ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. প্রবাস

আলেমদের নেতৃত্ব সংকট ও বাংলাদেশে ইসলামী রাষ্ট্রচিন্তার বিপর্যয়

প্রবাস ডেস্ক | প্রকাশিত: ০৯:১১ এএম, ০৩ জানুয়ারি ২০২৬

আবুল কালাম আজাদ

বাংলাদেশে কাঙ্ক্ষিত ইসলামি হুকুমাত কায়েম না হওয়ার প্রশ্নটি আবেগনির্ভর স্লোগান কিংবা একপাক্ষিক রাজনৈতিক অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে প্রকৃত সমস্যার গভীরে পৌঁছানো সম্ভব নয়। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের সমাজের শক্তিশালী ও প্রভাবশালী একটি শ্রেণির দিকে তাকাতে হয়, যাদের ভূমিকা সরাসরি জনগণের চিন্তা-চেতনা, নৈতিকতা এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।

সেই শ্রেণিটি হলো আলেম সমাজ। বহু মানুষ হয়তো এই কথাটি শুনে বিস্মিত হবে কিংবা ক্ষুব্ধ হবে, কিন্তু নির্মোহ বিশ্লেষণ করলে অস্বীকার করার উপায় নেই যে বাংলাদেশে ইসলামি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা না হওয়ার পেছনে আলেম সমাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা নেতিবাচক।

এ কথা বলার অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশের সকল আলেম একই রকম কিংবা সবাই দায়ী। বরং আলেম সমাজের ভেতরেই রয়েছে বিস্তর পার্থক্য, দ্বন্দ্ব এবং শ্রেণিভেদ। এই পার্থক্যগুলো স্পষ্টভাবে চিহ্নিত না করতে পারলে দায় নির্ধারণও অস্পষ্ট থেকে যাবে। বাস্তব অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক ইতিহাস এবং সামাজিক পর্যবেক্ষণের আলোকে দেখা যায় যে বাংলাদেশে আলেম সমাজকে মোটামুটি চারটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়, যাদের ভূমিকা, অবস্থান এবং উদ্দেশ্য একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

প্রথম শ্রেণির আলেমরা হচ্ছেন তারা, যারা সত্যিকার অর্থেই ইসলাম কায়েমের জন্য নিরলস সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। এই শ্রেণির আলেমরা কোনো সময়ই ক্ষমতার আশপাশে ঘোরাঘুরি করেননি বরং ক্ষমতার রোষানলে পড়ে যুগের পর যুগ নির্যাতন, জেল-জুলুম, মিথ্যা মামলা, এমনকি ফাঁসির মঞ্চ পর্যন্ত বরণ করেছেন। এরা ইসলামের প্রশ্নে আপস করেননি, রাজনৈতিক সুবিধার জন্য আদর্শ বিক্রি করেননি। তাদের জীবনের বড় অংশ কেটেছে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কিংবা নজরদারির মধ্যে। রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা তো দূরের কথা, ন্যূনতম নাগরিক অধিকার থেকেও তারা বঞ্চিত থেকেছেন।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এই শ্রেণির আলেমরা কখনোই জনগণের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়নি বরং জনগণকে ইসলামের পথে আহ্বান জানিয়েই তারা জীবনের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, এই শ্রেণিটি সংখ্যায় খুবই সীমিত এবং রাষ্ট্রীয় ও মিডিয়া কাঠামোর ভেতরে তাদের কণ্ঠস্বর প্রায়শই চেপে রাখা হয়েছে।

দ্বিতীয় শ্রেণির আলেমরা হলেন তারা, যারা ইসলামের নাম ব্যবহার করে মূলত ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনীতি করে থাকেন। এদের বক্তৃতা, লেখালেখি এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইসলামের ভাষা ও প্রতীক ব্যবহৃত হলেও তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য ইসলামি শাসনব্যবস্থা নয়, বরং ক্ষমতার অংশীদার হওয়া। এই শ্রেণির আলেমরা সময় ও পরিস্থিতি বুঝে একেক সময় একেক রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সমঝোতা করেছে, কখনো ক্ষমতাসীন দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নে ভূমিকা রেখেছে, আবার কখনো বিরোধী শক্তির সঙ্গে দরকষাকষিতে নেমেছে। বিনিময়ে তারা পেয়েছে পদ-পদবি, আর্থিক সুবিধা, প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন কিংবা রাজনৈতিক নিরাপত্তা।

এই শ্রেণির সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো, তারা কখনোই জনগণের প্রকৃত আস্থা অর্জন করতে পারেনি। স্বাধীনতার পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনগুলোর ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইসলামের নামধারী এসব রাজনৈতিক শক্তি কখনোই ১ শতাংশ জনপ্রিয়তার সীমা অতিক্রম করতে পারেনি। এর প্রধান কারণ তাদের দ্বিচারিতা, আদর্শহীনতা এবং ক্ষমতালোভ। উপরন্তু, এই শ্রেণির আলেমরা ইসলামি দলগুলোর মধ্যে ঐক্যের পথে সবসময় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হলে তাদের ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

