ধানের শীষ সমর্থকরাও আমাকে দেখার জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকেন: নাহিদ
নির্বাচনি গণসংযোগকালে নাহিদ ইসলাম
নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা ও গণসংযোগকালে মানুষের ভালোবাসায় আবেগাপ্লুত হওয়ার কথা জানিয়েছেন ঢাকা-১১ আসনের ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের প্রার্থী ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি তার নির্বাচনি এলাকার মানুষের কাছ থেকে অভূতপূর্ব সাড়া পাওয়ার কথা তুলে ধরেছেন। পোস্টে ভোটারদের কাছ থেকে পাওয়া উপহারসামগ্রীর ছবিও শেয়ার করেছেন।
ফেসবুক পোস্টে নাহিদ ইসলাম লিখেছেন, নির্বাচন এক নতুন অভিজ্ঞতা। প্রতিদিন ভোরে বের হই। সারাদিন হাঁটি রোদে, ধুলোয়, ভিড়ে। মানুষের সঙ্গে হাত মেলাই, কথা বলি, কথা শুনি। বক্তৃতা দিই, মসজিদে যাই। রাতে ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাসায় ফিরি।
‘এ দীর্ঘদিনের সবচেয়ে সুন্দর অভিজ্ঞতা হচ্ছে মানুষের ছোট ছোট উপহার। এই উপহারগুলোর ভেতর থাকে দরদ আর মমতা। কেউ চকলেট দেয়, কেউ আতর। কেউ নিজ হাতে শাপলা কলি বানিয়ে দেয়। এক বোন নিজ হাতে চুড়ি বানিয়ে দিয়েছে আমার স্ত্রীর জন্য।’
‘কেউ কেউ হাতে বা পকেটে জোর করে কিছু টাকা গুঁজে দেয়। রাতে বাসায় এসে দুই পকেট ঝাড়লে পাওয়া যায় কিছু টাকা, আর নানা রকম উপহার—ভালোবাসার নীরব দলিল।’
তিনি লেখেন, ওসমান হাদির প্রতি মানুষের যে ভালোবাসা, তার ভাগিদার আমরাও হয়ে উঠছি। মানুষ আমাদের নিজের সন্তানের মতো দেখে, নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়। ওসমান হাদীর শূন্যতা মানুষের মনে আজও পূরণ হয় নাই। মানুষ জুলাইয়ের দিনগুলো ভোলেনি। অনেকে স্মৃতিচারণ করে, বাড্ডা–রামপুরার আন্দোলন কীভাবে হয়েছিল, ব্র্যাক কিংবা কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির সামনে কীভাবে ছাত্র-জনতা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল।

জুলাই আন্দোলনে রামপুরা বাড্ডার সড়কে ছাত্র জনতার সাহসিকতার স্মৃতি তুলে ধরে নাহিদ লেখেন, রামপুরা ব্রিজ দখল করে রাখতো ইস্ট ওয়েস্ট ভার্সিটি, ইম্পেরিয়াল কলেজ ও আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা। এই চর্চা শুরু হয়েছিল নিরাপদ সড়ক আন্দোলন থেকে। ছাত্রদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল দোকানদার, চা-ওয়ালা, হকাররা। এলাকাবাসী আন্দোলনকারীদের ঘরে আশ্রয় দিয়েছিল, রাস্তায় পানি ও খাবার দিয়েছিল। মেইন রাস্তার পাশে অনেক মসজিদ ও মাদরাসার দেয়ালে গুলির দাগ দেখালো সেখানকার লোকেরা। মাদরাসার ছাত্ররা নেমেছিল বাড্ডা-ভাটারায়।
