ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. মতামত

দম্ভ নয়, সেবার মানসিকতাই হোক রাষ্ট্র পরিচালনার মূলমন্ত্র

ড. হারুন রশীদ | প্রকাশিত: ১০:৪২ এএম, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের জনগণ তাদের রায়ের প্রতিফলন ঘটিয়েছে। এই নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে ধারণ করে একটি 'নতুন বাংলাদেশ' গড়ার আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপির নতুন সরকার যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে, তখন তাদের সামনে পাহাড়সম চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি রয়েছে কোটি মানুষের বিশাল প্রত্যাশা।

সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধীদলের কার্যকর ভূমিকা দেখতে চায় মানুষজন। সংসদীয় গণতন্ত্রে তারা ছায়া সরকারের ভূমিকা পালন করে। গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে সরকারের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিয়ে ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সরকারি দলকেও বিরোধীদলের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ পরিহার করে সহনশীল আচরণ করতে হবে।

গতকাল শনিবার বিকেলে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত বিএনপির নির্বাচনোত্তর সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে কিছুটা আঁচ পাওয়া গেছে।

ওই সংবাদ সম্মেলনে দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, ভবিষ্যতে আর কেউ যেন স্বৈরাচার হয়ে উঠতে না পারে এ জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।

সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় এবং তাৎক্ষণিক প্রত্যাশা হলো দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের উপরে থাকায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ দিশেহারা। তাই নিত্যপণ্যের দাম কমানো, সিন্ডিকেট দমন এবং বাজার মনিটরিং নিশ্চিত করা নতুন সরকারের জন্য হবে প্রথম পরীক্ষা। একইসাথে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানো এবং খেলাপি ঋণ আদায়ের মাধ্যমে ভঙ্গুর অর্থনীতিকে সচল করার দাবি এখন সর্বজনীন।

দশকব্যাপী দুঃশাসনের অভিজ্ঞতা থেকে মানুষ এখন চায় একটি জবাবদিহিতামূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা। দুর্নীতি, চাঁদাবাজি এবং পেশিশক্তির রাজনীতি চিরতরে বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষের হয়রানি বন্ধ করা জরুরি। 'যার কাজ তার কাছে'—এই নীতিতে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ এবং পদোন্নতি নিশ্চিত করার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করার প্রত্যাশা এখন প্রবল।

নির্বাচন পরবর্তী সময়ে সহিংসতা ও প্রতিহিংসার রাজনীতি রোধ করা নতুন সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। মানুষ একটি শান্তিময় পরিবেশ চায় যেখানে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং সাধারণ নাগরিকরা নির্ভয়ে তাদের মত প্রকাশ করতে পারবে। মব ভায়োলেন্স বা গণপিটুনি রোধ এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি। নতুন বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় বর্তমানে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে 'মব কালচার' বা আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা। বিচারবহির্ভূত এই সহিংসতা শুধু মানবাধিকারেরই লঙ্ঘন নয়, বরং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতাকেও চ্যালেঞ্জ করে।

দশকব্যাপী দুঃশাসনের অভিজ্ঞতা থেকে মানুষ এখন চায় একটি জবাবদিহিতামূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা। দুর্নীতি, চাঁদাবাজি এবং পেশিশক্তির রাজনীতি চিরতরে বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষের হয়রানি বন্ধ করা জরুরি। 'যার কাজ তার কাছে'—এই নীতিতে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ এবং পদোন্নতি নিশ্চিত করার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করার প্রত্যাশা এখন প্রবল।

সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, নতুন সরকার মব ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' নীতি গ্রহণ করবে। গুজব ছড়িয়ে উসকানিদাতাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা এবং প্রতিটি ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। বাংলাদেশ পুলিশ-কে পেশাদারিত্বের সাথে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর সক্ষমতা অর্জন করতে হবে, যাতে মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে প্রশাসনের ওপর আস্থা রাখতে পারে। আইনের শাসনের প্রকৃত স্বাদ পেতে হলে রাজপথের বিচার বন্ধ করে আদালত ও আইনি প্রক্রিয়ার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করাই হবে নতুন সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

