, মেয়াদ শেষ হচ্ছে ৫৫২ প্রকল্পের
আরও পড়ুন: মেয়াদ শেষেও ইউজিসির ৩ প্রকল্পের অগ্রগতি শূন্য
২২ ফেব্রুয়ারি অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রায় ৮ হাজার ৮০৪ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০টি প্রকল্প অনুমোদন দেয়। এরপর ২২ মার্চ প্রায় ১৫ হাজার ৭৪৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ব্যয়ে অনুমোদন পায় ১২টি প্রকল্প। পরে ৫ এপ্রিল একনেক বৈঠকে প্রায় ১২ হাজার ১৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ১২টি প্রকল্প অনুমোদন পায়।
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠক
এপ্রিলে আরও একটি একনেক বৈঠক হয়। ১৯ এপ্রিলের ওই বৈঠকে প্রায় ৪ হাজার ৫৪১ কোটি ৮১ লাখ টাকা ব্যয়ে ১১টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর ১০ মে প্রায় ৫ হাজার ৮২৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ১১টি প্রকল্প অনুমোদন করে একনেক। পরে ১৪ জুন একনেক বৈঠকে ১০ হাজার ৮৫৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয় সম্বলিত ১০টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। একই মাসে (২৮ জুন) দুই হাজার ২১৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০টি প্রকল্প অনুমোদন করে একনেক।
চলতি অর্থবছরের ৯ জুলাই একনেক বৈঠকে ১৫ হাজার ৮৫৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৮টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। ২ আগস্ট অনুমোদন পায় দুই হাজার ৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয় সম্বলিত ৭টি প্রকল্প। এরপর ১৬ আগস্ট দুই হাজার ৫০৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ছয়টি প্রকল্প অনুমোদন করে একনেক। ৮ নভেম্বর একনেক সভায় অনুমোদন পাওয়া ৭টি প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয় ৩ হাজার ৯৮১ কোটি ৯০ লাখ টাকা। সবশেষ ২২ নভেম্বর একনেক বৈঠকে ৪ হাজার ৮২৬ কোটি ২১ লাখ টাকা ব্যয়ে ৮টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়।
অনুমোদিত ৬৩৬টি প্রকল্পের ২৫ শতাংশ বরাদ্দ স্থগিত
বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে চলতি অর্থবছরের শুরুতেই কৃচ্ছ্রসাধন নীতি গ্রহণ করে সরকার। চলতি অর্থবছরের শুরুতেই গুরুত্ব অনুসারে প্রকল্পগুলোকে তিন শ্রেণিতে ভাগ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর ভিত্তিতে গত আগস্টে প্রকল্প পুনর্বিন্যাস করে পরিকল্পনা কমিশন।
আরও পড়ুন: তিন মাসে এডিপির লাখ কোটি টাকা খরচের লক্ষ্য
আরও পড়ুন: পাঁচ মাসেও খরচের খাতা খুলতে পারেনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
আরও পড়ুন: পাঁচ মাসে ৯ হাজার ৭১৩ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি
নতুন বিন্যাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোকে ‘এ’ শ্রেণিভুক্ত করা হয়। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন অব্যাহত আছে। এ ধরনের ৬৪৬টি প্রকল্প রয়েছে ‘এ’ শ্রেণিতে। গুরুত্বের দিক থেকে মধ্যম পর্যায়ের প্রকল্পগুলোকে ‘বি’ শ্রেণিতে ফেলা হয়েছে। এ ধরনের প্রকল্প আছে ৬৩৬টি। সরকারি অংশের ২৫ শতাংশ বরাদ্দ স্থগিত রাখা হয়েছে এসব প্রকল্পে। আর ‘সি’ শ্রেণিতে থাকা প্রকল্পের পুরো টাকার ছাড় আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। এই শ্রেণির প্রকল্পের সংখ্যা ৮৫টি। সব মিলিয়ে এক হাজার ৪৯৬টি প্রকল্পের বিপরীতে চলতি অর্থবছরে এডিপিতে মোট বরাদ্দের পরিমাণ দুই লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা।
বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে নিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, বেশি প্রকল্প নিলে সেগুলো সঠিক সময়ে বাস্তবায়ন হয় না। এছাড়া প্রকল্প ঝুলিয়ে রাখলে সরকারের টাকা অপচয় হয়। ফলে সাশ্রয় করতেই সরকার কম প্রকল্প গ্রহণ করছে বলে দাবি অর্থনীতিবিদদের।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, বেশি প্রকল্প অনুমোদন দিলে বাস্তবায়ন হয় না। সরকারের এডিপি বাজেট অনেক সময় ভাগ হয়ে যায়। প্রকল্পের সময় বেড়ে যায়। ফলে দেখা যায় অনেক প্রকল্প ৭ থেকে ৮ বছর ধরে বাস্তবায়ন হচ্ছে। এতে সরকারের অর্থের অপচয় হচ্ছে। বর্তমানে বৈশ্বিক মন্দা চলছে। এ অবস্থায় অর্থের অপচয় রোধ করতেই সরকার ভেবেচিন্তে প্রকল্প গ্রহণ করছে।
এমওএস/কেএসআর/এএসএম