ভিডিও EN
  1. Home/
  2. মতামত

অমর একুশে এখন শোক নয় উৎসব

ড. মাহবুব হাসান | প্রকাশিত: ০৯:৫৭ এএম, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩

যারা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে যায়, তাদের অধিকাংশকেই শোকার্ত বলে মনে হয় না। বরং তাদের পোশাক-আশাকে দেহভঙ্গিতে আনন্দই ফুটে ওঠে। অমর একুশের বেদীতে ফুল দান যেন পহেলা বৈশাখ বা ঈদুল ফিতরের মতোই উৎসব। ঈদুল ফিতর আনন্দ উৎসব হলেও সিয়ামের পর উৎসব, কিন্তু ঈদুল আজহা শোকের। পশু কোরবানি করে শোক প্রকাশই ফুটিয়ে তোলার কথা। কিন্তু সেখানে শোকের বদলে আনন্দই যেন ফুটে ওঠে পশু কোরবানি করা মানুষগুলোর আচরণে।

এভাবে, সময়ে গড়িয়ে আজ অমর একুশের শোকার্ত পরিবেশ আজ আর শোকের আলো চাদরে ঢাকা নেই, তা উৎসবের বেদী হয়ে উঠেছে। আজকাল পায়ে জুতো নিয়েই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে উঠছে শোক প্রকাশের জন্যে ফুল নিয়ে আসা মানুষগুলো। এবারও বেশ কিছু মানুষকে শৃঙ্খলারক্ষাকারীরা বেদী এলাকা থেকে বের করে দিয়েছেন। তারা একটি ভালো কাজ করেছেন।

আমার ধারণা, শোকার্ত একুশের যে পরিপ্রেক্ষিত এককালে আমরা অর্জন করেছিলাম, তা চর্চার ভেতর দিয়ে উৎসবের আঙিনায় পৌঁছে গেছি। আমাদের ছেলেবেলায় দেখেছি বছর শেষ হওয়ার বেদনার আয়োজন ছিল বা আছে চৈত্রসংক্রান্তির মধ্যে। আবার পহেলা বৈশাখ সেই বেদনাকে আনন্দে রূপায়িত করে দেয় নতুন বছরের আমেজে। এই যে বিদায় আর নতুন বরণ, এই চেতনাই আমাদের রাজনৈতিক সামাজিক পরিবারের সাংস্কৃতিক পরিচর্যা।

এই পরিচর্যাই আমাদের দ্বৈতচেতনার ভেতরে মিলনের পতাকা তুলেছে। এভাবেই আমরা শোককে শক্তিতে পরিণত করেছি এবং সেই শক্তিকে সৃজনের বেদীতে নিয়ে এসেছি। এটা আমারই ব্যাখ্যা। তবে, অন্যদের ভিন্নতর ব্যাখ্যা হতে পারে। কারণ প্রত্যেকেরই রয়েছে আলাদা আলাদা সৃজনশীল চেতনা। প্রত্যেক মানুষকে ভিন্ন করে রাখার পেছনেও ওই সৃষ্টিশীল চেতনাই ক্রিয়াশীল থাকে।

২.
১৯৫২ সালে যারা রক্ত দিয়ে ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছিল রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির জন্য, তাদের সেই অবদান অনস্বীকার্য সত্যে পরিণত হয়েছে। যারা প্রাণ দিয়ে ভাষাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তুলে এনেছিলেন, তারা কিন্তু জানতেও পারছেন না যে তারা জাতির কতো বড়া সন্তান। কিন্তু কেবল তারাই তো আর ৮ ফাল্গুনের বাসন্তিদিনে প্রাণ দেননি, তাদের সঙ্গে ছিলেন আরও অনেক মানুষ, যাদের কয়েকজনকে আমরা চিনি, অধিকাংশ অচেনা, অজানা।

ঠিক একই রকমভাবে মুক্তিযুদ্ধে যারা প্রাণ দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছেন, তাদের মধ্যে মাত্র কয়েকজনই রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়েছেন। যারা জীবিত ছিলেন, তাদের কিছু মানুষ সম্মান পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় স্তরে, অধিকাংশের প্রতি রাষ্ট্র চরম অবহেলাই করছেন। এই অবহেলার কারণ তারা মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করতে গিয়ে অসততার পরিচয় দিয়েছেন। রাজাকারদের নামও যেমন ঢুকে পড়েছে কোথাও কোথাও, আবার ভিন্ন রাজনৈতিক মতাবলম্বী মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা থেকে বাদ বা ছাঁটাই করে দিয়েছেন।

