চাহিদা মাফিক চামড়া আসেনি আতুরার ডিপোতে
# ২৫০-৩০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে বেশির ভাগ চামড়া
# পরিবহন ভাড়া আর ফড়িয়াদের পেটে চামড়ার দাম
কোরবানিতে চট্টগ্রামের আড়তগুলোতে প্রায় সাড়ে তিন লাখ চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্য থাকলেও চাহিদা মাফিক চামড়া আসেনি আতুরার ডিপোতে। চট্টগ্রামে চামড়া প্রক্রিয়াজাত করার বেশিরভাগ গুদাম রয়েছে আতুরার ডিপোতে। কোরবানির যেসব চামড়া এসেছে তার বেশিরভাগই আড়তদাররা কিনেছেন ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায়। গুদামগুলোতে বড় আকারের চামড়া ৫০০ টাকাতে কিনলেও এ টাকার অর্ধেকও পাননি কোরবানি দাতারা। চামড়া সংগ্রহ করে আতুরার ডিপোতে আনা পর্যন্ত পরিবহন ভাড়া আর পকেট ভারি হয়েছে মৌসুমী ফড়িয়া ব্যবসায়ীদের।
বৃহস্পতিবার (২৯) জুন দুপুরের পর নগরীর বিভিন্ন স্থানের সড়কের পাশে চামড়া জড়ো করে মৌসুমী ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে নগরীর বহদ্দার হাট, কাতালগঞ্জ, চকবাজার, আন্দরকিল্লা, কোতোয়ালী মোড়, সদরঘাট, কাজির দেউড়ি, লালখান বাজার, দেওয়ান হাট, চৌমুহনী, আগ্রাবাদ, আলকরণ, মাঝিরঘাট, বড়পোল, বিশ্বরোড নয়া রাস্তার মাথা, সরাইপাড়া, পাহাড়তলী, আকবর শাহ এলাকার সড়কে কাঁচা চামড়ার স্তূপ জমে। বিকেলের পর থেকে আতুরার ডিপোতে চামড়া নিয়ে আসতে শুরু করেন ব্যবসায়ীরা। এখানকার আড়তদাররা বিকেল ৩টা থেকেই চামড়ায় লবণ দিয়ে সংরক্ষণ শুরু করেছেন।
বৃহস্পতিবার বিকেল চারটার দিকে হামজারবাগ ও আতুরার ডিপো এলাকায় দেখা গেছে, রাস্তার পাশে সারি সারি চামড়া স্তুপ। গুদাম মালিকরা এসব চামড়া কিনছেন। একই সঙ্গে কয়েকশ শ্রমিক চামড়া প্রক্রিয়াজাত করার কাজে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। কারোর কথা বলার ফুরসত নেই। কেউ চামড়ার উচ্ছিষ্ঠ মাংস পরিষ্কার করছেন, কেউ কান কাটছেন, কেউ কাটছেন চামড়া সাথে থাকা গরুর লেজের গোড়ালির মাংস। সবশেষে চামড়ায় লবণ দেওয়ার কাজেও ব্যস্ত রয়েছে অনেকে।
রাঙ্গুনিয়া থেকে চাঁদের গাড়ি করে ২২০টি চামড়া নিয়ে আতুরার ডিপোতে এনেছেন আবদুল আজিজ। তিনি জাগো নিউজকে বলেন- রাঙ্গুনিয়া গোডাউন এলাকা থেকে চামড়াগুলো আনতে তিন হাজার টাকা গাড়ি ভাড়া দিতে হয়েছে। ওখানেও ভ্যান ভাড়া লেগেছে দুই হাজার টাকার মতো। চামড়াগুলো বাড়ি বাড়ি গিয়ে কিনতে হয়েছে। আমরা চামড়া ভেদে দেড় থেকে দুইশ টাকায় চামড়া কিনেছি। কিন্তু এখানে গুদামগুলো ২৩০-২৪০ টাকায় কিনতে চাইছে। অথচ আমরা তিনজন মানুষের বেতনও তিন হাজার টাকা রয়েছে। এখন দেখি এসব চামড়া বিক্রি করে আমাদের লোকসান দিতে হবে।
