ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. মতামত

ভোটের মাঠে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় সেনাবাহিনীর সফলতা

এম.আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | প্রকাশিত: ০৭:২৫ পিএম, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

একটি নির্বাচন কেবল ব্যালট বাক্সে ভোট দেওয়া বা ফল ঘোষণা করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি জাতির রাজনৈতিক পরিপক্বতা, সামাজিক সহনশীলতা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতারও পরীক্ষা। সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচন সেই পরীক্ষারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে। নানা আশঙ্কা, রাজনৈতিক উত্তাপ এবং গুজব-প্রচারের ভেতর দিয়ে দেশ যখন ভোটের দিনে উপনীত হয়, তখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল একটাই—নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্ন ভোটগ্রহণ। সেই প্রত্যাশা পূরণে সেনাবাহিনীর ভূমিকা ছিল লক্ষণীয়।

নির্বাচনের আগে থেকেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার, সম্ভাব্য সহিংসতার আশঙ্কা, এবং অতীতের কিছু অভিজ্ঞতা সাধারণ ভোটারকে শঙ্কিত করে তুলেছিল। এই প্রেক্ষাপটে সেনাবাহিনীর মোতায়েন শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছিল না; এটি ছিল আস্থার একটি বার্তা। ভোটের মাঠে তাঁদের দৃশ্যমান উপস্থিতি মানুষকে আশ্বস্ত করেছে যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে এবং কোনো অপশক্তি পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে পারবে না।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী-এর পেশাদারিত্বের বিষয়টি। দীর্ঘদিন ধরে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তাঁদের দক্ষতাকে আরও পরিশীলিত করেছে। দেশের ভেতরে দুর্যোগ মোকাবিলা, অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা জরুরি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো কাজেও তাঁদের সাফল্য আছে। ফলে নির্বাচনকালীন দায়িত্ব পালন তাঁদের জন্য নতুন কিছু ছিল না; বরং একটি সুসংগঠিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ প্রয়াসের ধারাবাহিকতা ছিল।

ভোটের দিন ভোর থেকে দেশের বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, সেনাসদস্যরা নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে দায়িত্ব পালন করছেন। কোথাও অযথা হস্তক্ষেপ নয়, আবার প্রয়োজনীয় মুহূর্তে দ্রুত উপস্থিতি—এই ভারসাম্যই ছিল তাঁদের কার্যক্রমের মূল বৈশিষ্ট্য। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করে তাঁরা একটি নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেছেন, যা ভোটারদের নির্ভয়ে কেন্দ্রে আসতে সহায়তা করেছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চল কিংবা পূর্বে সংঘাতপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত এলাকাগুলোতে তাঁদের উপস্থিতি পরিস্থিতিকে স্থিতিশীল রাখতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।

নির্বাচনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো গুজব। একটি ভিত্তিহীন খবর মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর টহল ও নজরদারি অনেকাংশে গুজব-প্রসূত বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধে সহায়ক হয়েছে। কোথাও বিচ্ছিন্ন উত্তেজনা দেখা দিলেও দ্রুত তা নিয়ন্ত্রণে আনা গেছে। এতে বোঝা যায়, পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি ছিল সুসমন্বিত।

তবে সেনাবাহিনীর সাফল্যকে কেবল দৃশ্যমান উপস্থিতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ করলে তা পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন হবে না। গুরুত্বপূর্ণ হলো তাঁদের নিরপেক্ষতা রক্ষা। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা হতে হয় সহায়ক—কখনোই প্রভাব বিস্তারকারী নয়। এবারের নির্বাচন সেই সীমারেখা রক্ষার একটি উদাহরণ হয়ে থাকতে পারে। ভোটগ্রহণের প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ত না হয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—এই দায়িত্বশীল অবস্থান গণতান্ত্রিক চর্চাকে শক্তিশালী করে।

অবশ্যই নির্বাচন নিয়ে ভিন্নমত থাকবে। কোনো দল বা পক্ষ ফলাফল নিয়ে আপত্তি তুলতেই পারে; সেটিই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক রূপ। কিন্তু নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার প্রশ্নে যে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ কম। নির্বাচনের পর বড় ধরনের সহিংসতা বা ব্যাপক অস্থিতিশীলতার খবর না আসা—এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। এর পেছনে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর সমন্বিত প্রচেষ্টাই কাজ করেছে।

ভবিষ্যতের জন্য এই অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা কেমন হওয়া উচিত, কোন পর্যায়ে বাহিনী মোতায়েন প্রয়োজন, কীভাবে জনআস্থা অর্জন করা যায়—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এবারের অভিজ্ঞতা একটি কার্যকর দৃষ্টান্ত হতে পারে। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, কোনো গণতন্ত্রে নিয়মিতভাবে সেনাবাহিনীর ওপর নির্ভরতা বাড়ানোই চূড়ান্ত সমাধান নয়; বরং বেসামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধিই দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত। তবে সংকটকালে বা সংবেদনশীল সময়ে তাঁদের সহায়ক ভূমিকা পরিস্থিতি সামাল দিতে সহায়তা করে—এ বাস্তবতাও অস্বীকার করা যায় না।

সবশেষে বলা যায়, নির্বাচন একটি সামষ্টিক প্রয়াস। এতে ভোটার, প্রার্থী, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী—সবার দায়িত্ব আছে। সেই সামষ্টিক প্রয়াসে সেনাবাহিনী যে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে, তা স্বীকার করা উচিত। তাঁদের পেশাদার আচরণ, সংযম ও দায়িত্ববোধ একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে—রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করতে সক্ষম।

গণতন্ত্রের পথ কখনোই মসৃণ নয়; তবু শৃঙ্খলা, সংযম ও আস্থার ভিত্তিতে এগোতে পারলেই সে পথ সুদৃঢ় হয়। এবারের নির্বাচনে সেনাবাহিনীর ভূমিকা সেই সুদৃঢ়তার একটি বাস্তব উদাহরণ হয়ে থাকবে—এমনটাই প্রত্যাশা।

লেখকঃ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

এইচআর/জেআইএম