এমন অনেকের নামই আজ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে, যাদের জন্ম ১৯৭১ সালের আগে ও পরে। তারা পঞ্চাম বছরের মানুষ, স্বাধীনতার বিজয়ের সমান তারা। কি করে এমন ব্যক্তিরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলেন? মাতৃগর্ভে থেকেই তারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন- এই রকম হাজারও অসঙ্গতি বর্তমান সরকার সৃষ্টি করেছেন। এটা করার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য একটাই, তাহলো দেশের সাধারণ মানুষ যাতে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে বিভ্রান্ত হয় এবং তাদের আবেগ না থাকে, ভালোবাসা না থাকে। বীরের যে মর্যাদা আমরা দিই, তা যেন মুছে যায়।

এই অসৎ ও ষড়যন্ত্রটির প্রক্রিয়া শুরু হয় এরশাদের শাসনামলে। তার সরকার সব মুক্তিযোদ্ধার কাছ থেকে সর্বাধিনায়ক এম এ জি ওসমানির স্বাক্ষরিত সার্টিফিকেট নিয়ে গিয়েছিলেন পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির জন্য। প্রশাসনের যাদের হাতে তালিকা করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন, তারা পাকিস্তানি সামরিক সরকারকে ১৯৭১ সালে সেবা দিয়েছেন এবং তারাই আবার স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সরকারের প্রশাসনিক আধিকারিক। ফলে একটি পরাজিত ও দুর্বৃত্তায়িত সরকারের কর্মীরা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত অবদান রাখার বিষয়টিপূর্ণতা দেবে- এটা হতেই পারে না।

এ কারণেই অসংখ্য ফ্রিডম ফাইটারকে সহযোগী হিসেবে নাম তালিকাভুক্ত করেছে এবং রাজাকার ও পাকিস্তানি সেবাদাসদের নাম তুলে দিয়েছে তালিকায়। এভাবেই মুক্তিযোদ্ধাদের এক মহাদূষণের ঘূর্ণিতে ফেলে দিয়েছে তারা। এভাবে যে ক্ষতি তারা করেছে, তা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি কেবল অসম্মানই নয়, এক জটিল লেবেরিন্থের গোলকধাঁধায় ফেলে দিয়েছে। এটা বাংলাদেশি জাতিসত্তা যাতে একটি ঐক্যময় সামাজিক ন্যায়ে গড়ে উঠতে না পারে সেই অপচেষ্টা।

আমাদের এই হীনতাই আমাদের প্রধান শত্রু। এই দীনতাই আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত করে ফেলেছে।

৩.
এ থেকে মুক্তি কীভাবে সম্ভব?
এটা বড় কঠিন কাজ। বিশেষ করে জাতির রাজনৈতিক দল বা শক্তিগুলো মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে বিভক্ত ও মুক্তিযোদ্ধাদের রাজাকার এবং পাকিস্তানি চর হিসেবে চিত্রিত ও চিহ্নিত করে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে ব্যস্ত। কতো হীনতর স্বভাব হলে মহান ও প্রাণের মুক্তিযোদ্ধাদের গায়ে রাজাকারের ছাপ দেওয়া হচ্ছে, ১৯৭১ সালের পাকিস্তানি সরকারের সামরিক চর হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। গৌরবময় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বরিত বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দিকীকে রাজাকার অবিহিত করা যায়?

যিনি বা যারা এই কাজটি করেছেন তারা যে একটি বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে তা করেছেন, কোনো রাজনৈতিক আবেগের বিষয়ে করেনি, তা হলফ করে বলা যায়। অর্থাৎ তারা অন্য কোনো দেশকে বা ভিন্ন উদ্দেশ্য সাধনে এই অপরাধ করছে। জাতি যেন কোনোভাবেই জাতীয় বিষয়গুলোতে একতাবদ্ধ না থাকতে পারে, তাদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হতে না পারে সেটাই মূল লক্ষ্য। সন্দেহ নেই আমরা আজ জাতিগত প্রশ্নেও দ্বিধাবিভক্ত।

আমরা গণপরিচয়ে বাঙালি, কিন্তু রাষ্ট্রীয় পরিচয় আমাদের বাংলাদেশি হিসেবে। উদাহরণ হিসেবে গ্রেট ব্রিটেনের নাম নেওয়া যায়। নাম করতে পারি ভারতেরও। ব্রিটিশদের আমরা ইংরেজ বলি। কিন্তু ইংরেজ বলে তারা পরিচিত নয়। তারা ব্রিটিশ। তেমনি ভারত বহুজাতির দেশ। সে দেশের একটি রাজ্যের নাম পশ্চিমবঙ্গ। কিন্তু তারা ইন্ডিয়ান বলে পরিচিত, নাগরিক হিসেবে।

