ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. মতামত

অতৃপ্ত আত্মা যেন আমাদের জীবনকে চালিত না করে

শাহানা হুদা রঞ্জনা | প্রকাশিত: ০৯:৫৩ এএম, ২১ জানুয়ারি ২০২৬

পথে যেতে যেতে দেখলাম একজন দরিদ্র মা একটা পুতুল হাতে নিয়ে তার ছোট বাচ্চাটিকে সাথে খেলছেন। হয়তো এই পুতুলটা সচ্ছল ঘরের কোনো শিশু ফেলে দিয়েছিল, মা সেটাই কুড়িয়ে এনেছেন তার সন্তানের জন্য। ফুটপাতে ময়লার পাশে বসেও মা, মেয়ে দুজনের মুখেই হাসি। দেখে খুব কষ্ট হলেও একধরনের ভালবাসা জাগলো মনে। নানাধরনের অপ্রাপ্তির ভেতরে বসবাস করেও যখন দেখি, একজন মা ছেঁড়া কাঁথার উপরে বসে সন্তানকে আনন্দ দেয়ার চেষ্টা করছেন, তখন নিজের অজান্তেই মনেহয় মানুষ আসলে খুব সামান্য কিছু পেয়েই সুখী হওয়ার চেষ্টা করে।

যখন দেখি নগরের জীর্ণ বস্তিতে বসে মা তার সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করছেন, একজন প্রতিবন্ধী মানুষ ট্রাফিক পুলিশের হাত ধরে রাস্তা পার হচ্ছেন, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মেয়েটি সবকিছুকে পরাজিত করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখতে পারে, হাঁটতে না পারা ছেলেটি যখন মায়ের কোলে চেপে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিতে যায়, রিকশা টেনেও একজন বাবা যখন তার সন্তানকে ডাক্তার বানাতে পারেন, তখন তাঁদের পাশাপাশি নিজেকেও সুখী মনেহয়। মনেহয়, অনেককিছুর হিসেব না মিলিয়েও তো কখনো কখনো সুখী হওয়া যায়।

পরিচিতদের মধ্যে অনেককেই জানি, যাদের টাকা-পয়সা সব আছে, বাড়ি-গাড়িও আছে কিন্তু মনে সুখ নেই, চোখে ঘুম নেই। বিভিন্নধরনের পারিবারিক অশান্তি তাদের তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। হয়তো সন্তান মানুষ হয়নি, ঘরে ঝগড়াঝাটি লেগেই আছে, কোনো প্রিয়জন দুরারোগ্য ব্যধিতে আক্রান্ত। আবার ব্যবসা বা চাকরি নিয়েও অশান্তি লেগেই আছে।

এর পাশাপাশি আছে দেশের পলিটিক্যাল অস্থিরতা, বাণিজ্যে মন্দা, নিরাপত্তাহীনতা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও মব সন্ত্রাস ইত্যাদি। এই নেতিবাচক পরিস্থিতি কারো একার সুখ কেড়ে নেয়না, সমষ্টিকে কষ্টে রাখে। দরিদ্র যে মানুষগুলোর কথা বললাম তাদের ব্যক্তিগত অপ্রাপ্তি এত বেশি যে সমাজের দুঃখ-কষ্ট তাদের সেভাবে স্পর্শ করার সুযোগ পায় না।।

বিখ্যাত দার্শনিক, শিক্ষক ও রাজনীতি বিষয়ক তাত্তি¡ক কনফুসিয়াস সুখী জীবনের জন্য খুব সাধারণ কিছু সূত্র দিয়েছেন। তিনি মনে করতেন, শাসকেরা এমন উদাহরণ সৃষ্টি করবে, যাতে সাধারণ জনগণ একে অন্যের প্রতি সদাচারে উৎসাহী হবে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কথাটি উনি বলেছেন তা হলো ”যা আপনি যে আচরণ নিজের জন্য প্রত্যাশা করেন না, তা অন্যেও প্রতিও করবেন না।”

