ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. রাজনীতি

ফিরোজা আজ ফাঁকা নয়, স্মৃতিতে পরিপূর্ণ

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক | প্রকাশিত: ০৯:০৪ পিএম, ০১ জানুয়ারি ২০২৬

গুলশানের সেই বাড়িতে থেমে আছে সময়, তবু বাতাসে ভাসে ‘ম্যাডাম’র উপস্থিতি গুলশানের বাড়ি ‘ফিরোজা’ আজ নীরব। অস্বাভাবিক রকমের নীরব। শব্দও যেন সাবধানে হাঁটে। এই বাড়িতেই দীর্ঘদিন থাকতেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। আজ তিনি নেই। কিন্তু তার অনুপস্থিতিতেই যেন ঘরের প্রতিটি দেওয়াল, প্রতিটি করিডোরজুড়ে আরও প্রবল হয়ে উঠেছে।

ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মইনুল সড়কের যে বাসায় জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান ছিলেন, রাষ্ট্রপতি ছিলেন, তার মৃত্যুর পর যে বাড়িটি ছিল খালেদা জিয়ার একমাত্র ঠিকানা—সেই অধ্যায়ের অবসান ঘটেছিল এক/এগারোর পর। শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় আসার পর উচ্ছেদ হতে হয় তাকে। তারপর গুলশানের এই বাড়ি ‘ফিরোজা’ হয়ে ওঠে বিএনপি চেয়ারপারসনের ঠিকানা।

২০১৮ সালে এই বাড়ি থেকেই পুরান ঢাকার আদালতে গিয়েছিলেন তিনি। দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলার রায়ে সেদিন সোজা কারাগারে। পরে করোনা পরিস্থিতিতে বিশেষ শর্তে সাময়িক মুক্তি পেয়ে হাসপাতাল থেকে ফিরেছিলেন এই ফিরোজায়ই।

আজও নিরাপত্তা প্রহরায় কোনো ঘাটতি নেই। সিএসএফ সদস্যরা পাহারায়। প্রহরী ছাউনিও ঠিক আগের মতোই। অথচ ভেতরে ঢুকলেই কেমন যেন এক শূন্যতার ধাক্কা।

বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান জানান, এই বাসায় চেয়ারপারসনের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। যারা দীর্ঘদিন তার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাদের আবেগ-অনুভূতি এই বাড়ির সঙ্গে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়ানো।

তিনি আরও বলেন, বিশেষ করে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সেনানিবাসের বাসভবন থেকে শুরু করে দীর্ঘ চল্লিশ বছরের বেশি সময় যারা ভালোবাসার পরশ নিয়ে আছেন, তারা আজও ফিরোজার চারপাশে। আমি নিজেও চেয়ারপারসনের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে যে অনুভূতিটা পাচ্ছি, তা ভাষায় প্রকাশ করার মানসিকতা এই মুহূর্তে নেই। সত্যিই মনে হয়, এই বাসায় ম্যাডাম এখনো আছেন—জীবন্ত।

ভারী কণ্ঠে একজন সিএসএফ সদস্য বলেন, ম্যাডামের ডিউটি করতাম। আজ ম্যাডাম নেই। পুরো বাড়িটা খালি। ভেতরে ঢুকলে কেমন জানি একটা নিস্তব্ধতা কানে আসে।

ফিরোজা আজ ফাঁকা নয়, স্মৃতিতে পরিপূর্ণ
‘ফিরোজার’ নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী-সাম্প্রতিক ছবি

তিনি থামেন। তারপর বলেন, এই কষ্টের ভাষা নেই ভাই। দোয়া করি, আল্লাহ যেন ম্যাডামকে পরপারে ভালো রাখেন।

আরেক নিরাপত্তাকর্মীর স্মৃতিতে ম্যাডাম আজও মা। তিনি বলেন, সব সময় খোঁজখবর নিতেন। বিকেল বা দুপুরে জানতে চাইতেন আমরা ঠিকমতো খেয়েছি কি না। উনি ছিলেন আমাদের প্রাণের মা।

আজ ফিরোজার দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তাকর্মীদের বুকে কালোব্যাজ। চোখেমুখে স্পষ্ট শোকের ছায়া।

‘১৯৬ নম্বর বাসা’

ফিরোজার পাশেই ১৯৬ নম্বর বাসা। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারের সরকার এই বাড়িটি খালেদা জিয়ার নামে বরাদ্দ দিয়েছিল। কয়েক মাস আগে অন্তর্বর্তী সরকারের গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান ফিরোজায় এসে সেই বাড়ির দলিল ও কাগজপত্র হস্তান্তর করেন। এখন সেই বাসায় থাকছেন তারেক রহমান। সেখানেও শোকের আবহ। গুলশান অ্যাভিনিউয়ের ডিপ্লোম্যাটিক জোন হওয়ায় ভিড় কম। তবু যারা এসেছেন, তাদের চোখেমুখে বিষণ্নতা।