এখন আমাদের মৌলিক সত্তা বাঙালি হলেও রাষ্ট্র নৈতিক পরিচয়ে আমরা বাংলাদেশি। এই চিন্তা ও ভানাকে নিয়েও আছে বিরোধ। আমরা বৃহত্তর নাগরিক পরিচয়ে বাঙালি হলেও, এদেশের বহু নৃগোষ্ঠীর বসবাস আছে যারা তাদের আদি পরিচয়ে পরিচিত। তারা বাঙালি নয়। চাকমা, ম্রো, তৈচৌঙ্গা, গারোসহ অনেক মানুষ আছে যারা বাঙালি নয়, তারা বাংলাদেশের নাগরিক। এই নাগরিক পরিচয়ও প্রধান একটি দেশের মানুষদের।

৪.
আমরা বিবেদমুক্ত হতে চাই। কারণ, জাতির সূর্যসন্তানদের প্রতি যথাযথ সম্মান ও শ্রদ্ধা নিবেদনের বিষয়ে সাংস্কৃতিক ঐক্য অতীব জরুরি। কারণ জাতির রাজনৈতিক শক্তি যদি দৃঢ় না হয়, তাহলে ভিন্ন সংস্কৃতি ও তাদের নগ্ন আগ্রাসনকেও মধুর মনে হতে পারে! আজ বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের প্রথম নামটি হচ্ছে হিন্দি। ৫১ বছর আগে এই বাংলাদেশে আগ্রাসনের নাম ছিল উর্দু।

ভাষা হিসেবে উর্দু বা হিন্দি খারাপ নয়। যখন সেই ভাষায় চড়ে যে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চলতে থাকে, তখন ভিকটিমের জাতি চেতনার ক্ষতিই কেবল হয় না, তাদের পরাধীন হতে হয়। যদিও আমরা আজ পর্যন্ত পরাধীন প্রশাসনিক ও চেতনাগতভাবে। আমরা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকারের চাপানো মিথ্যাকেই সত্য বলে জানি। এই জানাটার দুটি প্রেক্ষিত। তারা আমাদের ভাষিকভাবে ঔপনিবেশিত করে রেখেছে।

কালচারাল হেগেমনি নামে যাকে চিহ্নিত করেছেন অ্যান্টিনিও গ্রামসি, সেই সাংস্কৃতিক ঔপনিবেশের অধীনে আমরা রয়েছি। দ্বিতীয়ত, আমাদের চিন্তা করার যে স্বাধীন ধ্যানটি ছিল তাকে গ্রাস করেছে ঔপনিবেশিক শক্তি চাপিয়ে দেওয়া শিক্ষা। আমরা আজও নিজেকে ব্রিটিশদের মতো হতে চাই। আমরা আজও ইউরোপিয়ানদের অনুকরণ অনুসরণ করি। আমরা আমেরিকানদের মতো করে ইংরেজি অ্যাকসেস্টে উচ্চারণ করতে চাই। তার মানে আমরা ভাষিকভাবে ঔপনিবেশিত মানুষ বলেও ওদের অনুসরণ অনুকরণ করতে চাই। আজ আন্তর্জাতিকতার নামে উন্নত জীবন ও বেশি মাইনের জন্য উন্নত বলে খ্যাত পশ্চিমা সভ্যতার সব কিছু অনুসরণ করতে আমরা উঠে পড়ে লেগেছি।

আজকে বাংলা একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানে ‘লিটফেস্ট’ আয়োজন চলছে। জাতীয় সাহিত্যের গবেষণা তার প্রকাশনা ও মূল্যায়নের প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি পরিণত হতে চলেছে বহুজাতিকতার লালনক্ষেত্রে। এগুলোই হচ্ছে আমাদের পরাধীনতার, ভাষিক ও চিন্তার পরাধীনতার চিহ্ন। আমি এর বিরুদ্ধে কথা বলি। আর লালন করি দেশের সাংস্কৃতিক প্রবহমানতার লোকজ সত্তাকে। ওই লোকজ সম্ভারই আমাদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার রক্ষাকবচ।

লেখক: কবি, সাংবাদিক।

এইচআর/ফারুক/জিকেএস

আরও পড়ুন