সুখী হওয়ার জন্য তিনি আরো পাঁচটি উপায়ের কথা বলেছিলেন কনফুসিয়াস এবং সেগুলোর নাম দিয়েছিলেন ‘পাঁচ সদ্গুণ’। তিনি মনে করতেন, সুখী এবং অর্থময় (মিনিংফুল) জীবনের জন্য পাঁচ গুণের প্রতিটিই খুব গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো হচ্ছে সততা এবং ন্যায়পরায়ণতা, সদাচার ও ভদ্রতা, দানশীলতা ও মানবতা, জ্ঞান ও শিক্ষা এবং বিশ্বস্ততা ও আনুগত্য।” (সূত্র: প্রথম আলো)

২০২৫ সালের বিশ্ব সুখ ইনডেক্সে টানা অষ্টম বারের মতো ফিনল্যান্ড বিশ্বের সবচেয়ে সুখী দেশ হিসেবে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে, এরপরই আছে ডেনমার্ক, আইসল্যান্ড ও সুইডেন। এই সুখের ইনডেক্স মূলত সামাজিক সমর্থন, জীবনযাত্রার মান এবং দুর্নীতির মাপকাঠির মতো বিষয়গুলোর উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে।

”সুখীতম দেশ” হিসেবে শিরোপা পাওয়ার পর ফিনল্যান্ডবাসী খুব আনন্দিত হয়েছে সত্যি, কিন্তু তারা মনে করেন এক্ষেত্রে 'সুখ' সঠিক শব্দ নয়। এর পরিবর্তে 'তৃপ্তি', 'পরিপূর্ণতা' বা 'জীবনযাপনে সন্তুষ্টির মতো শব্দগুলোকে আরও বেশি মানানসই বলে মনে করেন তারা।

সুখী মানুষের জামা গায়ে দেওয়া মানুষ ছিলেন আমার বাবা। অনেক অপ্রাপ্তি ও দুঃখ কষ্টেও আব্বা বলতেন, সুখী হতে চাইলে উপরের দিকে দেখবে না। কার, কী আছে, তা নিয়ে ভাববে না। ভাববে তোমার চেয়েও কষ্টে আছেন অনেক মানুষ। এরপরেও তারা জীবন চালিয়ে নিচ্ছেন। তখন দেখবে নিজেকে সুখী মনে হবে। তাই কবিগুরুর ভাষায় বলতে চাই, ”কী পাই নি? তারি হিসাব মিলাতে মন মোর নহে রাজি।”

আখুনিক বিশ্বে জনকল্যাণের সাথে জড়িত যে বিষয়ের উপর নির্ভর করে এই সুখের মান নির্ধারণ করা হয়, এর সাথে খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে দেওয়া কনফুসিয়াসের সদ্গুণের অদ্ভুত মিল লক্ষ্য করছি। যদিও কোনো মানুষ বা কোনো দেশ সবসময় সুখী হতে পারে না। তার চারপাশের পরিবেশ ও বিশ্ব পরিস্থিতি কখনো কখনো সুখে থাকার বিষয়টিকে কঠিন করে তোলে। শুধু নিজে সুখে থাকাটাই শেষ কথা নয়, সবাইকে নিয়ে ভালো থাকাটাই মুখ্য। তবে একটি দেশের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা, সমতা, প্রকৃতি, মূল্যবোধ, মানুষের ব্যবহার ও সততা অবশ্যই সুখী হওয়ার জন্য মূল বিষয়।

অন্য দেশের সুখের কথা শুনতে শুনতে দেখতে পেলাম সুখী দেশের তালিকায় আরও পাঁচ ধাপ পিছিয়েছে আমার দেশ। এ বছর ১৩৪তম অবস্থানে নেমে গেছে বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে কেবল আফগানিস্থানের অবস্থান বাংলাদেশের পেছনে। এ বছর তালিকায় থাকা ১৪৭টি দেশের মধ্যে সবার শেষে রয়েছে আফগানিস্তান, যা একটি অচল দেশ বলে পরিচিত।

আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে সততা, ন্যায়পরায়ণতা, সদাচার, ভদ্রতা, দানশীলতা, মানবতা, জ্ঞান, শিক্ষা এবং বিশ্বস্ততা ও আনুগত্য এগুলো আগের তুলনায় কমেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমাদের অবস্থান ক্রমশ নিম্নমুখী।

আমরা নিজের দেশকে আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন উন্নত দেশ বা জাপান-চীনের মতো সাফল্যকে সবসময় অর্থনৈতিক অর্জনের সঙ্গে তুলনা করতে চাই না। যদিও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অবশ্যই সুখী হওয়ার একটি বড় উপাদান। তবে সুখী হওয়ার জন্য এরচাইতেও শক্তিশালী উপাদান হচ্ছে প্রাপ্তির সমতা ও সন্তুষ্টি। আমরা যদি দেশের মানুষের কল্যাণ, বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষাটা পেতাম এবং দুর্নীতি হটাতে পারতাম, তাহলে একবেলা মোটা ভাত খেয়েও সুখী মনে করতাম।

তুলনামূলক বিচারে বলতে পারতাম যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা, সিরিয়া, ইরাক, ইরান বা আফ্রিকার দারিদ্র্যপীড়িত দেশগুলোর চাইতে আমরা ভালো আছি। দেশে যদি নিরাপত্তা ও জীবনধারণের ন্যূনতম নিশ্চয়তা থাকতো, তাহলে হয়তো দরিদ্র মানুষও কিছুটা সুখের দেখা পেতো।

বাংলাদেশে রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার ও ব্যক্তিজীবনে সততার এত অভাব যে দেশ দুর্নীতিতে সেরা হয়ে আছে বছরের পর বছর। এখানে ন্যায়-নীতির কথা শোনা বা বলা বোকামির পর্যায়ে পড়ে। মানবতা কমতে কমতে এখন মবের রাজত্ব শুরু হয়েছে। জ্ঞান-শিক্ষায় আমরা পিছিয়ে পড়ছি। সাধারণ মানুষের জন্য বেসরকারি উদ্যোগে অ-বাণিজ্যিক হাসপাতাল, স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় নেই, নেই চ্যারিটি। নিরাপত্তাহীন ও ভীতিকর পরিবেশ নারী-পুরুষ সবাইকে কোণঠাসা করেছে।

সে যাক, পত্রিকার খবরে প্রকাশ অন্তর্বর্তী সরকার আসার পরেও দেশে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে। কোটিপতি বেড়েছে বলে সুখের ইন্ডিকেটর বেড়েছে, তা কিন্তু নয়। বরং উল্টোটাই হয়েছে। কোটিপতির সংখ্যা দিয়ে কি সুখ অর্জন করা সম্ভব? যদি সুখ অর্জন করা সম্ভব হতো, তাহলেতো বাংলাদেশের অবস্থান শেষে থাকতো না।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গুণগত মান না বাড়ায় সমাজের একটি শ্রেণির কাছেই বেশি সম্পদ ও অর্থ কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ছে। আর দেশের অধিকাংশ মানুষ জীবন-জীবিকার টানাপড়েনে খাবি খাচ্ছে। মধ্যবিত্তরা দরিদ্র হচ্ছেন, দরিদ্ররা দরিদ্রতর হচ্ছেন। দেশের টাকার বড় অংশটাই চলে যাচ্ছে ধনীর পকেটে।

কোটিপতির সংখ্যা বাড়াটা সাধারণত কোনো দেশের জন্যই সুখের না হলেও, উন্নয়নের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হয়। তবে একই সময়ে যদি মানুষের মধ্যে বৈষম্য বাড়তে থাকে তাহলে অবশ্যই এই উন্নয়ন ইতিবাচক প্রভাবের তুলনায় নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে। ঠিক এটাই ঘটছে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে।