তৃতীয় শ্রেণির আলেমরা হলো তথাকথিত ফতোয়াবাজ আলেম। এরা ইসলামের ফিকহি ঐতিহ্যকে পণ্য বানিয়ে নিয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার আশেপাশে ঘোরাফেরা করেই নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করেছে। এই শ্রেণির আলেমরা সবসময়ই সরকারি দল অথবা সম্ভাব্য সরকারি দলের পক্ষে অবস্থান নেয়। পরিস্থিতি অনুযায়ী ফতোয়া দেয়, শাসকদের অন্যায় সিদ্ধান্তকে ধর্মীয় বৈধতা দেয় এবং জনগণকে বিভ্রান্ত করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায়, এরা ঘুসখোর, দুর্নীতিবাজ এমপি-মন্ত্রীদের পৃষ্ঠপোষকতা করে, তাদের জন্য দোয়া মাহফিল আয়োজন করে এবং বিনিময়ে মোটা অঙ্কের সুবিধা গ্রহণ করে। কেউ কেউ আবার ক্ষমতাসীনদের খুশি করতে গিয়ে চরম লজ্জাজনকভাবে অশালীন উপাধিও প্রদান করে, যা আলেম সমাজের মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এরা মূলত নগদ ব্যবসায়ীর মতো—যতটুকু সুবিধা হাতে পায়, ততটুকুই নেয়; ভবিষ্যৎ, আদর্শ কিংবা আখিরাতের কোনো হিসাব তাদের খাতায় থাকে না। এই শ্রেণির আলেমরা ইসলামি হুকুমাত কায়েমের পথে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক, কারণ তারা শাসকদের জন্য ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে জনগণের প্রতিরোধ শক্তিকে ভেঙে দেয়।

চতুর্থ শ্রেণির আলেমরা তুলনামূলকভাবে নীরব কিন্তু সংখ্যায় কম নয়। এরা মূলত বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে জীবন নির্বাহ করে। সংসার, বেতন, পদোন্নতি এবং চাকরির নিরাপত্তাই তাদের প্রধান চিন্তার বিষয়। ইসলাম ও মুসলমানদের সামগ্রিক অবস্থা, রাষ্ট্রে অন্যায়-অবিচার, জুলুম বা দুর্নীতির বিষয়ে তারা প্রায় সম্পূর্ণ উদাসীন। তাদের নীতি হলো—‘আমার চাকরি ঠিক থাকলেই হলো।’ এই মানসিকতা তাদের ধীরে ধীরে নিরপেক্ষ নয়, বরং অন্যায়ের সহযোগীতে পরিণত করেছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, এই শ্রেণির আলেমরা জুমার খুতবাও দেয় শাসকগোষ্ঠীর ইচ্ছামতো, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা না বলে বরং ধৈর্য ও নীরবতার ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে জনগণকে নিষ্ক্রিয় থাকতে উৎসাহিত করে। এই নীরবতা ও আপসের সংস্কৃতিই ইসলামি সমাজ বিনির্মাণের পথে এক ভয়াবহ অন্তরায়।

এই চার শ্রেণির আলেমের ভূমিকা বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে বাংলাদেশে ইসলামি হুকুমাত কায়েম না হওয়ার জন্য দায় এককভাবে কোনো রাজনৈতিক দল বা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর চাপিয়ে দেওয়া যথেষ্ট নয়। বরং আলেম সমাজের বড় একটি অংশ তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। যারা সত্যিকার অর্থে সংগ্রাম করছে তারা একা পড়ে গেছে, আর বাকিরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ক্ষমতালোভ, সুবিধাবাদিতা ও ভীরুতার মাধ্যমে অন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

ইসলাম কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের বিষয় নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। সেই জীবনব্যবস্থা কায়েম করতে হলে সাহসী নেতৃত্ব, নৈতিক দৃঢ়তা এবং আদর্শিক ঐক্য প্রয়োজন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাংলাদেশের আলেম সমাজের বড় অংশ এই তিনটি গুণের কোনোটিই ধারণ করতে পারেনি। ফলে ইসলামি হুকুমাত একটি কাংখিত স্বপ্ন হয়েই রয়ে গেছে।

যদি এই অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে হয়, তবে সর্বপ্রথম আলেম সমাজের আত্মসমালোচনা প্রয়োজন। কে কোন শ্রেণিতে অবস্থান করছে, কে আদর্শের পক্ষে আর কে সুবিধার পক্ষে—এই প্রশ্নগুলোর সৎ উত্তর খুঁজে বের করা ছাড়া সামনে এগোনো সম্ভব নয়। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না, আর ভবিষ্যৎও তাদের জন্য অপেক্ষা করে না যারা সত্যের প্রশ্নে নীরব থাকে।

আবুল কালাম আজাদ
যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ও কলামিস্ট
[email protected]

এমআরএম/এএসএম