ড. ইউনূস আয়না ধরেছিলেন, অন্ধ জাতি কিছুই দেখেনি
রহমান মৃধা ও তার সহধর্মিণী
এই হেডলাইনটি কেবল একটি ব্যক্তির অভিজ্ঞতা নয়। এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বাস্তবতার এক নির্মম সারসংক্ষেপ। এখানে ড. ইউনূস কোনো ব্যক্তি নন, তিনি একটি প্রতীক। আর আয়না কোনো বস্তু নয়, এটি সত্য, নৈতিকতা, জবাবদিহি এবং বিকল্প রাষ্ট্রচিন্তার প্রতিচ্ছবি।
বাংলাদেশ আজ একটি এটুজেড সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। এই সংকট বিচ্ছিন্ন নয়, স্তরভিত্তিক এবং ধারাবাহিক। সমস্যার শুরু রাজনীতিতে, বিস্তার রাষ্ট্রযন্ত্রে, পরিণতি সমাজে এবং প্রভাব নাগরিকের ডিএনএর ভেতর পর্যন্ত প্রবেশ করেছে।
প্রথমত রাজনীতি। বাংলাদেশে রাজনীতি এখন আর জনস্বার্থের মাধ্যম নয়, এটি ক্ষমতা রক্ষার প্রযুক্তিতে রূপ নিয়েছে। নির্বাচন প্রক্রিয়া বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে, বিরোধিতা মানেই শত্রুতা, ভিন্নমত মানেই রাষ্ট্রবিরোধিতা। এই বাস্তবতায় ড. ইউনূসের মতো একজন ব্যক্তি যখন নৈতিক প্রশ্ন তোলেন, তখন তা গ্রহণ করার মতো রাজনৈতিক সংস্কৃতি আর অবশিষ্ট থাকে না।
দ্বিতীয়ত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। বিচার বিভাগ, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো কাগজে কলমে স্বাধীন থাকলেও বাস্তবে রাজনৈতিক আনুগত্যের ভারে ন্যুব্জ। ফলে রাষ্ট্র নিজেই আয়নায় তাকাতে ভয় পায়। আয়না ভাঙার প্রবণতা তৈরি হয়, কারণ প্রতিচ্ছবি অস্বস্তিকর।
তৃতীয়ত অর্থনীতি। প্রবৃদ্ধির গল্প আছে, কিন্তু ন্যায়বণ্টনের গল্প নেই। ব্যাংক লুট, ঋণখেলাপি সংস্কৃতি, বৈষম্য এবং কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা একটি প্রজন্মকে ধীরে ধীরে অসাড় করে দিচ্ছে। এই অর্থনৈতিক কাঠামোর ভেতর ড. ইউনূসের ক্ষুদ্রঋণ দর্শন একটি বিকল্প নৈতিক অর্থনীতির কথা বলে। তাই সেটিও অগ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।
চতুর্থত সমাজ ও নাগরিক মানসিকতা। দীর্ঘদিন ধরে ভয়, সুবিধাবাদ এবং নীরবতার চর্চা একটি জাতিকে অভ্যস্ত করে তোলে অন্ধত্বে। মানুষ দেখতে চায় না, কারণ দেখলে প্রশ্ন করতে হয়। প্রশ্ন করলে মূল্য দিতে হয়। এই সামাজিক মানসিকতা তৈরি হয় ধীরে ধীরে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। এখানেই সংকট ডিএনএর মতো উত্তরাধিকার হয়ে যায়।
ড. ইউনূস যখন আয়না ধরেছিলেন, তখন তিনি আসলে বলেছিলেন, এই রাষ্ট্র কি তার জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ। এই উন্নয়ন কি নৈতিক। এই ক্ষমতা কি বৈধ। কিন্তু অন্ধ জাতি কিছুই দেখেনি, কারণ দেখার প্রস্তুতি ছিল না।
এই অন্ধত্ব জন্মগত নয়। এটি তৈরি করা হয়েছে পরিকল্পিতভাবে। শিক্ষা ব্যবস্থার রাজনীতিকরণ, ইতিহাসের বিকৃতি, গণমাধ্যমের আত্মসমর্পণ এবং নাগরিক সমাজের সংকোচন এই অন্ধত্বকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।
এই লেখার উদ্দেশ্য ড. ইউনূসকে মহান প্রমাণ করা নয়। উদ্দেশ্য এই প্রশ্ন তোলা, কেন একটি জাতি বারবার আয়না প্রত্যাখ্যান করে। কেন আমরা সংশোধনের সুযোগকে শত্রু ভাবি। কেন নৈতিক প্রশ্ন আমাদের অস্বস্তিতে ফেলে।
যে জাতি আয়নায় তাকাতে শেখে না, সে জাতি ভুল সংশোধন করতে পারে না। আর যে রাষ্ট্র ভুল সংশোধন করতে পারে না, সে রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত নিজের কাছেই পরাজিত হয়।
এই অন্ধত্বের বাস্তবতা আরও নির্মম হয়ে ওঠে যখন আমরা দেখি, রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য দীর্ঘ সতেরো মাস ধরে চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতা স্বীকার করা ছাড়া আর কোনো পথ অবশিষ্ট থাকেনি। প্রতিষ্ঠানগুলো নড়েনি, ক্ষমতার কাঠামো নিজেকে সংশোধনের আগ্রহ দেখায়নি, সমাজও সমানতালে প্রস্তুত হয়নি। এই ব্যর্থতা কোনো ব্যক্তির নয়, এটি রাষ্ট্রীয় জড়তার স্বীকারোক্তি।
তবু ইতিহাসের শেষ অধ্যায় এখনো লেখা হয়নি। শেষ চেষ্টা হিসেবে সামনে রাখা হয়েছে একটি নির্বাচন এবং তার সঙ্গে একটি গণভোট। একটি হ্যাঁ ভোটের আবেদন। এটি আর কোনো ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা নয়, এটি একটি জাতির কাছে শেষ প্রশ্ন। আমরা কি পরিবর্তনের সম্ভাবনাকেও প্রত্যাখ্যান করব, নাকি অন্তত একবার আয়নার দিকে তাকাব।
এই শেষ প্রচেষ্টার মূল্যও কম নয়। একজন মাইক্রোক্রেডিট নোবেল লরিয়েটের জন্য এটি সামাজিক, রাজনৈতিক এবং ব্যক্তিগতভাবে এক বিরাট মূল্যহ্রাস। আন্তর্জাতিক সম্মান থাকা সত্ত্বেও নিজ দেশে সন্দেহ, অবজ্ঞা ও অবিশ্বাসের মুখোমুখি হওয়া সহজ নয়। তবু তিনি পিছিয়ে যাননি, কারণ তিনি জানেন, ইতিহাস কখনো আরামদায়ক অবস্থানকে নয়, সত্যের পাশে দাঁড়ানো মানুষকেই মনে রাখে।
এখন প্রশ্নটি আর ড. ইউনূসকে ঘিরে নয়। প্রশ্নটি আমাদের ঘিরে। আমরা কি আবারও কিছু না দেখার ভান করব, নাকি এই একবার অন্তত চোখ খুলে আয়নায় তাকাব।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
[email protected]
এমআরএম