সরকার সবসময়ই প্রবৃদ্ধির কথা বলে কিন্তু এই প্রবৃদ্ধি থেকে যে টাকা আসছে তার সুষম বণ্টন হচ্ছে না। যে আয় যোগ হচ্ছে, তা শতকরা মাত্র ৫ জন মানুষের হাতে আসছে। সেই পাঁচ ভাগ মানুষ প্রতিবছর আরো বড়োলোক হচ্ছেন। এরা সুখ কিনে নেয়ার চেষ্টা করছেন। বাকি ৯৫ শতাংশের কাছে সেই টাকা আর পৌঁছে না। তাদের পক্ষে আর সুখ কেনাও হয় না।

বিশিষ্ট ব্যাংকার ইব্রাহিম খালেদ বলেছিলেন, ”নরওয়ে, ডেনমার্ক, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড হলো সুষম বণ্টনের দেশ। সবচেয়ে অসম বণ্টনের দেশ হলো আমেরিকা। আমরা আমেরিকার মডেল অনুসরণ করছি। তাই স্বাভাবিকভাবেই গরীব আরো গরীব হচ্ছে।” এই কথার সূত্র ধরেই তাই হয়তো দেখতে পারছি সুখী দেশগুলোর তালিকায় সুষম বণ্টনের দেশগুলো এগিয়ে থাকলেও, আমেরিকা ধনী দেশ হওয়া সত্তে¡ও এর অবস্থান অনেক পেছনে। কারণ সে দেশেও বণ্টন অসম।

আমাদের দেশে সম্পদের অসম বণ্টনের কারণেই সমাজের একটা ক্ষুদ্র অংশের হাতে টাকা এবং তাদের জীবন চরম ভোগবাদিতায় পূর্ণ। আর অন্যদিকে বড় একটি অংশের অভাব-অনটন, অপ্রাপ্তি সমাজে বড় রকমের অসন্তোষ তৈরি করছে। অধিকাংশ মানুষের ক্ষোভ, দুঃখ, কষ্ট, আশাহীনতা- একটি দেশকে সুখী দেশ বানাতে পারেনা। আর মনের এই সুখহীনতা থেকেই বাড়ে অপরাধ, হতাশা, মাদক, যৌনতা এবং সর্বোপরি দুর্নীতি। আর তাই সম্পদের অসম বণ্টনের কারণে দেশের অধিকাংশ নাগরিক যখন অসুখী হন, তখন তা মেটানোর দায়িত্ব হওয়া উচিৎ সরকারের।

মাঝেমাঝে সুখ আসে কম চাহিদা ও বেশি তৃপ্তি থেকে। বেশি অর্থ, বেশি প্রাপ্তি ঘটলেই যে বেশি সুখ হবে এই ধারণা ভুল। তবে দেশের অর্ধেক মানুষের হাতে প্রয়োজনের তুলনায় অর্থ সম্পদ যদি অনেক কম থাকে, তাহলেও সুখ পাওয়া কঠিন। তাই সুখী হওয়ার জন্য সবসময় সম্পদ ও সুবিধাদির সমবণ্টনের উপর জোর দেয়া হয়। জোর দেয়া হয় ন্যায্যতার এবং লৈঙ্গিক বৈষম্য ঘুচানোর উপর। অতৃপ্ত আত্মা যদি প্রতিনিয়ত জীবনকে চালিত করে, তাহলে সুখ আরো দূরে চলে যেতে বাধ্য হয়।

সুখী মানুষের জামা গায়ে দেওয়া মানুষ ছিলেন আমার বাবা। অনেক অপ্রাপ্তি ও দুঃখ কষ্টেও আব্বা বলতেন, সুখী হতে চাইলে উপরের দিকে দেখবে না। কার, কী আছে, তা নিয়ে ভাববে না। ভাববে তোমার চেয়েও কষ্টে আছেন অনেক মানুষ। এরপরেও তারা জীবন চালিয়ে নিচ্ছেন। তখন দেখবে নিজেকে সুখী মনে হবে। তাই কবিগুরুর ভাষায় বলতে চাই, ”কী পাই নি? তারি হিসাব মিলাতে মন মোর নহে রাজি।”

২০ জানুয়ারি, ২০২৬

লেখক : যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক।

এইচআর/এমএস