অধিকাংশ মব ভায়োলেন্স শুরু হয় সোশ্যাল মিডিয়ার গুজব থেকে। সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় এবং বিটিআরসি (BTRC)-কে সক্রিয় থেকে ফ্যাক্ট-চেকিং জোরদার করতে হবে এবং উসকানিমূলক পোস্টদাতাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।

দম্ভ নয়, সেবার মানসিকতাই হোক রাষ্ট্র পরিচালনার মূলমন্ত্র

পাড়া-মহল্লায় মাইকিং, লিফলেট এবং মিডিয়ার মাধ্যমে প্রচার করতে হবে যে, গণপিটুনি একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। ধর্মীয় উপাসনালয় (মসজিদ, মন্দির) থেকে উসকানিমূলক কাজ বন্ধের আহ্বান জানাতে হবে।

মানুষ তখন আইন হাতে তুলে নেয় যখন তারা মনে করে অপরাধী পার পেয়ে যাবে। তাই আইনি প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও দীর্ঘসূত্রতামুক্ত করতে হবে যাতে নাগরিকরা বিচার ব্যবস্থার ওপর ভরসা পায়। সংবেদনশীল এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়াতে হবে যাতে আক্রমণকারীদের সহজেই শনাক্ত করা যায়।

জুলাই বিপ্লবের মূল কারিগর ছিল তরুণ সমাজ। তাই তাদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আইটি খাতের উন্নয়ন এবং শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন জনগণের বড় প্রত্যাশা। বিশেষ করে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত শিক্ষাঙ্গন এবং গবেষণার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা অত্যাবশ্যক।

বিগত সময়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠা জরুরি। "সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়"—এই মূলনীতিতে ভর করে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি এবং প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ দেখতে চায় জনগণ।

দ্রব্যমূল্য কমাতে হলে প্রথমেই আমদানিকারক ও পাইকারি বাজারের অদৃশ্য 'সিন্ডিকেট' ভাঙতে হবে। পাশাপাশি টিসিবি (TCB)-এর মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে পণ্য সরবরাহ বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস কমাতে হবে।

আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে একটি স্বাধীন 'ব্যাংকিং কমিশন' গঠন করা জরুরি। যারা বড় বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেবে এবং পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাথে কাজ করবে। বাংলাদেশ ব্যাংক-কে সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে।

প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করতে 'সার্ভিস রুলস' কঠোরভাবে অনুসরণ করা দরকার। বদলি বা পদোন্নতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, মেধাকে প্রাধান্য দিতে হবে। এছাড়া সব সেবা অনলাইন বা ডিজিটাল বাংলাদেশ-এর আদলে সহজতর করলে দুর্নীতি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতির জন্য পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। বিচার বিভাগ-কে নির্বাহী বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিলে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচারের ভরসা পাবে।

বিদেশী বিনিয়োগ (FDI) আকর্ষণের জন্য গ্যাস-বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান এবং ওয়ান-স্টপ সার্ভিস নিশ্চিত করতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (SME) জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করলে বেকারত্ব দ্রুত কমবে।

জুলাই বিপ্লবের চেতনা ধরে রাখতে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তরুণদের প্রতিনিধি রাখা এবং প্রতিটি সেক্টরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

জনগণ একটি বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে ভোট দিয়েছে। নতুন সরকারের প্রতি মানুষের এই বিপুল আস্থা বজায় রাখা সহজ হবে না, যদি না তারা প্রকৃত অর্থে সংস্কারমুখী কাজ শুরু করে। ক্ষমতার দম্ভ নয়, বরং সেবার মানসিকতা নিয়ে দেশ পরিচালনা করলেই কেবল 'নতুন বাংলাদেশ'-এর স্বপ্ন বাস্তবে রূপ পাবে। আমরা আশা করি, নতুন সরকার জনগণের এই ভাষা বুঝবে এবং তাদের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন উপহার দেবে।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর জাগো নিউজ।
[email protected]

এইচআর/জেআইএম