ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. মতামত

বিশ্বব্যাংককে ধন্যবাদ

প্রকাশিত: ০৬:৩৪ এএম, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো পদ্মা সেতু নিয়ে ঘটেছিল সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারি। দুর্নীতির অভিযোগে নানা টানাপোড়েন শেষে ২০১২ সালে পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয় বিশ্বব্যাংক। এ নিয়ে হইচই কম হয়নি। চাকরি গেছে যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের। ৪০ দিন জেল খাটতে হয়েছে তখনকার সেতু সচিব মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়াকে। অসম্মানিত হয়েছেন আরো অনেক সম্মানিত মানুষ। কিছু ব্যক্তির সম্মান-অসম্মান নয়, পদ্মা সেতু প্রকল্প আসলে গোটা বাংলাদেশকেই অসম্মানিত করেছিল। বিশ্বের কাছে হেঁট হয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশের মাথা। সরকার বারবার এ অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে। দুর্নীতির অভিযোগ এলে সরকার তো অস্বীকার করবেই। কিন্তু আসলে দুর্নীতি হয়েছে কি হয়নি, এ নিয়ে রাজ্যের জল ঘোলা হয়েছে। আর সেই ঘোলা পানিতে অনেকেই মাছ শিকারের চেষ্টা করেছেন। অনেক আইন-আদালত হয়েছে। কিন্তু এ ঘটনায় কমনসেন্স প্রয়োগের একটা ব্যাপার ছিল।

বিশ্বব্যাংক যখন দুর্নীতির অভিযোগ আনে, তখনও কোনো টাকা ছাড়া হয়নি। টাকা ছাড়া দুর্নীতিটা কিভাবে হওয়া সম্ভব ছিল? এই সাধারণ জ্ঞানের প্রয়োগ ছাড়াই আমরা বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সুর মিলিয়ে সরকারকে, সৈয়দ আবুল হোসেনকে আচ্ছামত মনের সুখে তুলোধুনো করেছি। সৈয়দ আবুল হোসেন রাতারাতি জাতীয় ভিলেনে পরিণত হন। তিনি ধোয়া তুলসি পাতা এমন দাবি আমি করছি না, কিন্তু পদ্মা সেতু প্রকল্পে তিনি আদৌ দুর্নীতি করেছিলেন কিনা, তা প্রমাণিত হওয়ার আগেই আমরা তাকে জবাই করে ফেলেছি। তার মন্ত্রিত্ব গেছে, এটা বড় কোনো ব্যাপার নয়। বরং অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তার মন্ত্রিসভার বাইরে থাকাটাই শোভনীয় ছিল। কিন্তু আমরা শুধু মন্ত্রিসভা থেকে নয়, তাকে রাজনীতির বাইরে ছুঁড়ে ফেলেছি।

বাংলাদেশ দুর্নীতিমুক্ত নয়। বরং প্রতিবছর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির ধারণা সূচকে বাংলাদেশের নাম থাকে ওপরের দিকেই। একাধিকবার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কলঙ্কতিলকও আছে বাংলাদেশের কপালে। এখন চ্যাম্পিয়ন নয়। তাই বলে মনে করার কোনো কারণ দুর্নীতি দূর হয়ে গেছে। বরং বাংলাদেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতির বিপুল বিস্তার। চাকরি পেতে ঘুষ লাগে, চাকরি হওয়ার পর পোস্টিং পেতে ঘুষ লাগে। পেনশনের টাকা পেতে ঘুষ লাগে। পাসপোর্ট পেতে পদে পদে হয়রানি। ব্যাংকিং খাত তো যেন দুর্নীতির মহাসমুদ্র। শেয়ারবাজার থেকে সবার চোখের সামনে লুট হয়ে যায় হাজার কোটি টাকা। সকল নির্মাণ কাজের পদে পদে দুর্নীতি হয়। ঘাটে ঘাটে টাকা দিতে হয় বলে বাংলাদেশের অধিকাংশ অবকাঠামোর মান খারাপ হয়। এখন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের মধ্যে অন্তর্দলীয় কোন্দল হয় বিভিন্ন নির্মাণকাজের দখল নিয়ে। তাই এমন একটি দেশে দুর্নীতির অভিযোগ আনাটা খুব সহজ। বললেই মানুষ বিশ্বাস করে ফেলে। দরপত্র যত স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়ই হোক না কেন, যারা কাজ পাবেন না, তারা ক্ষুব্ধ হবেন।

সংক্ষুব্ধরা দুর্নীতির অভিযোগ করতেই পারেন। কিন্তু বঞ্চিত কারো কথার ওপর ভিত্তি করে কারো বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনা ঠিক নয়। তাছাড়া আমাদের মত আমজনতার অভিযোগ বা রাজনীতির মাঠের ঢালাও অভিযোগ আর বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ এক নয়। বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন করলে পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতি হতো কিনা, সেটা হাইপোথিটিক্যাল প্রশ্ন। হয়তো হতো, হয়তো নয়। কিন্তু কী হতে পারতো তা ধরে নিয়ে তো আপনি একটা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এত বড় অভিযোগ আনতে পারেন না। বিশ্বব্যাংক শুধু অভিযোগ এনেই ক্ষান্ত হয়নি। নানা টানাপোড়েন শেষে ২০১২ সালে বিশ্বব্যাংক ঋণচুক্তি বাতিল করে। বিশ্বব্যাংক অভিযোগ আনে এবং অভিযোগ প্রমাণের আগেই শাস্তি দিয়ে দেয়। এটা রীতিমত অন্যায়।