গুলশানের বাসিন্দা হাসানুজ্জামান খান বলেন, কাছেই থাকি। বিকালে হেঁটে এলাম। ম্যাডাম নেই। এখন ভরসার জায়গা তারেক রহমান। এই শোক শুধু তার নয়, আমাদের সবার। গণতন্ত্রপ্রিয় বাংলাদেশিদের শোক।

দোয়া-দরুদে দিন কাটছে তারেক রহমানের

মায়ের শোকে আচ্ছন্ন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার সারাদিন কাটিয়েছেন দোয়া, দরুদ ও নামাজে।

বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য আতিকুর রহমান রুমন জানান, গতকাল রাত থেকে আজ বিকেল পর্যন্ত তিনি বাসায় ম্যাডামের আত্মার মাগফিরাত কামনায় ইবাদত করেছেন। কোরআন তেলাওয়াত করেছেন।

তিনি জানান, আত্মীয়স্বজন এসে সান্ত্বনা দিয়েছেন। পারিবারিক পরিমণ্ডলে উঠে এসেছে ম্যাডামের স্মৃতির কথা। আবেগে ভেঙে পড়েছেন তারেক রহমান। বিকেল সাড়ে টার দিকে তিনি গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে গিয়ে নিজের চেম্বারে কাজ করেন।

গুলশানে কার্যালয়েও শোক

কার্যালয়ে কালো পতাকা। বিএনপির পতাকা ও জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত। শোকবই খোলা। একে একে আসছেন বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, রাজনীতিবিদরা।

বৃহস্পতিবার সেখানে যান সমাজকল্যাণ উপদেষ্টা শারমীন এস মুর্শিদ, যুক্তরাষ্ট্রের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ট্রেসি অ্যান জেকবসন, ইরানের রাষ্ট্রদূত মনসুর চাভুশি, ছারছীনা দরবার শরিফের পীর মাওলানা মুফতি শাহ আবু নছর নেছার উদ্দিন আহমেদ, জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী।

ছাত্রশিবির ও ডাকসু নেতারাও গুলশানে কার্যালয়ে যান। এরপর সন্ধ্যা ৭টা ৫০ মিনিটে তিনি সেখানে যান জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। এ সময় তিনি তারেক রহমান ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে শোক ও সমবেদনা জানান। পরে তিনি সেখানে রাখা শোক বইতে স্বাক্ষর করেন। সেখান থেকে বের হয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।

তিনি বলেন, নির্বাচনের পর সরকার গঠনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছি। আগামীতে সবাই মিলেমিশে দেশের স্বার্থে কাজ করতে চাই। বেগম জিয়া যেই ঐক্যের জায়গা তৈরি করে গেছেন সেখানে দাঁড়িয়ে আমরা চলতে চাই রাজনৈতিক সুন্দর পরিবেশ ফিরিয়ে আনার স্বার্থে আমরা একসঙ্গে কাজ করতে চাই।

গুলশান কার্যালয়ের বাইরে নেতা-কর্মী ও গণমাধ্যমকর্মীদের ভিড়ও লক্ষণীয়। শোকবইতে স্বাক্ষরের জন্য প্রবেশাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

বনানী যুবদলের কর্মী আলতাফ হোসেন বলেন, নেত্রী নেই। মনটা ভালো নেই। কতদিন দূর থেকে দেখে শক্তি নিয়েছি। শত নিপীড়নের মধ্যেও আশা দেখেছি। এই শোক কীভাবে কাটাবো জানি না।

কৃষক দলের সহ-সভাপতি ভিপি ইব্রাহিমের কণ্ঠেও একই বেদনা। তিনি বলেন, ম্যাডামের চলে যাওয়াটা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। তবে একটা কথা ঠিক, বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার জনপ্রিয়তার রেকর্ড কেউ ভাঙতে পারবে না। তিনি থাকবেন আমাদের মনে, চিরঞ্জীব হয়ে।

গত মঙ্গলবার ভোরে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বেগম খালেদা জিয়া। বুধবার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে জনতার মহাসমুদ্রে জানাজার পর দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের কবরের পাশেই রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে সমাহিত করা হয়।

তার বাসভবন ফিরোজা আজ নীরব। কিন্তু সেই নীরবতার মধ্যেই যেন প্রতিধ্বনিত হয় এক জীবনের রাজনীতি, সংগ্রাম আর এক মায়ের নিঃশব্দ ভালোবাসা।

কেএইচ/এসএইচএস/জেআইএম