হালিশহর থেকে এক পিকআপ চামড়া নিয়ে আসা আবুল কাসেম মিয়াজি বলেন, এবার ১০০-৩০০ টাকা পর্যন্ত চামড়া কিনেছি। এখানে একটি গুদামে ২৫০ টাকা, আরেকটি গুদামে অনেক দরদাম করে ২৮০ টাকা করে চামড়াগুলো বিক্রি করেছি। তিনি বলেন, আমি ৩৭৫টি চামড়া এনেছি। গাড়ি ভাড়া, দুইজন লেবারের মজুরি দিয়ে এখন কোন লাভ থাকছে না।
বন্দরটিলা এলাকা থেকে আসা কাউছার আলম বলেন, আমরা বড় চামড়া কিনেছি। প্রত্যেকটি চামড়া তিনশ টাকার বেশিতে কেনা। সাড়ে চারশ টাকা করে বিক্রি করেছি। এখানে গুদাম মালিকদের সিন্ডিকেট রয়েছে। তাই আতুরার ডিপোতে চামড়া আনলে বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করে দিতে হয়।
কম দামে সিন্ডিকেট করে চামড়া কেনার অভিযোগ মানতে নারাজ চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ীরা। বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সহ-সভাপতি আবদুল কাদের সরকার জাগো নিউজকে বলেন, আমরা ১২শ টাকাতেও চামড়া নিয়েছি। ২০০-৩০০ টাকায় চামড়া কেনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যেসব চামড়া দুইশ-তিনশ টাকার সেগুলো দুইশ তিনশ টাকায় কিনেছি। চামড়া হিসেব করা হয় বর্গফুট হিসেবে। আবার গ্রাম থেকে আসার চামড়াগুলোতে কাটা থাকে বেশি।
তিনি বলেন, এ বছর সাড়ে তিন লাখ চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্য রয়েছে। কিন্তু কোরবানির দিন চাহিদা মাফিক চামড়া আসেনি। কারণ চামড়া যাতে পচে না যায় সেজন্য বিভিন্ন উপজেলাতে চামড়া লবণ দেওয়া হচ্ছে। ওখানেও আমাদের লোকজন আছে। আশা করছি সামনের সপ্তাহে এসব চামড়া আমাদের কাছে চলে আসবে।
এদিকে ২৫ জুন সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে চামড়ার মূল্য নির্ধারণ ও সুষ্ঠু ব্যাবস্থাপনা সংক্রান্ত সভায় চামড়ার দাম ঘোষণা করেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। ঘোষণা অনুযায়ী ট্যানারি ব্যবসায়ীদের এবার ঢাকায় লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়া কিনতে হবে ৫০ থেকে ৫৫ টাকায়। ঢাকার বাইরে লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম হবে ৪৫ থেকে ৪৮ টাকা। গত বছর ঢাকায় এ দাম ছিল ৪৭ থেকে ৫২ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ছিল ৪০ থেকে ৪৪ টাকা ছিল। এছাড়া সারা দেশে লবণযুক্ত খাসির চামড়া গত বছরের মতই প্রতি বর্গফুট ১৮ থেকে ২০ টাকা, আর বকরির চামড়া প্রতি বর্গফুট ১২ থেকে ১৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে গত কয়েকবছর ধরে কাঁচা চামড়া নিয়ে সমালোচনার অন্ত নেই। ৫-৭ বছর আগেও কোরবানির যেই চামড়া হাজার টাকার উপরে বেচা যেত এখন সেই চামড়া দুই থেকে তিনশ টাকার ওপরে বিক্রি হচ্ছে না। তাছাড়া এবার লবণের দাম বেশি হওয়ায় কাঁচা চামড়া সংগ্রহে প্রভাব পড়ছে বলে জানিয়েছে কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীরা।
এমডিআইএইচ/এমআইএইচএস