‘ঢাকার রাজপথ, অলিগলি—সবখানেই জুলাই লেখা আছে। কখনো দেখা হয়ে যায় গুলিবিদ্ধ কোনো আহত যোদ্ধার সঙ্গে। কিংবা শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে। বাড্ডা–রামপুরার অনেক শহীদ পরিবার অভ্যুত্থানের পর ঢাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে, রাজনৈতিক হুমকি, মামলা-বাণিজ্য আর অর্থনৈতিক চাপের কারণে।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, এক পিঠা বিক্রেতা খালার সঙ্গে কথা হলো। ভেবেছিলাম, হয়তো আমাকে চিনবে না। কিন্তু উনি ভালো করেই চিনলেন। বললেন, আমি গুম হওয়ার পর অনেক দোয়া করেছিলেন। অনেক মা আমাকে দেখে কেঁদেছেন। আন্দোলনের সময় আমাদের জন্য কতটা দোয়া করেছেন—সেই স্মৃতি টেনে এনেছেন। এক আন্টি এসে বললেন, এক দফা ঘোষণার দিন তিনি শহীদ মিনারে আমার ঠিক সামনেই ছিলেন। রামপুরা থেকে মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন।
পোস্টে নাহিদ লিখেছেন, আন্দোলনের সময় ১৯ জুলাই আমি গুলশান–বাড্ডা থেকে পায়ে হেঁটে বনশ্রী বাসায় যাচ্ছিলাম। সেদিন মনে হয়েছিল বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করি। আন্দোলন শুরুর পর একদিনও বাসায় যাইনি। বিকেলে বাসা থেকে বের হওয়ার পরপরই বনশ্রীতে গোলাগুলি শুরু হয়। আমার বাসার সামনেই একজন গুলিতে শহীদ হন, সেই রাতেই আমি গুম হই। পরদিন কারফিউ ছিল।
‘আমার জন্ম, গ্রাম, ভিটে, বড় হওয়া সবকিছু জড়ায় আছে বাড্ডা, রামপুরা, বনশ্রীতে। কিন্তু নির্বাচনি প্রচারণায় এই এলাকাকে আমি নতুন করে চিনছি। অলিগলি আর মানুষের সঙ্গে আরও গভীর আত্মীয়তা তৈরি হচ্ছে। কখনো দেখি ধানের শীষের অনেক সমর্থকরাও চুপ করে রাস্তায় বা বাড়ির গেটে দাঁড়িয়ে থাকেন, আমাকে দেখার জন্য।’
‘প্রতিদিন শুনি মানুষের গল্প—বেঁচে থাকার লড়াই, কষ্ট আর প্রত্যাশা। কেউ ছেলের জন্য চাকরি চায়, কেউ মায়ের অপারেশনের জন্য সাহায্য। কেউ মসজিদের সামনের রাস্তাটা ঠিক করে দিতে বলে। কেউ তার দখলকৃত জমিটা উদ্ধার করে দিতে বলে।’
‘কোথাও তীব্র গ্যাস সংকট। নাই খেলার মাঠ, নাই ভালো ক্লিনিক। কেউ চায় সরকারি স্কুল। বৃষ্টি হলেই পানি জমে যায়। প্রচণ্ড ট্রাফিক জ্যাম। আছে নিরাপত্তার শঙ্কা, অকার্যকর আইনশৃঙ্খলা ও ক্ষমতাবানদের দৌরাত্ম্য। ঢাকা শহরের সব সমস্যাই এখানে জড়ো হয়েছে।’

‘মানুষ বলে ভোটের সময় রাজনীতিবিদরা আসে, বুকে জড়িয়ে ধরে এবং প্রতিশ্রুতি দেয়, ভোটের পর আর খোঁজ থাকে না। প্রতিশ্রুতি দেওয়া এবং ভাঙাই যেন এ দেশের রাজনীতি। তারপরও মানুষ কথা বলে। প্রত্যাশা রাখে। প্রতিশ্রুতি শুনতে চায়। নতুন দিনের স্বপ্ন দেখে।’
‘কেউ কেউ আমাকে বলেছেন, আমার ভেতর জড়তা আছে। আমি প্রথম দেখাতে অপরিচিত কারও সঙ্গে ইমোশন এক্সপ্রেস করতে পারি না। আবার অভিনয়ও পারি না। কিন্তু যেই ভালবাসা মানুষ আমাকে দিচ্ছে একই পরিমাণ দরদ তাদের প্রতিও আমার আছে।’
মানুষের ভালোবাসা বড় প্রাপ্তি হবে উল্লেখ করে নাহিদ লেখেন, নির্বাচনের ফলাফল কী হবে, জানি না। কিন্তু রাজনীতি—হার-জিতের ঊর্ধ্বে মানুষের এই ভালোবাসা, নিজের এলাকাকে নতুন করে চেনা—এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হয়ে থাকবে।
নাহিদের ফেসবুক পোস্টের লিংক দেখতে ক্লিক করুন এখানে
এএএইচ/এমকেআর