অথচ বিশ্বব্যাংকের কথা শুনে সরকার যোগাযোগমন্ত্রীকে অপসারণ করেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন তখনকার সেতু সচিব মোশাররফ হোসেন ভুইয়াসহ ৭ জনকে আসামী করে মামলা করেছে। মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া ৪০ দিন কারাগারে থেকে এসেছেন। কিন্তু দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। আমরা তখন বিশ্বাস তো করিইনি, উল্টো দুর্নীতি দমন কমিশনকে সরকারকে পরিচ্ছন্নতার সার্টিফিকেট দেয়ার কমিশন হিসেবে ব্যঙ্গ করেছি। আজ যখন কানাডার আদালতে প্রমাণিত হলো অভিযোগটা পুরোটাই বানোয়াট, তখন আমাদের কারো কারো ঘুম ভেঙেছে, কেউ কেউ এখন মুখ লুকানোর জায়গা খুঁজছি। কানাডার আদালতের পর্যবেক্ষণে অভিযোগ সম্পর্কে বলা হয়েছে ‘জল্পনা, গুজব আর জনশ্রুতি ছাড়া কিছুই না’।

বিশ্বব্যাংকের আনা অভিযোগে বাংলাদেশের বহুমুখি ক্ষতি হয়েছে। টাকার অংকে ক্ষতি তো হয়েছেই। বিশ্বব্যাংকের সরে যাওয়ার পর পদ্মা সেতু নির্মাণের খরচ বেড়ে গেছে তিনগুণ। সময়ও লাগছে বেশি। বিশ্বব্যাংক থাকলে এতদিনে হয়তো পদ্মা সেতুর কাজ অনেকদূর এগিয়ে যেতো। তবে আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার সামর্থ্য এখন বাংলাদেশের আছে। বাংলাদেশের আসল সঙ্কট ছিল ভাবমূর্তির। বিশ্বব্যাংকের এ অভিযোগ দারুণ গতিতে উন্নয়নের রাজপথ ধরে ছুটে চলা বাংলাদেশকে পেছন থেকে টেনে ধরার মত ছিল। কী হতে পারতো? বিশ্বব্যাংকের এত বড় অভিযোগরে পর বাংলাদেশ থেমে যেতে পারতো, লক্ষ্যচ্যুত হতে পারতো। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের অভিযোগে বাংলাদেশ থেমে যায়নি। ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে বাংলাদেশ কাউন্টার অ্যাটাক করেছে। উন্নয়ন দিয়েই ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনা নয় শুধু আরো উজ্জ্বল করার লড়াই শুরু করে বাংলাদেশ। এবং গর্বের সঙ্গে বলা যায়, বাংলাদেশ সে লড়াইয়ে দারুণভাবে জয়ী হয়েছে। জয়ী যে হয়েছে বাংলাদেশ, তার প্রমাণ গতবছর বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম’এর বাংলাদেশ সফর। সে সময় তিনি যেভাবে বাংলাদেশের প্রশংসা করতে করতে মুখে ফেনা তুলে ফেলছিলেন, তাতে আমার কেন জানি ‘ক্ষতিপূরণ ক্ষতিপূরণ’ মনে হচ্ছিল। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের প্রশংসাকে আমি নিয়েছি দুঃখপ্রকাশ হিসেবে।

অনেকেই বলছেন, এখন বাংলাদেশের বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করা উচিত। কেউ বলছেন, বিশ্বব্যাংকের উচিত বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা চাওয়া। আমি ঠিক জানি না কী হবে। তবে একটা জিনিস বুঝি, ব্শ্বিব্যাংক বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন সহযোগী। পদ্মা সেতু থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয়ার পর অনেকেরই আশঙ্কা ছিল বাংলাদেশের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী কোনো সঙ্কটে পড়ে কিনা। কিন্তু বিশ্বব্যাংকও পেশাদারিত্বের সঙ্গেই বিষয়টি সামলেছে। তারা পদ্মা সেতুর সঙ্গে অন্য কোনো প্রকল্পকে মেলায়নি। বরং পদ্মা সেতু সঙ্কটের পর বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন বেড়েছে। আমার ধারণা বিশ্বব্যাংক তাদের ভুল আগেই বুঝতে পেরেছে। ভবিষ্যতে তারা নিশ্চয়ই আরো অনেক বেশি সাহস নিয়ে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াবে।

তবে বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ- দুই পক্ষকেই এই ঘটনার পেছনের ষড়যন্ত্রটা উদঘাটন করতে হবে। সরকারি দলের নেতারা এ ঘটনার জন্য ড. ইউনূস এবং হিলারি ক্লিনটনকে অভিযুক্ত করেছেন। বিশ্বব্যাংকের যেমন ঢালাও অভিযোগ আনা ঠিক হয়নি। তেমনি সরকারি দলের দায়িত্বশীলদেরও উচিত হবে না, ঢালাও কোনো অভিযোগ আনা। কোনো প্রমাণ থাকলে, তিনি যত বড়ই হোন, তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হোক। বিশ্বব্যাংকের আরো বেশি করে পেছনের ষড়যন্ত্রটা উদঘাটন করা উচিত। কার প্ররোচনায় তারা এমন একটি ফাঁদে পা দিল। বিশ্বব্যাংকের আনা অভিযোগকে যখন একটি আদালত ‘জল্পনা, গুজব আর জনশ্রুতি’ বলে উড়িয়ে দেয়, তখন তাদের ভাবমূর্তি থাকে কই? এরপর কেউ কি আর বিশ্বব্যাংকের কোনো অভিযোগ বিশ্বাস করবে? বিশ্বব্যাংক যদি ষড়যন্ত্রটা উদঘাটন করে নিজেদের অবস্থান করে বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা চায়, তাহলেই কেবল তাদের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার সম্ভব।

পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে বিশ্বব্যাংকের সরে যাওয়ায় বাংলাদেশের ক্ষতি হয়েছে যতটা, আমার বিবেচনায় লাভ হয়েছে তারচেয়ে বেশি। রাতের পর যেমন ভোর আসে, অন্ধকারের আড়ালে যেমন থাকে আলোর আভাস, পাথরের নিচে যেমন বয় ফল্গুধারা; তেমনি সব নেতির পেছনেই লুকিয়ে থাকে ইতিবাচকতার গল্প। ব্যর্থতাতেই রোপিত থাকে সাফল্যের বীজ। যেমন বাংলাদেশ ক্রিকেটের বদলে যাওয়ার শুরু পরাজয় থেকেই। গত বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ভারতের কাছে হেরে যায় বাংলাদেশ। আসলে বাংলাদেশকে জোর করে হারিয়ে দেয়া হয়েছিল। ক্রিকেট বাণিজ্যের স্বার্থে ভারতকে টিকিয়ে রাখা দরকার ছিল। সেই অন্যায় পরাজয়ই তাতিয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশকে। তারপর থেকেই অদম্য গতিতে ছুটে চলছে বাংলাদেশের জয়রথ। টানা ৬টি সিরিজ জিতেছে। কাঁপিয়ে দিয়েছিল ইংল্যান্ডকেও। ক্রিকেটে বাংলাদেশ এখন আর কাউকে ভয় পায় না।

বাংলাদেশের উন্নয়নের বিমানও অনেকদিন ধরেই রানওয়েতে এগুচ্ছিল। উন্নয়নের বিমানটি ফ্লাই করলো কখন? আমার বিবেচনায়, পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে বিশ্বব্যাংকের সরে যাওয়ার ঘোষণা দেয়ার পর। শেখ হাসিনা যখন সাহস করে নিজেদের টাকায় পদ্মা সেতু করার ঘোষণা দিলেন, তখনই যেন বাংলাদেশ হঠাৎ করে বড় হয়ে গেল। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর সন্তান যেমন হঠাৎ সাবালক হয়ে যায় তেমনি। অর্থনৈতিক উন্নয়নটা হচ্ছিল অনেকদিন ধরেই। তবে অর্থ থাকলেই অনেক সময় সবকিছু করা যায় না, সাহস লাগে। সেই সাহসের ঘাটতি ছিল। শেখ হাসিনা বাংলাদেশের উন্নয়নের বিমানে সেই সাহসের জ্বালানি সঞ্চার করে দেন। ব্যস, বাংলাদেশ এখন এগিয়ে যাচ্ছে দুর্দমনীয় গতিতে। শেখ হাসিনা যখন নিজেদের অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দিলেন, তখন আমার ধারণা তিনি নিজে ছাড়া, আর কেউ তা বিশ্বাস করেনি। এমনকি সরকারি দলের নেতারাও এ অসম্ভবের পেছনে না দৌড়ানোর কথা বলেছেন আড়ালে আবডালে। অনেকে পরামর্শ দিয়েছিলেন বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ঝামেলায় না জড়াতে। কিন্তু শেখ হাসিনা অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি। পদ্মা সেতু এখন দ্রুত অবয়ব পাচ্ছে।

তাই আমাদের সাহসী করার জন্য, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পথ দেখিয়ে দেয়ার জন্য বিশ্বব্যাংককে ধন্যবাদ। পদ্মা সেতু দাঁড়িয়ে থাকবে বাংলাদেশের শৌর্য্য আর বিশ্বব্যাংকের ‘জল্পনা, গুজব আর জনশ্রুতি’র অভিযোগের প্রতীক হয়ে। আর ধর্মের কল যে বাতাসে নড়ে, তাও জানাবে পদ্মা সেতু।

inar

[email protected]

এইচআর/এমএস

আরও পড়ুন